‘করোনা’: আশার আলো দেখাতে পারে প্লাজমা থেরাপি

সুরমা টাইমস ডেস্ক::

গবেষণা বলছে, প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ কোনো উপসর্গ ছাড়াই কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হতে পারে এবং তাদের থেকে অন্যদেরও সংক্রমণ ঘটতে পারে। এখন কথা হলো, এই উপসর্গবিহীন করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের আমরা কিভাবে চিহ্নিত করব?

কার দেহে ভাইরাস আছে আর কার দেহে নেই—এটা আসলে পরীক্ষা ছাড়া বোঝার কোনো উপায় নেই।

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, করোনাভাইরাস বাতাসেও থাকতে পারে ৩০ মিনিট। তাহলে কি বাতাসের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়াতে পারে? করণীয় কী?

হাঁচি-কাশির ড্রপলেটগুলো বাতাসে পড়ার পরপরই সেগুলো শুকিয়ে যায়। কিছু সময় পর ভাইরাসগুলো মারাও যায়। ঠিক ওই সময়ের মধ্যে ওই স্থানে যদি কেউ উপস্থিত হয়, তাহলে সংক্রমণের মৃদু আশঙ্কা থাকে। তবে এটা ঠিক নিশ্চিত করে বলা যায় না।

কভিড-১৯ শনাক্তকরণে ফলস নেগেটিভ আর ফলস পজিটিভ ফলাফল আসতে পারে কি? পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য দ্বিতীয়বার পরীক্ষার প্রয়োজন আছে কি?

কোনো ব্যক্তির করোনাভাইরাসের লক্ষণ ও উপসর্গ আছে এবং পরীক্ষা করে রিপোর্টও কভিড-১৯ পজিটিভ পাওয়া গেল—এমনটি হলে আর দ্বিতীয়বার শনাক্তকরণ পরীক্ষাটি করার প্রয়োজন নেই। আবার কোনো লক্ষণ ও উপসর্গ নেই, কিন্তু পরীক্ষায় কভিড পজিটিভ পাওয়া গেল, তখন পরীক্ষাটি দ্বিতীয়বার করা উচিত। আবার সব লক্ষণ ও উপসর্গ মিলে যাচ্ছে কিন্তু রিপোর্ট নেগেটিভ তখন দ্বিতীয়বার পরীক্ষাটি করা উচিত।

ভ্যাকসিন তৈরির আগ পর্যন্ত প্লাজমা থেরাপি কি হতে পারে এর অন্যতম চিকিৎসা?

কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে যাঁরা সেরে উঠেছেন, তাঁদের রক্তের প্লাজমায় এই রোগ প্রতিরোধী যে অ্যান্টিবডিগুলো ডেভেলপ করেছে সেটা অন্য আক্রান্ত রোগীদের শরীরে প্রয়োগ করলে ভালো ফল মেলে। একে বলা হয় প্যাসিভ ইমুনাইজেশন।

অর্থাৎ কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে যাঁরা সুস্থ হচ্ছেন তাঁদের দেহে একটা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যার মাধ্যমে তারা ভাইরাস থেকে মুক্ত হয়। এখন অন্য কোনো আক্রান্ত ব্যক্তিকে যদি সুস্থ হওয়া ব্যক্তির প্লাজমা দেওয়া হয় তবে সুরক্ষা মেলে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। র‌্যাবিস আক্রান্ত হলে বা হেপাটাইটিস ‘বি’ হলে যেভাবে প্লাজমা দেওয়া হয়—এটা অনেকটা সে রকম। এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে এর আগে সার্স, মার্স, ইবোলা ভাইরাসের প্রকোপও কমানো গেছে।

হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও এজিথ্রোমাইসিন প্রয়োগ সম্পর্কে কিছু বলুন?

কভিডের ক্ষেত্রে এজিথ্রোমাইসিনের একটা ভূমিকা আছে বলে কিছু কিছু চিকিৎসাবিজ্ঞানী বলছেন। আবার ম্যালেরিয়ার ওষুধ ক্লোরোকুইনও প্রয়োগ হচ্ছে। এটার গবেষণা রিপোর্ট যদি বের হয়, তাহলে বলা যাবে এসব ওষুধ আসলে কতটা ভূমিকা রাখছে। তবে আমাদের দেশের কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীকে এই ওষুধ আমরা দিতে পারি। যত দূর জানি, এসব ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

সুস্থ হওয়া কোনো ব্যক্তি কি আবারও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে? সুস্থ হওয়ার পর তারা কি অন্য কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে?

চীনের কিছু কিছু রিপোর্ট পাওয়া গেছে যে আক্রান্তরা সুস্থ হওয়ার পরও কেউ কেউ আবার আক্রান্ত হয়েছে। এখন এটা কি মৃদু নাকি জটিল তা বিস্তারিত জানা যায়নি। করোনাভাইরাস মিউটেশন ঘটিয়ে অর্থাৎ আগের ভাইরাস থেকে জেনেটিক পরিবর্তন ঘটিয়ে এ রকম হতেও পারে।

মৃত মানুষ থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর প্রবণতা আসলে কতটুকু?

কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যাওয়ার পরপরই যদি অন্য কোনো ব্যক্তি ওই মৃতদেহের সংস্পর্শে আসে, তবে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। অনুমান করে বলা যায়, দু-তিন দিন পর ভাইরাসটি দেহে থাকার আশঙ্কা কম।   

প্রচণ্ড গরমের পর বৃষ্টিও হলো। এই গরম বা বৃষ্টিজনিত আবহাওয়া কি কোনো প্রভাব ফেলতে পারে?

একটা মানুষ কাছাকাছি হাঁচি দিলে এবং তখন কাছাকাছি কোনো মানুষ না থাকলে হাঁচির ওই ড্রপলেটগুলো রাস্তায় পড়ে থাকবে। তখন যদি রোদ ওঠে, তাহলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সেই রাস্তার ভাইরাসগুলো মারা যাবে। কেননা রাস্তার তাপমাত্রা বাতাসের চেয়ে অনেক বেশি। তবে এই ভাইরাস গরম বা শীত ঋতুতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এটা হলো সর্দির ভাইরাস, যা মাঝে মাঝে রূপ বদলায়। একবার মার্স হলো, একবার সার্স হলো—এবার তা কভিড-১৯ নামে এলো। যখন গরমকালে সর্দি-কাশি থেমে গেল তখন ওই ভাইরাসগুলোও থেমে যায়। যেমন—রাইনোভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়ে সেটা প্রতিরোধ করা যাবে অথবা জটিলও হতে পারে।

সম্প্রতি বেশ কিছু পোশাক শ্রমিক ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসেছে। এতে ভাইরাস সংক্রমণের বিস্তৃতি বেড়ে গেল কি না?

ময়মনসিংহ থেকে যারা পুরো রাস্তা হেঁটে এসেছে, তারা হয়তো কোনো দোকানে চা খেয়েছে, সিগারেট খেয়েছে, পান খেয়েছে, গল্প করেছে। কোথাও বা পানের পিক ফেলেছে। এখন বলা তো যায় না, কোথায় বা কার দেহে করোনাভাইরাসের জীবাণু রয়েছে। তাই উচিত ছিল, তারা যেদিক দিয়ে এসেছে, ওই পুরো এরিয়া ‘মপ আপ’ বা লকডাউন করা। তারা যেহেতু রাস্তা ধরে এসেছিল, তাই খুব বেশিদূর লকডাউন করার দরকার হয়তো হতো না। রাস্তার আশপাশ কিছু বস্তি বা এলাকাকে নজরে রাখলেই হতো। এতে ভাইরাস বিস্তৃতির চেইনটা ভেঙে যেত। এটা অনেকটা পুকুরে আলাদা ঢেউ তোলার মতো ঘটনা। একটা শান্ত পরিবেশ ছিল, যেটা হঠাৎ কোনো ঢেউ এসে ভেঙে দিল।

কেউ যদি গার্মেন্ট বা অন্য কোনো শিল্প-কারখানা চালু রাখতে চায় সমস্যা নেই। কিন্তু কর্মীদের ঢোকার আগে ভালো করে হাত ধোয়া, মাস্ক-ক্যাপ, গ্লাভস পরা, ৬ ফুট দূরত্বে বসা ইত্যাদি কাজ মেনে চলতে হবে। সর্দি-কাশি নিয়ে কেউ যেন না ঢোকে এবং কারোর এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে তিনি যেন দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। সামাজিক দূরত্ব মেইনটেন করে মসজিদেও নামাজ পড়া যাবে। সে ক্ষেত্রে একটা কাতার বাদ দিয়ে আরেকটা কাতার হতে হবে। যার দূরত্ব পাশাপাশি হতে পারে পাঁচ ফুট।

কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এখন কোন পর্যায়ে? করোনাভাইরাস আক্রান্তের কোন স্তরে এখন অবস্থান করছে বাংলাদেশ?

ভাইরাস ট্রান্সমিশনের বিভিন্ন স্তর থাকে। এই যেমন একদিন পাওয়া গেল পাঁচজন, এরপর ৯ জন, এরপর ১৮ জন, গতকাল পাওয়া গেল ২৯ জন। এভাবে বেশি বেশি বাড়তে থাকলে দেখতে হবে ওসব রোগীর সংক্রমণের ইতিহাস কী। তারা যদি বিদেশ থেকে এসে থাকে, তবে তাকে আমরা বলব প্রাথমিক সংক্রমণ। আর যদি বিদেশফেরত না হয়, তাহলে বুঝতে হবে সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়ে গেছে।

আমারও মনে হয়, সামাজিক সংক্রমণ এখন হয়েছে আমাদের দেশে। কারণ নতুন আক্রান্তদের সবার বিদেশ থেকে আসার তথ্য মিলবে না। যদি দেখা যায়, ওই এরিয়া থেকেই সংক্রমণ ঘটেছে তখনই পুরো এলাকা লকডাউন করতে হবে। একে বলে ‘মপ আপ’।

সারা দেশে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ। চেম্বার বা হাসপাতালে উপস্থিত থেকে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়াটা কি আসলেই ঝুঁকিপূর্ণ?  

চিকিৎসকরা সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দিতে পারেন। তবে তাদের খুব ভালোভাবে পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) পরিধান করেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। পিপিই কাউকে দেখানোর জন্য না, মাস্ক পরে নাক বের করে রাখাও ঠিক নয়। এসব পরিধান করতে হবে খুব ভালোভাবে। নচেত ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসক নিজেই আক্রান্ত হতে পারেন এবং তখন হাসপাতাল চালু রাখাই কঠিন হবে।

করোনাভাইরাসের ভবিষ্যৎ কী বলে মনে করেন?

ভবিষ্যৎ কী হবে বলা যাচ্ছে না। তবে ঘাবড়ানোরও কিছু নেই। দরকার সবার মধ্যে সতর্কতা এবং সচেতনতা। এককথায় বলতে গেলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মানা, বাইরে গেলে মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, চোখে-মুখে হাত না দেওয়া, যাঁরা রোগীর পরিচর্যা করেন তাঁদের পিপিই পরা—এসবই এখন মূল কাজ। যাঁরা বাইরে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করেন তাঁরা বাসায় ফিরেও হাত ধুয়ে নেবেন।

লকডাউন কি চলতেই থাকবে?

লকডাউনের মূল উদ্দেশ্যই হলো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। এটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লকডাউন করে কোনো লাভ হবে না। এখনো কিছু কিছু জায়গায় লকডাউন বহাল রাখতে হবে। যেমন—টোলারবাগ, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, গাইবান্ধা ইত্যাদি এলাকা। তা ছাড়া গার্মেন্ট শ্রমিকরা চলে আশায় ময়মনসিংহ-ঢাকার পুরো রাস্তা লকডাউনের আওতায় আনতে হবে।  

আমাদের জন্য আশার বাণী কী—নাকি খালি হতাশা?

আশার বাণী শোনানো সম্ভব হতো যদি চীনে কভিড আক্রান্ত সুস্থ হওয়া রোগীদের কার্যকর প্লাজমা থেরাপির রিপোর্টগুলো আমরা পেতাম। তবে কিছুটা আশার কথা যে আমাদের দেশে আক্রান্তদের চিকিৎসা বিশ্বমানের হওয়া সম্ভব। আমেরিকায় যেখানে ২০টি আইসিইউ বেড, সেখানে ৬০টি বেড বসিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এটা কি স্ট্যান্ডার্ড আইসিইউ হলো, কোন চিকিৎসা হলো? সেখানে ক্যাজুয়ালিটি হচ্ছে মিস ম্যানেজমেন্টের জন্য। এখন আমাদের উচিত হবে ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউগুলো ভালোভাবে ঠিক করা। 

তবে আমাদের দায়িত্বশীলদের উচিত হবে কেস ম্যানেজমেন্ট যা করা হচ্ছে সেসব কেস শিটগুলো সংরক্ষণ করা। এগুলো যেন হারিয়ে না যায়। একটা রোগী মারা গেলেও সে কি কিডনি ফেইল করেছে নাকি হার্টফেইল করেছে, নাকি অ্যাজমার কারণে—অ্যানালিসিসের জন্য এগুলো সংরক্ষণ করা উচিত। আমাদের যাঁরা সুস্থ হচ্ছেন, তাঁদের ফলোআপ করা উচিত। সিরাম নিয়ে পরীক্ষা করা উচিত। এসব করা হচ্ছে কি না জানা নেই।

সাক্ষাৎকার : আতাউর রহমান কাবুল

সৌজন্যে ::— কালের কন্ঠ ।।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close