‘ ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল মা, প্রতিটি দিনই হোক মা দিবস ’

বাপ্পী চৌধুরী::

মাত্র একটি অক্ষরের শব্দ ‘মা’। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর এবং শ্রেষ্ঠ শব্দ এটি। তাই কবিকেও লিখতে হয়- ‘মা কথাটি ছোট্ট অতি, কিন্তু জেনো ভাই, ইহার চেয়ে নাম যে মধুর তিন ভুবনে নাই।’  সন্তানের কাছে সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে প্রিয় তার ‘মা’। সম্পর্কের বেড়াজাল ছিন্ন করে সবাই দূরে সরে যেতে পারে। চলে যেতে পারে প্রেয়সীও। কিন্তু ‘মা’র স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধন কখনই ছিন্ন হওয়ার নয়। ‘মা’ এমন একজন, যিনি সারাজীবন সন্তানকে বুকের মধ্যে আগলে রাখেন।

আজ বিশ্ব মা দিবস। মা দিবসের মূল উদ্দেশ্য, মাকে যথাযথ সম্মান দেওয়া। যে মা জন্ম দিয়েছেন, লালন-পালন করেছেন, তাঁকে শ্রদ্ধা দেখানোর জন্য দিনটি পালন করা হয়।যদিও মাকে ভালোবাসা-শ্রদ্ধা জানানোর কোনো দিনক্ষণ ঠিক করে হয় না, তবুও মাকে গভীর মমতায় স্মরণ করার দিন আজ।

জন্মদাত্রী মা, যার কল্যাণে পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখা হয় সন্তানের। সেই মায়ের স্মরণে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার ‘বিশ্ব মা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। মাকে নিয়ে বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে আছে অনেক গান, কবিতা, গল্প ও কাহিনী।

মা হচ্ছেন একজন নারী, যিনি গর্ভধারণ, সন্তানের জন্ম তথা সন্তানকে বড় করে তোলেন। তিনিই সন্তানের প্রথম অভিভাবক ও আপনজন। সন্তানের পরম আশ্রয়। সন্তানের কাছে তার প্রতিটি দিনই মায়ের। তাইতো আবেগ ভালবাসা দুঃখ ও কষ্টে সবসময়েই সন্তানের মুখে অস্ফুট ‘মা’ শব্দটি সবার আগে বেরিয়ে আসে।

প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার এই দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়। মা অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত। ঘরে-বাইরে সর্বেক্ষত্রে মায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষেই দেশে দেশে মা দিবস পালন করা হয়।

ইউরোপ-আমেরিকায় ঘটা করে পালন করা হয় মা দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে যেমন ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় রোববার নরওয়েতে, মার্চের চতুর্থ রোববার আয়ারল্যান্ড, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাজ্যে এবং বাংলাদেশে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার দিবসটি পালন করা হয়।

জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে আনা জার্ভিস ও তার মা অ্যান মেরি রিভস জার্ভিসের উদ্যোগে মা দিবসের সূচনা হয়। আনা জার্ভিস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোর ও ওহাইওর মাঝামাঝি ওয়েবস্টার জংশনের বাসিন্দা ছিলেন। তার মা অ্যান মেরি রিভস জার্ভিস সারা জীবন ব্যয় করেন অনাথ-আতুরের সেবায়। মেরি ১৯০৫ সালে মারা যান। লোকচক্ষুর অগোচরে কাজ করা মেরিকে সম্মান দিতে চাইলেন মেয়ে আনা জার্ভিস। অ্যান মেরি রিভস জার্ভিসের মতো দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সব মাকে স্বীকৃতি দিতে আনা জার্ভিস প্রচার শুরু করেন।

সাত বছরের চেষ্টায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায় মা দিবস। ১৯১১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাজ্যে মা দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯১৪ সালের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেস মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

তবে মা দিবসের প্রবক্তা আনা জার্ভিস দিবসটির বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধিতা করে বলেছিলেন, মাকে কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর অর্থ হলো, তাকে দুই কলম লেখার সময় হয় না। চকলেট উপহার দেয়ার অর্থ হলো, তা নিজেই খেয়ে ফেলা।

বিশ্বব্যাপী মে মাসের দ্বিতীয় রোববারে মা দিবস পালিত হলেও, প্রতিটি দেশের নিজস্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি অনুযায়ী মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালবাসা জানিয়ে একটি দিবস পালনের রীতি আছে। প্রাচীন ইতিহাস ঘাঁটলেও এমন দিন খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না।

সন্তানের জন্য মা যে বিধাতার কী আমানত তা অংক করে মিলিয়ে দেখা যায় না! একজন মা মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে সন্তানকে জন্ম দেন। লালন-পালন করেন। মানুষ করেন এবং তারপর ধীরে ধীরে বার্ধক্যে উপনীত হন এবং তার প্রতিনিধি হিসেবে সন্তানকে পৃথিবীতে রেখে পরপারে পাড়ি জমান।

এ জন্যেই প্রতিটি ধর্মেই মায়ের স্থান দেওয়া হয়েছে পার্থিব জগতের সর্বোচ্চ আসনে।

এতদসত্ত্বেও কী বিচিত্র আমরা! যে বাবা-মা একসময় নিজে না খেয়েও সন্তানকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন, তারা আজ কোথায় কেমন আছেন, সেই খবর নেয়ার সময় যার নেই তার নিজের সন্তানও হয়তো একদিন তার সাথে এমন আচরণই করবে। বিভিন্ন উৎসবে, যেমন ঈদ,পূজা,বড়দিন এসব দিনেও যখন তারা তাদের সন্তানদের কাছে পান না, সন্তানের কাছ থেকে একটি ফোনও পান না, তখন অনেকেই নীরবে অশ্রুপাত করেন আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।

আমাদের মনে রাখা উচিত- আজ যিনি সন্তান, তিনিই আগামী দিনের বাবা কিংবা মা। বৃদ্ধ বয়সে এসে মা-বাবারা যেহেতু শিশুদের মতো কোমলমতি হয়ে যান, তাই তাদের জন্য সুন্দর জীবনযাত্রার পরিবেশ তৈরি করাই সন্তানের কর্তব্য। আর যেন কখনো কোনো বাবা-মার ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম না হয়, সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বৃদ্ধাশ্রম যেন না হয় বাবা-মার শেষ আশ্রয়,

এই ভয়াবহ মহামারী করোনাকালে করোনা আক্রান্ত মা/বাবাকে আমরা জঙ্গলে ফেলে এসেছি! পক্ষাঘাতগ্রস্থ বৃদ্ধা মা / বাবা মরছে না দেখে বহুতল ভবন থেকে তাকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছি! চালিয়ে দিতে চেয়েছি আত্মহত্যা হিসেবে!

এইসব ব্যত্যয় গুলোকে আমরা ব্যতিক্রম হিসেবে ধরে নিতে চাই এবং আজকের এই মা দিবসে শপথ নিতে চাই যে- মায়ের তুলনা শুধু মা ছাড়া আর কেউ নন। পৃথিবীতে একটি সন্তানের প্রথম স্পর্শ মা, প্রথম পাওয়া মা, প্রথম শব্দ মা, প্রথম দেখা মা,আমার গোটা পৃথিবী তুমি মা। পৃথিবীর কাছে যেমন সূর্যের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, মাছের কাছে যেমন জলের প্রয়োজনীয়তা, কবির কাছে যেমন কলমের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, ঠিক তেমনই সন্তানের কাছে রয়েছে মায়ের প্রয়োজনীয়তা। ওপরে যার শেষ নেই তা হল আকাশ। আর পৃথিবীতে যার শেষ নেই তাকে আমরা মা বলি।

দুনিয়ার সব কিছুই বদলাতে পারে,কিন্তু তোমার প্রতি আমার ভালবাসা কখনো বদলাবার নয় । যার ললাটের ঐ সিঁদুর নিয়ে ভোরের রবি ওঠে.. আলতা রাঙা পায়ের ছোঁয়ায় রক্ত কোমল ফোটে। সেই যে আমার মা, যার হয় না তুলনা। আমি কিছুই বলতে পারতাম না..তুমি আমার মনের সব কথা বুঝে যেতে..আজ আমি হয়ত অনেক কথার শেষে বলি, এসব তুমি বুঝবে না! কিন্তু বিশ্বাস কর আমি জানি সেটা সত্যি নয়। মা তোমায় অনেক ভালোবাসি। তুমি আমার চারপাশে তোমার স্নেহের আর যত্নের হাত রেখে আমায় কখনো কোনো কষ্ট পেতে দাও নি… চেয়েছো আমি যেন সবসময় ভালো থাকি। তোমার ঋণ শোধ করা কখনো সম্ভব নয় আমি জানি, সেই চেষ্টাও আমি করি না কখনো, শুধু চাই তুমি যেন চিরকাল আমার মাথায় তোমার আশীর্বাদের হাতটা একইভাবে রেখে দাও। অনেক ভালোবাসা মা। মা’কে নিয়ে লিখতে বসলে লিখা শেষ হবেনা ,মা’র তুলনা শুধুই মা । পরিশেষে বলবো মা পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ উপহার। স্রষ্টাকে পাওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম হলো মা। সর্বোপরি শুধু একটি দিনকে কেন্দ্র করে এই মহা সত্যকে পালন সম্ভব নয়- এটাই শেষ কথা নয়। এখন থেকে প্রতি দিবসই হোক মা দিবস। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল মা ।

 

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close