করোনা নিয়ে বিশ্বনেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য

নভেল করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) বিপর্যস্ত সারা বিশ্বে। এই রোগে এখন পর্যন্ত ১৩ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৭৩ হাজারের বেশি লোক। তবে বিশ্বের কিছু সংখ্যক দেশের নেতা এই ভাইরাসটি নিয়ে এমন ধরনের মন্তব্য করেছেন যাতে এই মহামারির ভয়াবহতাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর কারণেও তারা সমালোচিত হচ্ছেন।

পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে কোনো কোনো দেশের সরকার ইতোমধ্যেই মহামারির ব্যাপারে তাদের সুর পরিবর্তন করে ফেলেছেন। তবে কোনো কোনো সরকার এখনও তাদের আগের অবস্থানেই অনড়।

বিবিসি বাংলা এমন আটজন নেতার বক্তব্য নিয়ে এক প্রতিবেদন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়- যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম যেদিন করোনাভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হওয়ার খবর রিপোর্ট করা হলো তার দু’দিন পর ২২ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিএনবিসিকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। তাতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-নাইনটিনের সংক্রমণকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। এর দু’মাস পর সেখানকার পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। আমেরিকাতেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন লাখেরও বেশি। মৃত্যু হয়েছে প্রায় দশ হাজার মানুষের। শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক সিটিতেই তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার এই নাটকীয় বৃদ্ধির মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকায় করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এরআগে ট্রাম্প বলেছিলেন- ‘করোনাভাইরাস আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে’

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই জায়ের বোলসোনারো বিতর্কিত সব মন্তব্য করে আসছেন। তার পরেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ল্যাটিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে ব্রাজিলে কোভিড নাইনটিনের সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর থেকে বোলসোনারোর জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। সম্প্রতি তিনি টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছেন তা ব্রাজিলের অনেক মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। লাখ লাখ মানুষ থালা বাসন পিটিয়ে প্রেসিডেন্টের এই ভাষণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো যে শুধু এই মহামারিকে খাটো করে দেখিয়েছেন তা নয়, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কিছু নির্দেশনাও তিনি বার বার ভঙ্গ করেছেন। বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নরদের ঘোষিত লকডাউনেরও তিনি বিরোধিতা করছেন। ব্রাজিলের এই প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন- করোনাভাইরাস সামান্য ফ্লুর মতো।

ব্রাজিলে এখনও পর্যন্ত ১১ হাজার মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি এই সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগে মাত্র চার দিনেই দ্বিগুণ হয়ে গেছে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা।

যুক্তরাজ্যে কোভিড-নাইনটিনের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পরেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ৩ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেছেন যে তিনি লোকজনের সঙ্গে করমর্দন করার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন নন। তার প্রধান বক্তব্য ছিল এই ভাইরাসটি প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হাত ধোওয়া।

পরে জানা গেছে যে জনসন শুধুমাত্র হাসপাতালের কর্মীদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন, কোনো রোগীর সাথে নয়। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের ফলে তাকে প্রচুর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জনসনের শরীরের করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে ২৭ মার্চ এবং দশ দিনেও উপসর্গ না কমায় ৫ এপ্রিল তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ইরাকে প্রভাবশালী শিয়া নেতা মুক্তাদা আল-সদর যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করেছেন। ভাইরাসটির বিস্তার প্রতিরোধে ইরাকে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেগুলো ভঙ্গ করে আল-সদর নামাজের আয়োজন করছেন।

এছাড়াও কোভিড-নাইনটিন ছড়িয়ে পড়ার জন্য তিনি “সমকামী বিবাহ আইনকে” দায়ী করেছেন। কিন্তু যেসব দেশ সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেই ইতালি ও স্পেনে এধরনের বিয়েকে বৈধতা দিয়ে কোন আইন তৈরি করা হয়নি।

সম্প্রতি তিনি টুইট করে লিখেছেন: “যেসব কারণে এই মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে তার একটি হচ্ছে সমকামীদের মধ্যে বিবাহের আইন। সব সরকারের প্রতি আমি আহবান জানাচ্ছি এখনই অবিলম্বে যেন এই আইন বিলুপ্ত করা হয়। এই অনুতপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা দোষ থেকে মুক্তি পাবো।”

ফিলিপিনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তে করোনাভাইরাসের হুমকিকে খাটো করা তো দূরের কথা, তিনি বরং একে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশটিতে কঠোর সব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে লকডাউন ও কারফিউ জারি করা। তবে খাদ্য ঘাটতির প্রতিবাদে একবার রাস্তায় বিক্ষোভ হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট দুতের্তের জবাব কী ছিলো? নির্দেশনা ভঙ্গকারীদের হুমকি দিয়ে তিনি বলেছেন, নিরাপত্তা বাহিনী তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলবে।

“সরকারকে ভয় ভীতি দেখাবেন না। সরকারকে চ্যালেঞ্জ করবেন না। আপনি হেরে যাবেন,” ২ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেছেন।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস মানুয়েল লোপেজ ওব্রাদোর কোভিড নাইনটিন মোকাবেলায় তার দেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দেওয়া উপদেশের বিরোধিতা করে আসছেন। একই সঙ্গে এই ভাইরাসের যে বিপদ সেটাও তিনি খাটো করে দেখিয়েছেন। সারা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন । তাকে জনসমাগমে যোগ দিতে দেখা গেছে, দেখা গেছে শিশুদের চুম্বন করতে এবং সমর্থকদের ভিড়ে মিশে গিয়ে তাদের শুভেচ্ছা জানাতে।

মেক্সিকোতে ৩০ মার্চ জরুরী স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা হয়। তবে লকডাউন নেই কোন এলাকায়। ৫০ জনের মতো লোককে এক জায়গায় জড়ো হওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো স্বীকার করেছেন উদ্দেশ্যমূলকভাবেই তিনি কোভিড-নাইনটিন সংক্রান্ত কিছু তথ্য গোপন করেছিলেন। ঠিক কতোজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন সেটি জানানো হয়নি। তিনি বলেছেন, লোকজন যাতে পাগলের মতো কেনাকাটা করতে শুরু না করে দেয় সেজন্যেই এই তথ্য গোপন করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট উইদোদো ৩১ মার্চ সারা দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।এমাসের শুরুর দিকে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান এক সেমিনারে বলেছিলেন যে ভেষজ পানীয় পান করার কারণে ইন্দোনেশিয়রা কোভিড-নাইনটিন প্রতিরোধ করতে পারে।

করোনাভাইরাস মহামারির ব্যাপারে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো যে মনোভাব দেখিয়েছেন তাতে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তার দেশেও করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলে তিনি হাস্যচ্ছলে তা উড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, তিনি তো এই ভাইরাসকে “চারপাশে উড়তে” দেখেন নি।

একটি আইস হকি ম্যাচের সময় একজন টিভি সাংবাদিকের কাছে তিনি এই মন্তব্য করেন।ম্যাচ দেখতে সেখানে যেসব দর্শক ভিড় করেছিল তাতেও তিনি আপত্তি করেননি। তার বক্তব্য ছিল: ইনডোর স্টেডিয়ামের ভেতরে যে ঠাণ্ডা পরিবেশ সেটা এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করবে।

করোনাভাইরাসের ভীতিকে তিনি “মানসিক বৈকল্য” বলেও উল্লেখ করেছেন।ভাইরাসটি ঠেকানোর জন্য তিনি লোকজনকে সাওনায় যেতে এবং ভোদকা পান করতে পরামর্শ দিয়েছেন। অবশ্য পরে তিনি বলেছেন যে “কৌতুক” হিসেবেই তিনি এসব মন্তব্য করেছিলেন।বেলারুশের জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি। এই দেশটিকে উল্লেখ করা হয় “ইউরোপের শেষ স্বৈরতান্ত্রিক দেশ” হিসেবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close