পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাপ্তাহিক ‘সুরমা টাইমস’ এর পক্ষ থেকে সবাইকে শুভেচ্ছা

ঈদ মানে খুশি বা আনন্দ। আমাদের প্রিয় পাঠক, লেখক, প্রতিনিধি, বিজ্ঞাপনদাতা, এজেন্ট, শুভানুধ্যায়ীসহ—সবাইকে পবিত্র ঈদ উল আজহা’র শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসলিম জাতির জন্য সৌভাগ্যের পুরস্কারস্বরূপ বছরে দু’টি ঈদ দিয়েছেন, তার একটি ঈদুল ফিতর আরেকটি হলো ঈদুল আজহা। 

ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ, উৎসব বা বারবার ফিরে আসা। আর আজহা শব্দটির অর্থ ত্যাগ, উৎসর্গ বা কোরবানির পশু জবেহ করা ইত্যাদি। আর কোরবান অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য, উৎসর্গ। উল্লিখিত শব্দ এবং অর্থগুলো থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, ত্যাগ বা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের যে চেষ্টা করা হয় তাকেই ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ বলে।

প্রচলিত অর্থে কোরবানি হলো পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে পশু জবাই করা।

মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি।’ 

সূরা কাউছারে বলেছেন, ‘সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে সালাত আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সূরা কাওসার, আয়াত-২) অনুরূপভাবে রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, কোরবানির দিনে মানবসন্তানের কোনো নেক আমলই আল্লাহ তায়ালার কাছে এত প্রিয় নয়, যত প্রিয় কোরবানি করা। আর কোরবানির পশুর শিং, পশম ও ক্ষুর কিয়ামতের দিন (মানুষের নেক আমলনামায়) এনে দেয়া হবে। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানি করো (তিরমিজি)। 

জাকাতের মতো কঠোর নির্দেশও আছে। মানুষ শুধু ইসলামকে ভালোবাসি ভালোবাসি বললেই হবে না, তার প্রমাণ ও পরীক্ষাও দিতে হবে। হাদিস শরিফে উল্লেখ আছে, যে ব্যক্তি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করবে না সে যেন ঈদগাহের কাছেও না আসে (ইবনে মাজাহ)। তাহলে কী বোঝা গেল? ঈদ শুধু আনন্দের নয়, কর্তব্য পালনের পরীক্ষাও। 

মানব ইতিহাসে কোরবানির বিষয়টি সুপ্রাচীন। যার ভাবার্থ কোরবানির ত্যাগের মাধ্যমে সাওয়াব লাভ করা। সব নবীর জন্যই কোরবানির পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কেউ দেশ ত্যাগে কেউ নিকটাত্মীয় ত্যাগ করে আর কেউ জীবনের হাসি আনন্দ ও সর্বোৎকৃষ্ট বস্তুকে ত্যাগ করে নজরানা পেশ করেছেন। যারা অলি আল্লাহ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন তারাও নিরলসভাবে আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য সব কিছু ত্যাগ করেছেন।

আমরা বর্তমানে যে কোরবানি করে থাকি তা মুসলিম জাতির জনক হজরত ইব্রাহিম আ:-এর সুন্নত হিসেবেই করি। তিনি আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে নিজের সর্বপ্রিয় পুত্রকে কোরবানি করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন। এ বিষয়টি এতই গ্রহণযোগ্য হয়েছে যে, আমাদের ওপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরবানির নির্দেশনা ত্যাগ-তিতিক্ষার সেই উদাহরণকে কিয়ামত পর্যন্ত শিক্ষণীয় হিসেবেই জীবন্ত করে রেখেছেন।

হযরত ইব্রাহিম আ: স্বপ্নযোগে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দেয়ার জন্য আদিষ্ট হন। এরপর তিনি ১০টি উট কোরবানি করেন। আবারো একই স্বপ্ন দেখেন নবী ইব্রাহিম আ:। এবার তিনি ১০০টি উট কোরবানি করলেন। তৃতীয়বার যখন একই স্বপ্ন দেখলেন তখন তিনি বুঝতে পারলেন, আমার কাছে প্রিয় বস্তু একমাত্র কলিজার টুকরো সন্তান ইসমাঈল আ: ছাড়া আর কিছুই নয়। মূলত তিনি যে মানের তার ত্যাগও হবে সেই মানের। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাও তাই ছিল।

ইব্রাহিম আ: এ ব্যাপারটা প্রাণপ্রিয় সন্তান অবুঝ শিশু ইসমাঈল আ:-এর সাথে মতামত চাইলেন, কোরআনের ভাষায়- ইয়া বুনাইয়া ‘ইন্নি আরা ফিল মানাম আন্নি আজবাহুকা’ হে বৎস! নিশ্চয়ই আমি স্বপ্ন দেখেছি তোমাকে জবেহ করছি। সন্তানের পক্ষ থেকে উপযুক্ত জবাব ‘ইয়া আবাতিফড়াল মাযা তু’মার ছাতাযেদুনি ইনশাল্লাহ’ ‘আব্বাজান! আপনি যে বিষয়ে আল্লাহর তরফ থেকে আদিষ্ট হয়েছেন, তা পূর্ণ করুন। ইনশা আল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সূরা সাফফাত, আয়াত ১০২)

আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে হজরত ইব্রাহিম আ: ও মা হাজেরা কোরবানির জন্য কলিজার টুকরো পুত্রকে সাজিয়ে নিলেন। আমাদের কোরবানি কি এমন আত্মত্যাগের নমুনা হয়? আমরা কি স্মরণ করি আল্লাহর পরীক্ষা চলছে আমাদের আর্থিক কোরবানির মধ্য দিয়ে? বালক ইসমাঈল আ:-কে মা বাবা এমন শিক্ষা দিয়েছেন যে সেও নিজের জানকে আল্লাহর রাহে বিলিয়ে দিয়ে আত্মত্যাগের বিস্ময়কর ইতিহাস সৃষ্টি করলেন।

আল্লাহর প্রেমিক হজরত ইব্রাহিম (আ:)-এর ধারালো ছুরি হজরত ইসমাঈল আ:-এর ঈমানি শক্তির কারণে একটি পশমও কাটতে পারেনি। তার পরিবর্তে আল্লাহর হুকুমে জিব্রাইল আ: বেহেশত থেকে জান্নাতি দুম্বা এনে ইসমাঈল আ:-এর স্থলে রাখলে তা কোরবানি হয়ে যায়। 

ঈমানের সর্বোচ্চ নমুনা হলো আল্লাহর এই বাণী আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলো, আমার সালাত, আমার হজ ও কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশ্যে।’ (সূরা আনআম, আয়াত-১৬২) যিনি এমন মানসিকতা রাখবেন আল্লাহ তার ওপরই সন্তুষ্ট থাকবেন।

যার ওপর জাকাত ফরজ তার ওপর কোরবানিও ওয়াজিব। (অর্থাৎ ১০ জিলহজের ফজর হতে ১২ জিলহজের সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পারিবারিক প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী বাদ দিয়ে কোনো ব্যক্তি যদি ‘নেসাব’ পরিমাণ মালের মালিক হয়, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। শরিয়তের ভাষায় নেসাব পরিমাণ মাল বলা হয়, সাড়ে ৫২ তোলা রুপা অথবা সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণ কিংবা তৎসম মূল্যের সম্পত্তির বাংলাদেশী টাকা।) এখানেও একটি হেকমত দেখেছেন? সোনা রুপা যাই হোক না কেন, এর অর্থ হলো যে দেশে যেটার মূল্য প্রাধান্য পায় সেজন্য দু’টি মূল্যবান সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন।

আমাদের সমাজে আজ অনেককে বড় বড় পশু ক্রয় করে প্রদর্শন করা কিংবা বাহাদুরি জাহির করতে দেখা যায়। আবার অনেককে দেখা যায় গরিব-মিসকিনদের যথাযথভাবে না দিয়ে ঈদের দিন নিজেরা যৎসামান্য গোশত রান্না করবে; আর বাকিটা ফ্রিজে রেখে দেয়। এরপর সারা বছর কিছু কিছু নিয়ে নিজেরা খায়। এগুলোর কোনো প্রকারই প্রকৃত কোরবানির পর্যায়ে পড়ে না।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘বলো, আমার সালাত, আমার হজ ও কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সবাই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশ্যে।’ (সূরা আনআম, আয়াত-১৬২)

অতএব লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বড় বড় গরু ক্রয় করে প্রদর্শন করা, বাহাদুরি জাহির করা অথবা গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি হবে না, বরং হালাল উপার্জন, ইখলাছ ও একনিষ্ঠতাই হলো কোরবানি কবুল হওয়ার আবশ্যকীয় শর্ত, কে কত টাকা দিয়ে পশু ক্রয় করল, কার পশুটি কত মোটাতাজা বা সুন্দর, আল্লাহ তা দেখেন না। তিনি দেখেন সহিহ নিয়ত ও তাকওয়া। হাদিসের ভাষায়Ñ ইন্নাল্লাহা লা ইয়ানযুরু ইলা ছুরাতেকুম অলাকিন ইয়ানযুরু ইলাকুলুবেকুম ও আ’মালেকুম। 

আল্লাহ কারো চেহারার দিকে তাকাবেন না বরং তিনি তাকাবেন তোমাদের অন্তর এবং আমলের দিকে।

এ বছর এক ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মানুষ। সারা বিশ্বেই একই অবস্থা। এই বাস্তবতার মধ্যেই এসেছিল ঈদুল ফিতর। দু মাস আগে যখন মহা আনন্দের এই দিনটি হাজির হয়েছিল, তখন কোথাও ছিল না কোনো উদ্‌যাপনের রং। শুধু প্রার্থনাই যেন সত্য হয়ে উঠেছিল। দু মাস পর পরিস্থিতির খুব একটা বদল হয়েছে বলা যাবে না। আগের মতোই এক নতুন ভাইরাসের সংক্রমণে নাকাল হয়ে আছে বিশ্ববাসী। আগের মতোই নতুন এই করোনাভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক মানুষ হাতে পায়নি। নেই কোনো ভ্যাকসিন। শুধু কিছু সুরক্ষা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এখনো মানুষের সম্বল। যতটুকু যা স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে, তার বেশির ভাগটাই এসেছে অভ্যস্ততার কারণে।
দীর্ঘ দিন দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কারণে যে অভ্যস্ততা জন্ম নিয়েছে, তার মধ্যেই উদ্‌যাপিত হতে যাচ্ছে ঈদুল আজহা। পশু কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগের মহিমাকীর্তন করা এই উৎসবের মাধ্যমে আবার সবাই এক জোট হওয়ার আশায় ছিল। কিন্তু সেই আশা এবারও পূরণ হওয়ার নয়। অন্তত আগের মতো এক কাতারে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদের নামাজ পড়ে কোলাকুলি করে শুভেচ্ছা বিনিময়ের রেওয়াজকে এবারও নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। করোনাভাইরাসের কারণে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক সংকটে আগের মতো অনেকেই এবার পশু কোরবানি দিতে পারবে না। অনেকের পক্ষে এমনকি ঈদের দিন ভালো খাবারের আয়োজন করাও কষ্টকর হয়ে যাবে। অনেকের পক্ষে এমনকি সব থাকা সত্ত্বেও উৎসব করাটা অসম্ভব হয়ে উঠবে প্রিয়জন হারানোর কারণে।
নতুন বাস্তবতায় এই ঈদ তাই নতুন এক আহ্বান নিয়ে হাজির হয়েছে। এই ঈদুল আজহা সত্যিকার অর্থেই এক ত্যাগের ও সহমর্মিতার আহ্বান জানাচ্ছে। অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন পীড়িত, দুস্থ ও সংকটগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। আর্থিকভাবে কিংবা স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় প্রায় প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে সংকটে। তাই এই ঈদুল আজহা সবাইকে পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোর, পরস্পরকে ভালোবাসার আহ্বান নিয়ে হাজির হয়েছে। আর এই ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা সবার প্রতি। এবারও আগের মতো ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু মনে রাখা জরুরি যে, করোনাভাইরাসের কোনো টিকা বা কোভিড-১৯ এর সুনিশ্চিত চিকিৎসা মানুষ এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি। তাই শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার নীতিটি আগের মতোই অবশ্যপালনীয়। আশা করা যায়, সবাই সেই সতর্কতা মেনে চলে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।
সবাইকে ঈদ মোবারক।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাপ্তাহিক সুরমা টাইমস পত্রিকার সকল পাঠক, সংবাদকর্মী, প্রতিনিধিবৃন্দ, বিজ্ঞাপনদাতা , এজেন্ট এবং শুভান্যুধায়ীসহ সবাইকে পবিত্র ঈদ উল আজহা’র আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন সাপ্তাহিক সুরমা টাইমস এর সম্পাদক ও প্রকাশক হাবিবুর রহমান তাফাদার ।।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close