ইতালির শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে সংক্রান্ত সংবাদটি ভূয়া

ইতালি থেকে মাঈনুল ইসলাম নাসিম ::

ইতালির শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের এমন শিরোনামে ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে অতি সম্প্রতি প্রকাশিত বিশেষ একটি প্রতিবেদন নিউজ এনআরবি প্রবাসী সংবাদ প্রবাহের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রতিবেদনের প্রায় পুরোটা জুড়ে মিথ্যা বানোয়াট ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশিত হওয়ায় বাংলাদেশে অবস্থানরত দালালচক্র ইতালি পাঠাবার নামে প্রতারণার নতুন বাজার খোলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ফলে বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থে বাস্তবতা তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করছে নিউজ এনআরবি প্রবাসী সংবাদ প্রবাহ। 

ঢাকাস্থ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) থেকে ভিত্তিহীন তথ্য নিয়ে প্রকাশিত ভূয়া প্রতিবেদনে বলা হয়,“ইতালিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম শ্রমিক রফতানি করা হয়েছিল ২০০২ সালে। ২০০২ সালে ১৯ জন শ্রমিক দেশটিতে গিয়েছিলেন। ২০০২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইতালিতে ৫৫ হাজার ৫২০ জন শ্রমিক রফতানি করে বাংলাদেশ। ১৮ বছরের মধ্যে ২০০৭ সালে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক রফতানি হয়েছিল ১০ হাজার ৯৫০ জন। ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে দেশটিতে শ্রমিক রফতানি করে বাংলাদেশ”। 

বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে শুধুমাত্র ২০০৬-২০০৭ মৌসুমে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রথম ও শেষবারের মতো মোট ৪৫ জন নার্স ইতালিতে আসেন। এর আগে বা পরে সরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে জনশক্তি রপ্তানির কোন রেকর্ড নেই। ২০০২ থেকে ২০১৯ ইতালিতে ৫৫ হাজার ৫২০ জন শ্রমিক রফতানির যে তথ্য দেয়া হয়েছে, মজার ব্যাপার হচ্ছে উক্ত সাড়ে ৫৫ হাজার বাংলাদেশি ইতালিতে আগে থেকেই বসবাসরত আত্মীয় স্বজনের কাগজপত্রে অথবা দালালের মাধ্যমে ন্যুনতম ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা (ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি) খরচায় ফ্লুসসি কিংবা সিজনাল ভিসায় ইতালি আসেন।

উপরোক্ত সাড়ে ৫৫ হাজার বাংলাদেশি বৈধভাবে ইতালি এলেও তারা কেউই সরকারি ব্যবস্থাপনায় ইতালিতে আসেননি। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কোন উদ্যোগ বা ভূমিকা ছিলো না উক্ত সাড়ে ৫৫ হাজার লোককে ইতালি পাঠাতে। “২০০৭ সালে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক রফতানি হয়েছিল ১০ হাজার ৯৫০ জন” সংক্রান্ত যে তথ্য বিএমইটি’র বরাত দিয়ে বলা হয়েছে সেটিও ডাহা মিথ্যা। দালাল কিংবা আত্মীয় স্বজনের উদ্যোগে ১০-১৫ লাখ টাকায় যারা ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন নিজ দায়িত্বে তাদেরকে ‘জনশক্তি/শ্রমিক রফতানি’ ক্যাটাগরিতে ফেলার কোন সুযোগ নেই।  মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্যের ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়,“২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ইতালিতে শ্রমিক রফতানি করে বাংলাদেশ”।

দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জাস্কর সত্য হচ্ছে, ২০০৮ থেকে ২০০১২ এই ৫ বছরে সিজনাল জব ভিসায় যে ১৮ হাজার বাংলাদেশি বৈধভাবে ইতালি আসেন তাদের মধ্যে মাত্র ৫০-৬০ জন ইতালির আইন মেনে সিজন শেষে বাংলাদেশে ফেরত যান। উক্ত ১৮ হাজার বাংলাদেশির অর্ধেক আবার ইতালি থেকে পালিয়ে যান অন্য দেশে। ফলে যৌক্তিক কারণে ২০১৩ থেকে সিজনাল ভিসায় ইতালী সরকারের কালো তালিকাভুক্ত হয় বাংলাদেশ, যা এখনো বহাল আছে। 

কালো তালিকা থেকে বাংলাদেশের মুক্তি পাওয়া না পাওয়া প্রসঙ্গে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি বলেছেন,“ইদানীং আমরা ইতালির সরকারকে শ্রমিক পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছি, তারা এতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। কৃষি খাতে মৌসুমি শ্রমিক নেয়ার তালিকায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার আশ্বাস দিয়েছে। ইতালি সরকার এটি তাদের সংসদে পেশ করবে। সংসদ এ প্রস্তাব গ্রহণ করলে বাংলাদেশ থেকে কৃষি খাতে মৌসুমি শ্রমিক ইতালি যেতে পারবেন”।

বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোন বিল ইতালীয় সংসদে উত্থাপনের সুযোগ নেই। কৃষি খাতে শ্রমিক সংকট দূর করতে ইতালির ভেতরে থাকা অবৈধদের এখন বৈধ করে নিচ্ছে ইতালীয় সরকার। তাছাড়া শুধু পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতবারই ইতালি সফর করেছেন ততোবারই তিনি সরকার প্রধান পর্যায়ে অনুরোধ জানিয়েছেন যাতে বাংলাদেশকে কালো তালিকামুক্ত করে সিজনাল ভিসার কোটা পুনরায় চালু করা হয়। গত ৮ বছর ইতালিতে দায়িত্বপালনকারী দুই রাষ্ট্রদূত শাহাদৎ হোসেন এবং আবদুস সোবহান সিকদার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন সিজনাল জব ভিসার কলংক থেকে বাংলাদেশকে মুক্তি দিতে। 

দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে নতুন করে সিজনাল জব ভিসায় শ্রমিক ইতালিতে এলে সিজন শেষে তারা আদৌ নিজ দেশে ফিরে যাবেন কি-না তা আজ অবধি কোনভাবেই আশ্বস্ত হতে পারেনি ইতালিয়ান সরকার বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়। কারণ তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে, দালালের মাধ্যমে আসুক বা সরকারের ব্যবস্থাপনায় আসুক বাংলাদেশিরা সিজনাল ভিসায় এসে ইতালিতেই রাজনৈতিক/মানবিক আশ্রয় প্রার্থনা করে বসবে কোন না কোন কারণ দেখিয়ে অথবা অতীতের মতোই ইতালিকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে ইউরোপের অন্য দেশে পাড়ি জমাবে। 

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close