জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে আর্টিকেল নাইনটিনের ১৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি

আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ- ২০২০ ::

আজ  ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর দ্য এলিমিনেশন অব ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন’ বা আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। আজ থেকেই শুরু হচ্ছে ১৬ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষেরও। ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পর্যন্ত পৃথিবীর দেশে দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এ পক্ষ পালিত হবে। প্রতিরোধ পক্ষজুড়ে বাংলাদেশে আর্টিকেল নাইনটিন  অনলাইন আলোচনা সভা (ওয়েবিনার), অনলাইন ক্যাম্পেইন,  লিফলেট ও পোস্টার প্রকাশসহ জনসচেতনতা বৃদ্ধির একাধিক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে জেন্ডার সমতার গুরুত্ব এবং সকল ক্ষেত্রে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিতে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।   

বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের পর সম্মুখসারিতে থেকে যারা কাজ করছেন তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, এই সময়ে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতা তীব্র হয়েছে। এই প্রবণতাকে ‘ছায়া মহামারি’ (শ্যাডো প্যানডেমিক) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ। এমন প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক সংস্থাটি এবারের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য করেছে- ’অরেঞ্জ দ্যা ওয়ার্ল্ড: ফান্ড, রেসপন্ড, প্রিভেন্ট, কালেক্ট’। বাংলাদেশে দিবসটি ‘কমলা রঙের বিশ্বে নারী, বাধার পথ দেবেই পাড়ি’ শীর্ষক প্রতিপাদ্যে পালিত হবে। এ উপলক্ষ্যে আর্টিকেল নাইনটিন দুটি অনলাইন আলোচনা সভার আয়োজন করতে যাচ্ছে।  ২৬ নভেম্বর ২০২০ তারিখে ‘’কোভিডকালে জেন্ডার সহিংসতা: ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়’’ শীর্ষক প্রথম ওয়েবিনারটি অনুষ্ঠিত হবে । ‘’বাংলাদেশে নারীদের জন্য নিরাপদ সাইবারস্পেস নিশ্চিতে করণীয়’’ শীর্ষক দ্বিতীয় ওয়েবিনারটি অনুষ্ঠিত হবে ৫ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে। বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের (১০  ডিসেম্বর ২০২০) অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আর্টিকেল নাইনটিনের পক্ষকালব্যাপী এই আয়োজন শেষ হবে। আর্টিকেল নাইনটিন দক্ষিণ এশিয়ার ফেসবুক পেজে গিয়ে https://www.facebook.com/Article-19-South-Asia-100756264755798_) রেজিস্ট্রেশন  করে এসব অনুষ্ঠানে অনলাইনে অংশগ্রহণ করা যাবে।

 নারী ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা সৃষ্টির প্ল্যাটফর্ম-বেইজিং ঘোষণার ২৫তম বার্ষিকীও এবারের  নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে চীনের বেইজিংয়ে ১৮৯টি দেশের সরকার নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ১২টি ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য অঙ্গীকার করে। ক্ষেত্রগুলো হলো-  নারী ও দারিদ্র, নারীর  শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, নারী ও স্বাস্থ্য, নারী ও অর্থনীতি, নারী ও পরিবেশ, নারীর প্রতি সহিংসতা, নারী ও সশস্ত্র সংঘাত, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্র্রহণে নারীর ভূমিকা, নারীর অগ্রগতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, নারীর মানবাধিকার, নারী ও মিডিয়া এবং কন্যাশিশু। বেইজিং ঘোষণাপত্র ও প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশনকে সমর্থনকারী দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কিছু সংরক্ষণসহ ‘নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদেও ’(সিডও) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ।

বর্তমানে মহামারির প্রভাবে সৃষ্ট লকডাউন পরিস্থিতি, স্বাস্থ্য সংকট ও অর্থনৈতিক মন্দা-সব সংকটের বেশিরভাগ ভার বইতে হচ্ছে নারী ও কন্যাশিশুদের। কোভিড মোকাবেলায় সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকাংশই নারী হওয়ায় মহামারির শুরুর দিকে তাদের ওপর যুক্ত হয় বাড়তি চাপ। যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর (পিপিই) অভাবে এবং মহামারি চলাকালীন অনিশ্চয়তার কারণে তাদের অনেকেই অরক্ষিত হয়ে পড়েন। কোভিড-১৯ এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতেও। এসময়ে অসংখ্য দিনমজুর কাজ হারিয়েছেন। কিছু সময়ের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যও একেবারে স্থবির হয়ে গিয়েছিল। তবে কোভিড-১৯ এর সবচেয়ে বড় আঘাতের শিকার দেশের গার্মেন্টসকর্মীরা, যাদের অধিকাংশই হলেন নারী। 

বাংলাদেশের জিডিপিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি, তবুও নারী গার্মেন্টস কর্মীরা এখনও মজুরি বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মহামারিতে এই পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বিদেশ থেকে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমতে থাকায় শুরুতে অনেক শ্রমিককে ছাঁটাই ও চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর সীমিতসংখ্যক কর্মী নিয়ে কারখানাগুলো পুনরায় চালু হলেও  সেখানে স্বাস্থ্য সুরক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অবশ্য কেবল নারী গার্মেন্টসকর্মীরা নন, কোভিডের এই সময়ে অন্য পেশার নারীদেরও টিকে থাকতে লড়াই করতে হচ্ছে। আর্টিকেল নাইনটিনের উদ্যোগে সৃষ্ট ’নারী সাংবাদিকদের নেটওয়ার্ক’ এর মতে, নিয়োগের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য থেকে শুরু করে পদোন্নতিতে বাধা, প্রতিকূল কর্মপরিবেশ, যৌন হয়রানি- এ ধরনের বহু প্রতিবন্ধকতা পার হয়েই সাংবাদিকতা করতে হয় নারীদের। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে এই প্রতিবন্ধকতাগুলোর সাথে নতুন করে আরও সমস্যা যুক্ত হয়েছে। কেবল নারী হওয়ার কারনে ছাঁটাইয়ের তালিকায় নারী সাংবাদিকের নাম আসছে সবার আগে। অনলাইন এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে নারীরা  কোন ইস্যূতে সরব হলে  অহেতুক হয়রানি ও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। 

কোভিড-১৯ বিশ্বের প্রত্যেককে প্রভাবিত করেছে এবং আমাদের প্রতিদিনের জীবন বদল দিয়েছে। তবে এটি নারী, মেয়েশিশু, ছেলেশিশু  এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলির ওপর প্রভাব ফেলেছে সবেচেয়ে বেশি। পদ্ধতিগত ব্যর্থতা বহু বছর ধরে এই চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে এবং মহামারির কারনে এগুলি এখন আরও বেড়েছে। জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা দূরীকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে জেন্ডার সমতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখনো দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হবে।  আর্টিকেল নাইনটিন সমাজের সকল ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণ এবং নারী, মেয়েশিশু ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর  সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বিষয়ে আরও উন্নত পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানায়।

— বিজ্ঞপ্তি ।।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close