যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় উৎসব আমেজে পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপিত : করোনামুক্ত বিশ্ব সহ মানবতার কল্যাণ কামনা

সাখাওয়াত হোসেন সেলিম নিউইয়র্ক থেকেঃঃ

করোনামুক্ত বিশ্ব সহ মানবতার কল্যাণ কামনার মধ্য দিয়ে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসব আমেজে যুক্তরাষ্ট্রে গত ২০ জুলাই মঙ্গলবার উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আযহা। চমৎকার আবহাওয়া থাকায় অনেক মসজিদের ব্যবস্থাপনায় খোলা মাঠে ও মসজিদে ঈদ জামাতে মানুষের ঢল নেমেছিল।

মাস্ক পরিধান সহ করোনার স্থাস্থ্যবিধি মেনে ঈদুল আযহার নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। ত্যাগের মহিমা নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন স্টেটে বসবাসরত মুসলমানগণ এদিন পবিত্র ঈদুল আযহার নামাজ আদায় করেন। করোনাভাইরাসে থেকে মুক্তি, মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র মানবতার কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া করা হয়।

এসময় করোনায় নিহতদের আত্মার মাগফেরাত এবং আক্রান্তদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হয়।
এদিকে, ঈদ উপলক্ষে প্রদত্ত শুভেচ্ছা বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মুসলিম আমেরিকানসহ বিশ্বের মুসলমানদের ‘ঈদ মুবারক’ জানিয়েছেন। বাইডেন এবং ফার্স্টলেডি জিল বাইডেন শুভেচ্ছা বার্তায় উল্লেখ করেন, ‘আমেরিকানদের পক্ষ থেকে নিরাপদে এবং উৎসবের আমেজে যারা দিবসটি উদযাপন করছেন তাদের ঈদ মুবারক।’

ঈদ উপলক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি বি¬ংকেনও পৃথক বিবৃতিতে মুসলিম আমেরিকানসহ সারাবিশ্বের মুসলমানদের উষ্ণ অভিনন্দন সহ ঈদ মুবারক জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে সর্বত্রই শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার অধিকাংশ ঈদ জামায়াত সকাল ৭টা থেকে সকাল সাড়ে ১০ টার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাললাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মসজিদ ও ঈদগাহ প্রাঙ্গণ।

তবে ১২ বছরের কম বয়সীরা এখনও টিকা নেয়ার সুযোগ পায়নি বিধায় ঈদ জামায়াতে শিশু-কিশোদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে।
নিউইয়র্কে জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার, বাংলাবাজার জামে মসজিদ, নর্থ ব্রঙ্কস ইসলামিক সেন্টার, জ্যাকসন হাইটস মোহাম্মদী সেন্টার, পার্কচেস্টার জামে মসজিদ, মসজিদ আল আমান, আল আমিন মসজিদ, বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টার, আসসাফা ইসলামিক সেন্টার, বায়তুল জান্নাহ মসজিদ, ফুলতলী ইসলামিক সেন্টার এন্ড মসজিদ, মসজিদ আবু হুরায়রা, দারুস সুন্নাহ জামে মসজিদ, আল ফোরকান জামে মসজিদ, আমেরিকান মুসলিম সেন্টার, গাউছিয়া মসজিদ, পার্কচেস্টার ইসলামিক সেন্টার, ব্রঙ্কস মুসলিম সেন্টারের ব্যবস্থাপনায় ঈদের বৃহৎ জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে, নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের পরিচালনায় সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত হয়েছে কুইন্সে জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের উদ্যোগে। টমাস এডিসন হাই স্কুল মাঠের এ জামাতে ১০ হাজারের অধিক মুসল্লির সমাগম ঘটে। মূলধারার রাজনীতিক এবং স্টেট ও সিটি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ ঈদ জামাতে এসে ঈদ মুবারক জানিয়েছেন।

জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর আহমদ চৌধুরীর পরিচালনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক পার্টির মেয়র প্রার্থী এরিক অ্যাডামস, নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর জন ল্যু, স্টেট অ্যাসেম্বলিম্যান ডেভিড ওয়েপ্রিন, কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মেলিন্ডা কাটজ,

সিটি কাউন্সিলম্যান (ডিস্ট্রিক্ট-২৪) জেমস এফ জিনারো, কুইন্স কাউন্টির সিভিল কোর্টের বিচারক পদে ডেমক্রেটপ্রার্থী অ্যাটর্নি সোমা সাঈদ, কুইন্স বরো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এলিজাবেথ ক্রাউলি, জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ড. সিদ্দিকুর রহমান।

ঈদ জামাতে ইমামতি করেন জেএমসির খতিব ও পেশ ইমাম মাওলানা মির্জা আবু জাফর বেগ। খুৎবা পাঠ করেন ইমাম শামসে আলী।
নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাবাজার জামে মসজিদের উদ্যোগে সকাল ৮টা এবং সকাল ৮:৪৫ মিনিটে মসজিদের নিকটবর্তী পিএস ১০৬ খোলা মাঠে ২টি বিশাল জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জামায়াতে ইমামতি করেন বাংলাবাজার জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব মাওলানা আবুল কাশেম এয়াহইয়া।

দ্বিতীয় জামায়াতে ইমামতি করেন প্রিন্সিপাল মাওলানা একেএম আব্দুন নূর। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মসজিদের সভাপতি ডা. আবদুস সবুর এবং সাধারণ সম্পাদক মো. লালন আহমেদ। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন কমিটির সহ সভাপতি মো. ইলিয়াস আলী, কোষাধ্যক্ষ ইকবাল হোসেন, সহ কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবু সাঈদ,

কার্যকরী সদস্য মো. আহসান রাসুল নাসির, ওয়ালিউর রহমান, মিজানুর রহমান, মোহাম্মদ শাহজাহান, শামিম উদ্দিন ও সোহেল চৌধুরী প্রমুখ। নামাজে বাংলাবাজার জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ গিয়াস উদ্দিন সহ করোনায় নিহতদের আত্মার মাগফেরাত ও বিশ্ব মানবতার শান্তি কামনায় বিশেষ দোয়া করা হয়। নামাজ শেষে সিপিএ জাকির চৌধুরীর সৌজন্যে মুসল্লীদের মিষ্টিমুখ করানো হয়।

নর্থ ব্রঙ্কস জামে মসজিদের উদ্যোগে সকাল ৮টায় ব্রঙ্কসের ওভাল পার্কে বিশাল ঈদ জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে ইমামতি করেন মসজিদের ইমাম ও খতীব হাফিজ মুসাদ্দেক আহমেদ। এসময় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মসজিদের সভাপতি সৈয়দ জামিন আলী, সিনিয়র সহ সভাপতি মাওলানা সৈয়দ জুবায়ের আহমেদ এবং সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ ইকবাল হোসাইন। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন মসজিদ কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক শাহ জাকারিয়া, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাহবুব হুসেইন,

সহ কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ শাহ আলম, কার্যকরী সদস্য সৈয়দ বসারত আলী, মাওলানা আতাউর রহমান, মাওলানা মোস্তফা কামাল, সৈয়দ রাহুল ইসলাম সহ কমিটির কর্মকর্তাবৃন্দ। দোয়া পরিচালনা করেন মসজিদের সাবেক ইমাম ও খতীব মাওলানা মো: মাসহুদ ইকবাল।

নিউইয়র্ক ঈদগাহ এর ১০ বছর পুর্তি উপলক্ষে জ্যাকসন হাইটস মোহাম্মদী সেন্টার এবারের ঈদুল আদহাতে ৫টি জামায়াতের আয়োজন করেছিল। সকাল সাড়ে ৬টায়, সাড়ে ৭ টা, ৯টা, ১০টা ও ১১ টার জামাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুসল্লির সমাগম ঘটে।

নিউইয়র্ক ঈদগার পক্ষ থেকে ইমাম কাজী কায়্যূম ৫টি জামায়াতে আগত মুসল্লি, সুখী নিউইয়র্ক, ১১৫’র পুলিশ ক্যাপ্টেইন জামিল আল তাহেরী ও কমিউনিটি এ্যাফেয়ার্স অফিসার মেইকোকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। জ্যাকসন হাইটস মুসলিম কমিউনিটি ও নিউইয়র্ক ঈদগাহর সার্বিক সহযোগিতার জন্য নিউইয়র্ক ঈদগাহর পরিচালক ইমাম কাজী কায়্যূম স্থানীয় ১১৫ পুলিশ প্রিসিঙ্কটের ক্যাপ্টেইন আততাহিরীর হাতে ঈদ মোবারক-সম্মাননা প্ল্যাক তুলে দেন। প্রতিটি জামাতের খুতবা শেষে বিশ্ব মানবতার কল্যাণ ও বিশ্ব শান্তির জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

পার্কচেস্টার জামে মসজিদে সকাল ৮ টা ও সকাল ৯ টায় ঈদের দু’টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
সংশি্লষ্ট সিটির পক্ষ থেকে প্রতিটি ঈদ জামাতের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
কুইন্সের এস্টোরিয়ায় আল আমিন মসজিদ, ওজোনপার্কে আল আমান মসজিদ, ব্রুকলীনে বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টার এবং ব্রঙ্কস এলাকায় বড় ধরনের ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। নামাজ শেষে অনেকে ছুটেন পশু খামারে।

দূরবর্তী স্থানের এসব খামারে গিয়ে পছন্দের গরু, খাশী অথবা ভেড়া ক্রয় করেন। ভার্জিনিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া, মিশিগান, জর্জিয়ার বিভিন্ন স্থানে খোলা ময়দানে পশু কুরবানীর পর নারী-পুরুষ মিলে মাংস প্রসেসিং করেন।

নামাজ শেষে অনেকে ছুটে যান পশু খামারে। দূরবর্তী স্থানে খামারে গিয়ে পছন্দের গরু, খাশী অথবা ভেড়া ক্রয় করেন। অনেকে বাংলাদেশি গ্রোসারি/সুপার মার্কেট এর মাধ্যমে কুরবানী দেন। বাংলাদেশি গ্রোসারি/সুপার মার্কেট সূত্রে জানা গেছে, নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, পেনসলিভেনিয়া, কানেকটিকাট, ম্যাসেচুসেটস, ম্যারিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া, মিশিগান, জর্জিয়া, ইলিনয়, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া, ক্যানসাস, আরিজোনা প্রভৃতি স্টেটে প্রায় ৫০ হাজার পশু কোরবানি দিয়েছেন বাংলাদেশিরা।

বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি দেশে কুরবানী দেন বলে জানা গেছে। ভার্জিনিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া, মিশিগান, জর্জিয়ার বিভিন্ন স্থানে খোলা ময়দানেও অনেকে পশু কুরবানীর মাংস প্রসেসিং করেন বলে জানা গেছে।

করোনায় বিধিনিষেধের কারণে এবার পবিত্র হজ পালনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেউ মক্কায় যেতে পারেন নি বলে জানা গেছে।
অনেকে জামাত শেষে কাজে যোগ দেন। আবার অনেকে কুরবানী দিতে ফার্মে যান। কেউ কেউ ঘনিষ্টজন আর বন্ধুদের বাসায় গিয়েও ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। নামাজ শেষে অনেকেই বাংলাদেশে স্বজনদের সাথে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

প্রবাসীদের অনেকে গরু ও খাশী কুরবানী দেন। কিন্তু দেশের মতো পশু কিনে নিজ বাড়িতে নিয়ে কুরবানী করার সুযোগ না থাকায় অধিকাংশ প্রবাসী অবশ্য আগে থেকেই স্থানীয় গ্রোসারী ও হালাল পল্ট্রি ফার্মে কুরবানীর অর্ডার দিয়ে রাখেন। সুবিধামত সময়ে গ্রোসারী ও পল্ট্রি ফার্ম থেকে প্রবাসীরা তাদের পশু কুরবানীর মাংস নিয়ে যান। তবে গ্রোসারী ও পল্ট্রি ফার্ম অধিকাংশ কুরবানীর মাংস সরবরাহ করে ঈদের পরদিন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ঈদের নামাজ আদায়ে মসজিদ পরিচালনা কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং সিটি প্রশাসনের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল উল্লেখ করার মত। জামাতের আশপাশেই ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

ঈদের নামাজ আদায়ের স্থানগুলোর আশপাশের রাস্তায় ফ্রি গাড়ী পার্কিং থাকায় দূর দূরান্ত থেকে নির্বিঘেœ বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লী সপরিবারে ঈদের নামাজে শরীক হন। ২৮ শতাধিক মসজিদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে একাধিক ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে।

Loading...