মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইমলামের মৃত্যুতে বড়লেখায় শোকের ছায়া

মুক্তিযুদ্ধ কোনো সহজ ঘটনা ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের পদে পদে ছিল মৃত্যুর ঝুঁকি। সেই ঝুঁকি নিয়েই রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। সেই দিনগুলো ছিল ভয়ংকর। দিনগুলো ছিল কষ্টের। গত বছরের অক্টোবরে ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথামূলক অনুষ্ঠানে  এভাবেই বলেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সাংসদ সিরাজুল ইমলাম। মৌলভীবাজারের বড়লেখায় রোকেয়া খাতুন লাইসিয়াম স্কুলে মুক্তিযুদ্ধের এ সংগঠক এদিন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।

শিক্ষার্থীরা সেইদিন আগ্রহ নিয়ে তার মুখে শোনেছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। তবে আর কোনো দিন তিনি শোনাবেন না মুক্তিযুদ্ধের গল্প। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাবেক এই সাংসদ মারা গেছেন। শনিবার (০৪ মার্চ) আমেরিকার সময় সন্ধ্যা ৫টা ৪০ মিনিটে স্থানীয় একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রোববার যখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল, তখনই সাবেক সাংসদ সিরাজুল ইসলামের মৃত্যুর খবর আসে। তার মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে আসে বড়লেখার সব রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। তার মৃত্যুতে বড়লেখাবাসী হারিয়েছে তার অভিভাবককে। কেউবা হারিয়েছেন আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎসকে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবীদের পোস্টে ওঠে আসে তার প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। ৭৮ বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরা তার মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসেন তার বড়লেখার বাসভবনে। এসময় স্থানীয় নেতারা একে অন্যকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এমপি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স়ংগঠক হিসেবে দেশমাতৃকার লড়াইয়ে তার অবদান অনস্বীকার্য ছিল। তার মৃত্যুতে জাতি একজন গর্বিত সূর্যসন্তানকে হারাল। তিনি আমাদের অভিভাবক ছিলেন। বড়লেখার উন্নয়নে তার ব্যাপক ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে তিনি সারা জীবন রাজনীতি করে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা সবাই মর্মাহত।’

সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘সিলেট জেলা (বর্তমান বিভাগ) ছাত্রলীগের ৬৩-৬৪ সালের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উনার রাজনীতি জীবনের যাত্রা। আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলন ও নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে এবং বিরোধীদলের (কপ) পক্ষে কাজ করতে তিনি আমাদের প্রেরণা যোগান। কাজ চালিয়ে যাবার জন্য ছাত্রলীগের একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করে দেন। ছিলেন বড়লেখা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭০ সালে তার নেতৃত্বে বড়লেখা-জুড়ীতে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন। ২৩ মার্চ তার নেতেৃত্বে বড়লেখায় আমরা প্রথম পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার নমুনা পতাকা উত্তোলন করি। প্রথম এপ্রিল তার দেওয়া চিরকুট নিয়ে ভারতের মদনপুর ক্যাম্প সুবেদার হাজারিকার কাছে যাই। সেখানে ট্রেনিং করি। উনার সাথে অনেক স্মৃতি আছে। সব বলে শেষ করা যাবে না। তার মৃত্যুতে একটি নক্ষত্রের চিরবিদায় ঘটেছে। মরহুম সিরাজুল ইসলাম ও তৈমুছ আলী এই অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন।


বড়লেখা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোয়েব আহমদ বলেন, ‘তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। উনার মৃত্যুতে আমরা বড়লেখাবাসী একজন অভিভাবককে হারালাম, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স়ংগঠক হিসেবে দেশমাতৃকার লড়াইয়ে তার অবদান অনস্বীকার্য ছিল। জাতি একজন গর্বিত সূর্যসন্তানকে হারিয়েছে।’

লন্ডন ইউকে-বাংলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মুনেজর আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘সিরাজুল ইসলামের মতোন জনঘনিষ্ট রাজনীতিবিদ বড়লেখার মাটিতে আর জন্ম নেবেন না। আক্ষরিক অর্থেই একজন হাকালুকি পারের মাটি ও মানুষের জননেতা ছিলেন। সন্তানদের জন্য আর্থিক সম্পদ না রেখে গেলেও ব্যক্তি সিরাজুল ইসলাম বড়লেখার রাজনীতির একটি প্রতিষ্ঠান। ইতিহাস একদিন তাকে যথার্থ মূল্যায়ন করবে। বিনয়ী, বিচক্ষণ, বাগ্মী এ নেতাকে বড়লেখার মানুষ বহুকাল ভুলবে না। তার নামে বড়লেখায় কোনো স্থাপনার নামকরণ করার দাবি জানাচ্ছি।’

বড়লেখা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুস সহিদ খান তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘সিরাজুল ইসলামের মৃত্যুর মাধ্যমে এই অঞ্চলের রাজনীতির আকাশ থেকে একটি নক্ষত্রের চির বিদায় ঘটলো, যার অভাব কিছুতেই পূরণ হবার নয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। আমি মনে করি তার মৃত্যুতে বড়লেখাবাসী হারিয়েছে তাদের সুখ দুঃখের চিরন্তন সাথী একজন বর্ষিয়ান অভিভাবক; যার অভাব কিছুতেই পূরণ হবার নয়। শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন একজন ভালো শিক্ষক ছিলেন। ঠিক তেমনি রাজনীতিবিদ হিসেবে একজন ভালো মানের দক্ষ রাজনীতিবিদ ছিলেন।’

মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও কাতার বিএনপির সাধারণ স¤পাদক শরীফুল হক সাজু বলেন, ‘সিরাজুল ইসলামের মতোন জনঘনিষ্ট রাজনীতিবিদ বড়লেখার মাটিতে আর জন্ম নেবেন না। আক্ষরিক অর্থেই হাকালুকি পারের মাটি ও মানুষের একজন নেতা ছিলেন। তার মৃত্যুতে এই অঞ্চলের রাজনীতির আকাশ থেকে একটি নক্ষত্রের চির বিদায় ঘটলো, এই অভাব কিছুতেই পূরণ হবার নয়। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।’

মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম ১৯৪৩ সালে মৌলভীবাজার বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়নের টেকাহালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষকতা দিয়ে পেশা জীবন শুরু করেন। ষাটের দশকে তিনি বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৬৩ সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাধরণ সম্পাদক হিসেবে রাজনীতিতে যোগ দেন। 

১৯৬৮ সালে বড়লেখা উপজেলা আওয়ামী লীগের থানা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭২ সালে মৌলভীবাজার মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালে পর পর দুইবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে সাংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে বড়লেখা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আমেরিকায় পাড়ি দেন। এরপর থেকে রাজনীতিতে অনেকটা নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন।  

বিভিন্ন মহলের শোক : মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাবেক এমপির মৃত্যুতে গভীর শোক ও শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন  মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন এমপি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা এবাদুর রহমান চৌধুরী, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ স¤পাদক আনোয়ার উদ্দিন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোয়েব আহমদ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম সুন্দর, পৌরসভার মেয়র আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী, জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান শিপলু, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান তাজ উদ্দিন, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালেহ এলাহী কুটি, ইউকে-বাংলা প্রেসক্লাবের সাধরাণ সম্পাদক মুনজের আহমদ চৌধুরী, জুড়ী টিএনখানম একাডেমি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অরুণ চন্দ্র দাস, বড়লেখা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিয়াজ উদ্দীন, কোয়াবের সভাপতি ছালেহ আহমদ জুয়েল প্রমুখ ।

বড়লেখা প্রেসক্লাবের শোক :সাবেক সাংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সিরাজুল ইসলামের মৃত্যুতে বড়লেখা প্রেসক্লাবের সভাপতি অসিত রঞ্জন দাস, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোপাল দত্ত, সাংবাদিক আব্দুর রব, লিটন শরীফ, ইকবাল হোসেন স্বপন, মিজানুর রহমান, কাজী রমিজ উদ্দিন, রুয়েল কামাল, জালাল আহমদ, তপন কুমার দাস, সুলতান আহমদ খলিল ও এ.জে লাভলু প্রমুখ গভীর শোক ও সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close