দক্ষিণ চীন সাগর: চীনের আগ্রাসন থেকে মিত্রদের রক্ষা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

সুরমা টাইমস ডেস্ক::

দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন অংশের মালিকানা নিয়ে ওই অঞ্চলের দেশগুলোর বিরোধ শতাব্দি পুরনো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিংয়ের আগ্রাসী ভূমিকায় অঞ্চলটিতে উত্তেজনা বেড়েছে। এদিকে আবার দক্ষিণ চীন সাগরের ‘বেশিরভাগ সম্পদ’র ওপর চীনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বেইজিংয়ের দাবিকে ‘পুরোপুরি বেআইনি’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। পাশাপাশি তিনি চীনের আগ্রাসী ভূমিকারও নিন্দা জানিয়েছেন। দক্ষিণ চীন সাগরের অঞ্চলে মিত্রদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পাশেও দাঁড়াচ্ছে ওয়াশিংটন।

চীনের দাবিকে বেআইনি অ্যাখ্যা দেওয়ার পরই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বেইজিং। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে মার্কিনিরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তথ্য ও আন্তর্জাতিক আইনের বিকৃতি ঘটাচ্ছে।

দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপে সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করছে চীন। আর চীনের এমন কাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের দাবি বেইজিং দক্ষিণ চীন সাগরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছে। চীন ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্কের অবনতির মধ্যেই দক্ষিণ চীন সাগরের কর্মকাণ্ডকে ‘বেআইনি’ বলে মন্তব্য করেছেন পম্পেও। তবে এটি স্পষ্ট নয়, এই বিষয়টিতে যুক্তরাষ্ট্র কি ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। কিন্তু মনে করা হচ্ছে, দেশটি তার নিজের অবস্থানেই অটল থাকবে। 

সাগরের বিতর্কিত এ জলসীমার কৃত্রিম দ্বীপে চীন সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করলেও সেখানে ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামও মালিকানা দাবি করেছে। দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় পুরোটাই তারা দাবি করে আসছে। এই দেশগুলো কয়েক দশক ধরেই এমন দাবি করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এনিয়ে উত্তেজনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাগরের ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ নামে পরিচিত এলাকার মালিকানা দাবির পাশাপাশি চীন সেখানে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ, টহল ও সামরিক উপস্থিতির পরিমাণ বাড়িয়েই চলেছে। কিন্তু চীনের দাবি, তাদের এমন কর্মকাণ্ড শান্তিপূর্ণ। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, নৌপথে অনিরাপত্তা বাড়ছে।

দক্ষিণ চীন সাগরে দুটি দ্বীপপুঞ্জের (প্যারাসেলস ও স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জ) আশেপাশে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদ রয়েছে। জলসীমাটি মৎস শিকার ও বাণিজ্যিক জলযান চলাচলের ক্ষেত্রেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাৎসরিক প্রতিরক্ষা পর্যালোচনাতে জাপান বলছে, জলসীমায় চীনের বর্তমান কার্যক্রম চরম উদ্বেগজনক। দেশটি বেইজিংকে দোষারোপ করে বলছে, চীন পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করতে চেষ্টা করছে।

পম্পেও কী বললেন?

সম্প্রতি পম্পেওর বিবৃতিতে স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশে চীনা দখলের সব দাবি খারিজ করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি নিন্দাও জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই অঞ্চলটিতে একতরফাভাবে দাবি চাপিয়ে দেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি নেই বেইজিংয়ের।

ভিয়েতনামের কাছে ভ্যানগার্ড ব্যাংক, মালয়েশিয়ার কাছে লুকোনিয়া শোলস, ব্রুনেইয়ের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইন্দোনেশিয়ার কাছে নাতুনা বেসার ও এর আশপাশের জলসীমায় চীনের সব দাবি নাকচ করে দিয়েছে পম্পেও। তবে এর আগে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, আঞ্চলিক বিরোধ নিয়ে কোনো দেশের পক্ষ নেবে না দেশটি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, দক্ষিণ চীন সাগরের বেশিরভাগ অংশের সম্পদের ওপর বেইজিংয়ের দাবি এবং সেসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ পেতে তারা যে ধরনের তর্জন-গর্জন ও প্রচারণা চালাচ্ছে, তা একেবারেই বেআইনি। দক্ষিণ চীন সাগরকে বেইজিং তার সামুদ্রিক সাম্রাজ্য বানাতে চাইলেও বিশ্ব তা মেনে নেবে না।

চীন যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানাল::—

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন দাবির কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত চীন দূতাবাস। টুইটারে দেওয়া বিবৃতিতে চীনা দূতাবাস বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে তথ্য এবং জাতিসংঘের সমুদ্র আইনসহ আন্তর্জাতিক আইনের বিকৃতি ঘটাচ্ছে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরের পরিস্থিতিকে বাড়িয়ে বলছে এবং চীনের সঙ্গে উপকূলবর্তী বিভিন্ন দেশের বিরোধের বীজ বপণের চেষ্টা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে অহেতুক। চীন এমন অভিযোগের বিরোধিতা করছে। 

আপাতদৃষ্টিতে ছোট দ্বীপগুলো নিয়েই বড় ঝুঁকি::—

দক্ষিণ চীন সাগরের ছোট ছোট দ্বীপগুলো নিয়ে এর আগে কোনো দেশের পক্ষ বা চীনের বিপক্ষে কোনো ধরনের কথা বলেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সম্প্রতি এই দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর আগে হেগের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল একটি রায় দিয়েছেন। যাতে বলা হয়, দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলে চীনা দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এরপরই আসে যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতি। কিন্তু এখনই কেন চীনের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়লো ওয়াশিংটন?

গত সপ্তাহে একই সময় চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নৌ মহড়া চালিয়েছে একই এলাকায়। এমন অবস্থায় এক ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আরো বড় পরিপ্রেক্ষিতে বলতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসন চীন সম্পর্কে নীতিগত ব্যর্থতা মুছে দিতে চাইছে। 

সম্প্রতি ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে জিনজিয়াংয়ের মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং হংকংয়ে গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভ মোকাবেলা করার বিষয়গুলো নিয়েও সমালোচনা করেছে। তবে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের জলসীমা দখলের প্রকল্পগুলো বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে উত্তেজানা বাড়িয়েছে।

বর্তমানে এই অঞ্চলে বিপদের লক্ষণ বাড়ছে। আপাতদৃষ্টিতে ছোট ছোট ‘দ্বীপপুঞ্জ‘ ও রিফগুলো নিয়ে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছেই। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী দু’টি দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিও ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছেই।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও বলেন, আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় মিত্র ও ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সমুদ্র সৈকতের সম্পদের অধিকারের সার্বভৌম রক্ষায় তাদের পাশে যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের এই অবস্থানটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের অধিকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধের পেছনে কী? 

জনশূন্য প্যারাসেলস ও স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করা দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বিরোধ ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই অঞ্চলটি। চীন ওই দ্বীপগুলোর ভূখণ্ডের বৃহত্তম অংশ দাবি করে বলেছে যে, বহু শতাব্দি ধরে তারাই মালিক এই অঞ্চলটির। 

অঞ্চলটিতে চীনের সামরিকীকরণ নিয়ে বহু আগে থেকেই সমালোচনা করে আসছে ওয়াশিংটন। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের এমন কাণ্ড নৌপথে চলাচলের স্বাধীনতার হুমকিও বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র।

২০১৮ সালের আগস্টে মার্কিন সামরিক বিমানে করে বিতর্কিত ওই দ্বীপপুঞ্চতে পৌঁছায় বিবিসির একটি দল। তখন রেডিও যোগাযোগব্যবস্থায় পাইলটদের ওই জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। যেকোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির আগেই দ্রুত ওই অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়।

কয়েক মাস আগে বিতর্কিত ওই অঞ্চলে চীন বোমারু বিমান মোতায়েন করে। সেখানে ওই বোমারু বিমানগুলো সামরিক মহড়াও চালায়। এসব কিছুর পরও চীন যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করছে। বেইজিংয়ের অভিযোগ, আঞ্চলিক বিষয়ে উসকানি ও হস্তক্ষেপ করছে মার্কিন নৌবাহিনী।

সূত্র:— বিবিসি।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close