‘করোনা’: বাংলাদেশে মারা যেতে পারে ২০ লাখ মানুষ!

“ ছবিটি গত রোববার (০৫ই এপ্রিল) রাজধানীর শ্যামপুর থানার জুরাইন নতুন সড়কে পড়ে থাকা অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মরদেহ,
করোনা আতঙ্কে কেউই মরদেহটির কাছে যায়নি, পরবর্তীতে পুলিশ এসে মরদেহটি উদ্ধার করে ।। যদিও লোকটি করোনা আক্রান্ত কি না তা জানাযায়নি ।। ”

“জাতিসংঘের প্রতিবেদন ফাঁস” :—

“পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব” ::—

সুরমা টাইমস ডেস্ক::

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) বাংলাদেশে ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে জাতিসংঘের একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনটিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে- করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে বাংলাদেশ সরকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেয়ায় দেশটিতে ২০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাবে এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে জাতিসংঘের আশঙ্কা। তবে, বাংলাদেশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেছেন, করোনার বিস্তার রোধে সরকার ইতোমধ্যে ব্যাপক ব্যবস্থা নিয়েছে।

সূত্র::— সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

জাতিসংঘের ফাঁস হওয়া গোপন প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে গত সপ্তাহে অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নেত্রা নিউজ জানায়, জনসংখ্যার অধিক ঘনত্বের কারণে করোনায় দেশটিতে পাঁচ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। গত ২৬শে মার্চ তৈরি ‘কান্ট্রি প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স প্ল্যান’ শীর্ষক জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- জাতীয় পর্যায়ে কিছু সুযোগ-সুবিধার উন্নতি হলেও সন্দেহভাজন রোগী ও করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা ও চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রস্তুতি অপ্রতুল। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাবে করোনাভাইরাসের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা দেশটির পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে, দিস উইক ইন এশিয়া পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, জনগণের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ছাড়া অনেক কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। করোনার বিস্তার রোধে শপিং মল, দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক (চীন বাদে) ফ্লাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ খুবই নিবিড়ভাবে কাজ করছে। করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারত ও চীন থেকে চিকিৎসাসামগ্রী পেয়েছে। চীনের জ্যাক মা ফাউন্ডেশনের কাছ থেকেও পরীক্ষার কিট ও পিপিই পেয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ প্রতিনিধি বারদন জং রানা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, আমাদের হাতে আসা এই নথি ডব্লিউএইচও’র নেতৃত্বে প্রস্তুতকৃত আন্তঃসংস্থা নথি। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক এতে সহযোগী হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

২৬ মার্চের এই নথিতে বলা হয়, বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যধিক হওয়ায়, বৈশ্বিকভাবে প্রযোজ্য মডেলিং পদ্ধতি ও পরামিতি অনুমান অনুযায়ী, কভিড-১৯ রোগের প্রভাবের পূর্বাভাস হলো, মহামারী চক্রে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষের জীবনহানি ঘটবে। অন্যান্য দেশে ব্যবহৃত মডেলিংয়ের বিপরীতে চিন্তা করলে এই সংখ্যা ও মাত্রা খুব আশ্চর্য্যজনক কিছু নয়। কিন্তু এই সংখ্যা অত্যন্ত ভয়াবহ। এই সংখ্যাকে বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো উচিৎ।

এই নথির লেখকরা সরাসরিই বলেছেন যে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার কারণে কোভিড-১৯ ভাইরাস কিংবা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত মারাত্মকভাবে অসুস্থ রোগীরা চিকিৎসা পাবে না। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন যে, মহামারীর প্রথম দিকেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ন্যুজ্ব হয়ে পড়বে।

তারা আরও পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, দুর্বল সংক্রমণ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ চর্চা, পিপিই’র (পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) অপ্রতুলতা এবং মাধ্যমিক ও পরিণত পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চাপ অত্যাধিক বেশি হওয়ার কারণে কোভিড-১৯ ভাইরাসে স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা ‘ব্যাপকহারে’ সংক্রমিত হতে পারেন।

২৬ মার্চ ঢাকা বন্ধ করে দেওয়ার আগে শহর থেকে আনুমানিক ৯০ লাখ মানুষকে বের হতে দেওয়ার যেই সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে এই সিপিআরপি নথিতে।

এতে বলা হয়, সরকারের ওই সিদ্ধান্তের কারণে ‘খুব সম্ভবত ঝুঁকিপূর্ণ ও সংক্রমণশীল লোকজন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে… ফলে রোগের বিস্তার আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।’ তবে নথিতে এও বলা হয় যে, ঢাকা থেকে লোকজন বের হয়ে যাওয়ায় রাজধানী শহরের ওপর কোভিড-১৯ রোগীদের বোঝা হয়তো কমেছে এবং তা দেশজুড়ে বিন্যস্ত হয়েছে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা এখনও অজ্ঞাত, তবে সরকারী প্রতিবেদন, মৌখিক প্রমাণ ও মডেলিং পূর্বানুমান মিলিয়ে এই সংখ্যা বেশি হবে বলেই অনুমান করা হচ্ছে।

এতে আরও বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের মাঝে পিপিই’র সরবরাহ এখনও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় আছে। সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় মেডিকেল স্থাপনাসমূহ সাধারণ অর্থে অপ্রস্তুত, যদিও জাতীয় পর্যায়ে বাছাই করা কিছু স্থাপনায় সম্প্রতি কিছুটা উন্নতি সাধন করা হয়েছে।

কম্যুনিটি পর্যায়ে সংক্রমণ বিচ্ছিন্ন করা ও স্বাস্থ্য স্থাপনাসমূহ যেন প্রস্তুত হওয়ার কিছুটা সময় পায়, সেজন্য জাতিসংঘের এই নথির লেখকরা একটি অবদমন কৌশল অবলম্বনের সুপারিশ করেছেন। গুরুতর ও মারাত্মকভাবে অসুস্থ কোভিড-১৯ রোগীদের ঢল নামবে বলে যেই আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাদের [চিকিৎসার জন্য] স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় পর্যাপ্তভাবে সরঞ্জাম ও বিভিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য বড় আকারের ক্রয়ের প্রয়োজন মেটাতে তাৎক্ষনিক ৩০০ মিলিয়ন ডলার (২৫৪৫ কোটি টাকা) অনুদান চেয়েছেন তারা।

জাতিসংঘের এই আন্তঃসংস্থা নথিতে উল্লেখ করা হয় যে, শুধুমাত্র ‘লকডাউন’ করে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ খুব বেশি কমানো যাবে না। শুধুমাত্র ভাইরাসের অবদমনই এর সংক্রমণ হার পর্যাপ্তভাবে কমিয়ে মহামারীর প্রকোপকে ভোঁতা করে দিতে পারে।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগের বিস্তার অবদমন ও প্রশমনের জন্য ৬-দফা কর্মপরিকল্পনার কথা নথিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলো হলো: অনতিবিলম্বে দেশজুড়ে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী খোঁজা ও শনাক্ত করা; কোভিড-১৯ পরীক্ষা শুরুর জন্য বর্তমানে যেসব পরীক্ষাগার আছে তাদের সামর্থ্য যাচাই করা; জরুরিভিত্তিতে পিপিই, হাসপাতালের জন্য যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মেডিকেল সরঞ্জাম ক্রয় করা; “রোগী অগ্রাধিকার, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও রোগী ব্যবস্থাপনা উন্নতকরণের লক্ষ্যে” দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের প্রশিক্ষণ শুরু করা; কম্যুনিটি পর্যায়ে ঝুঁকি যোগাযোগ; এবং সামাজিক দূরত্ব সংক্রান্ত পদক্ষেপ বজায় রাখতে সচেতনতামূলক প্রচারণা।

এই নথিতে যেসব কর্মপরিকল্পনার কথা প্রস্তাব করা হয়েছে, সেই ব্যাপারে ডব্লিউএইচও’র বাংলাদেশ প্রতিনিধি বারদন জং রানা নেত্র নিউজকে বলেন, কোভিড-১৯ রোগের বিরুদ্ধে জিততে হলে আক্রমণাত্মকভাবে ও নিশানা ঠিক করে এই ভাইরাসকে আক্রমণ করতে হবে — নতুন রোগী খুঁজে বের করতে হবে, প্রত্যেক যাচাইকৃত রোগীকে পৃথক করতে হবে, সেবা দিতে হবে, এবং প্রত্যেক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে খুঁজে করে কোয়ারান্টিনে নিতে হবে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, এই কর্মপরিকল্পনা “সরকারের অংশগ্রহণে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়ন আংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে।

জাতিসংঘের এই নথিতে আরও বলা হয়, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, স্কুল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহণ দেশজুড়ে বন্ধ করা সহ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমন্বিত প্রভাবের কারণে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগের বিস্তারের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকবে।

এর আগে একদল বাংলাদেশী ও যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক গবেষক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে ৫ লাখের মতো মানুষ মারা যেতে পারে। তবে জাতিসংঘের এই আন্তঃসংস্থা নথিতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ মানুষ কখন মারা যেতে পারেন, সেই বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম আরও বলেন, করোনা রোগীদের সেবায় ৭৫৩ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং সারা দেশে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে তিন লাখ ১৭ হাজারটি পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, করোনা পরীক্ষার কিট পর্যাপ্ত রয়েছে। তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা এবং নিম্ন আয়ের মানুষকে ছয় মাস পর্যন্ত খাদ্য ও নগদ অর্থ দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সরকার।

জাতিসংঘের ফাঁস হওয়া প্রতিবেদন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয় জানায়, করোনাভাইরাস শনাক্তে বিশ্বব্যাপী গৃহীত কৌশলই দেশটি অবলম্বন করছে এবং করোনার বিস্তার নিয়ে দেশ কোনো লুকোচুরি করছে না।

গত বুধবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসে বাংলাদেশে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় পর্যন্ত ৫৪ জনের দেহে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে এবং ২৫ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। দেশটিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কম হলেও অর্থনীতির ওপর এটি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সোমবার বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) নেতারা জানান, ৩০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাকের আদেশ বাতিল করা হয়েছে। দেশজুড়ে তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর গ্লোবাল ওয়ার্কার্স রাইটস-এর সাম্প্রতিক অনলাইন সার্ভে থেকে জানা গেছে, আদেশ বাতিল হওয়ায় বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ১০ লাখ গার্মেন্ট শ্রমিককে চাকরিচ্যুত বা বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়েছে।

তথ্য সূত্র ::— দৈনিক যুগান্তর ।।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close