কেন ঢাকায় নিতে হলো সিলেটের করোনা আক্রান্ত চিকিৎসককে? চলছে ব্যাপক তোলপাড়

সিলেটে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রান্ত চিকিৎসকে বুধবার বিকেলে ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এনিয়ে চলছে ব্যাপক তোলপাড়। মাত্র একজন করোনা আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হওয়ার পরও কেনো তাকে সিলেটে চিকিৎসা প্রদান সম্ভব হলো না, এমন প্রশ্ন ওঠেছে। রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেলে তখন অবস্থা কী দাঁড়াবে, এই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

দিনভর এনিয়ে চলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। তরুণ অনেক চিকিৎসককে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। সিলেটে করোনা চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা, অপ্রতুল সরঞ্জাম ও লোকবলের অভাবের অভিযোগ তুলেন তাদের অনেকে।

সমালোচনার মুখে রাতেই ওসমানী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে হয়। সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেন, ওই চিকিৎসকের পরিবারের আগ্রহেই তাকে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। সরঞ্জাম ও লোকবলের অপ্রতুলতার বিষয়টি অস্বীকার করেন তারা।

গত রোববার (৫ এপ্রিল) সিলেটে করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) প্রথম আক্রান্ত হিসেবে এই চিকিৎসককে সনাক্ত করা হয়। প্রথমে তাকে বাসায় রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিলো। তবে মঙ্গলবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে সিলেটে করোনা আইসোলেশন ইউনিট হিসেবে চালু করা শামসুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বুধবার সকালে তার অবস্থার আরও অবনতি হয়।

যে কোনো মুহূর্তে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান চিকিৎসকরা। এতেই দেখা দেয় বিপত্তি।

সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শামসুদ্দিন হাসপাতালে দুটি ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) বেড সম্প্রতি প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানে ভেন্টিলেন্টর থাকলেও সেন্ট্রাল অক্সিজেন, সেন্ট্রাল এয়ারকুলারসহ কিছু সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। যা আইসিইউ’র জন্যে আবশ্যক। এছাড়া আইসিইউ পরিচালনার জন্যে শামসুদ্দিন হাসপাতালে সার্বক্ষণিক কোনো লোকবল নেই। ওসমানী হাসপাতাল থেকেই চিকিৎসকসহ অন্য স্টাফদের এনে আইসিইউ পরিচালনা করতে হবে। এদিকে, ওসমানী হাসপাতালেও আইসিইউ পরিচালনার জন্য জনবল পর্যাপ্ত নয়। এদের শামসুদ্দিন হাসপাতালে নিয়ে আসলে ওসমানীর আইসিইউতে থাকা রোগীরা বিপাকে পড়বেন।

এই সঙ্কটের মধ্যে বুধবার দুপুরে চিকিৎসকদের নিয়ে বৈঠকে বসেন ওসমানী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতে তরুণ চিকিৎসকদের তোপের মুখে পড়েন হাসপাতালের কর্মকর্তারা। করোনা চিকিৎসায় অপ্রতুল সরঞ্জাম ও লোকবলের অভাবের অভিযোগ এনে ক্ষোভ ঝাড়েন তারা।

ওই বৈঠকে উপস্থিত একাধিক চিকিৎসক জানান, শামসুদ্দিন হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় আক্রান্ত চিকিৎসককে ওসমানী হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়ার প্রস্তাব দেন কেউ কেউ।

তবে অন্য রোগীরা সংক্রমিত হতে পারেন ভেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এই প্রস্তাবে সম্মতি পাওয়া যায়নি।

পরে নগরীর দুটি বেসরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করেন চিকিৎসকরা। তবে করোনা রোগীদের সেবা দেওয়ার মতো প্রস্তুতি নেই বলে জানায় ওই দুই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এ অবস্থায় আক্রান্ত চিকিৎসকের স্ত্রী, যিনি নিজেও সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, তিনি স্বামীকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। অবস্থার প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এতে সম্মতি দেন।

তবে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও দেখা দেয় বিপত্তি। রোগীর স্বজনসহ অনেক চিকিৎসক এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ঢাকায় নিয়ে যেতে চাইলেও এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি। উন্নত সেবা সম্বলিত সরকারি কোনো অ্যাম্বুলেন্স সিলেটে না থাকায় বেসরকারি একটি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে করেই তাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ ও সিলেট করোনা আইসোলেশন ইউনিটের সভাপতি অধ্যাপক ডা. শিশির রঞ্জন চক্রবর্তী সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, আমাদের লোকবল বা সরঞ্জামাদির অপ্রতুলতা নেই। শামসুদ্দিন হাসপাতালের দুটি আইসিইউ বেড প্রস্তুত আছে। আরও আইসিইউ বেড বাড়ানোর জন্য আমরা বৃহস্পতিবার বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে বৈঠকে বসবো। সিলেটের বেসরকারি হাসপাতালগুলো ৭০টি আইসিইউ বেড রয়েছে। এগুলো এখন কাজে লাগানো যায় কি না এই ব্যাপারে আলোচনা করবো।

বুধবার রাতে ওসমানী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও একই ধরণের দাবি করা হয়েছে। শামসুদ্দিন হাসপাতালে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় বলেন, আক্রান্ত চিকিৎসকের পারিবারের ইচ্ছায় ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। এখানে চিকিৎসার ত্রুটি আছে বলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কিছু নেই।

এসময় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. ইউনুসুর রহমান বলেন, শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে করোনা আক্রান্তদের সেবার দুটি আইসিইউ ইউনিট কার্যকর আছে। দুদিনের মধ্যে আরও ৯টি ইউনিট পুরোপুরিভাবে চালু হবে। ৯টি ভেন্টিলেশন মেশিন বৃহস্পতিবার সিলেটে এসে পৌছার কথা রয়েছে। দুয়েকদিনের মধ্যে এ হাসপাতালে ১১টি ভেন্টিলেশন মেশিন চালু হবে।তিনি বলেন, সিলেটে করোনা আক্রান্তদের সেবায় প্রস্তুত রয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে বিভাগের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে করোনামুক্ত রাখতে সেখানে আইসিইউ বিভাগে কাউকে ভর্তি করা হচ্ছে না।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close