বাংলাদেশে সোয়া ৪ কোটি মানুষ! মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর অনেক বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা মিলছে না বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে৷ তবে শুক্রবার করোনা পরিস্থিতির অনলাইন ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সংশিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন৷ পরিস্থিতি বদলাচ্ছে বলে শনিবার দাবি করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ৷।

এদিকে, সম্প্রতি চিকিৎসা সেবা না মেলায় প্রাণ হারিয়েছেন একজন স্কুল শিক্ষিকা৷ তিনি কিডনি, ফুসফুসে পানি জমা, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন৷ ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নিতেন৷ কিন্তু গত বুধবার তার ভর্তি নেয়নি সেই হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষ৷ এরপর আরো কয়েকটি হাসপাতালে চেষ্টা করেও তার স্বজনরা চিকিৎসা পেতে ব্যর্থ হন৷ সেদিন রাত ১০টার দিকে মগবাজারের রাশমনো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মারা যান তিনি৷ তার মেয়ে মাসুদা পারভীন চম্পা দাবি করেছেন, তার মায়ের করোনাভাইরাস সংক্রমণের কোনো লক্ষণ ছিল না৷ তারপরও আতঙ্কের কারণেই হাসপাতালগুলো চিকিৎসা দেয়নি৷

এমন পরিস্থিতিতে ক্যান্সার, কিডনি ও ডায়বেটিসের নিয়মিত রোগীদের চিকিৎসা সেবা পাওয়া নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞরাও৷ বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব রেডিয়েশন অনকোলজিস্টের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা বলেন, কোনো চিকিৎসক অজুহাত দেখিয়ে চিকিৎসাকর্মের বাইরে থাকতে পারেন না৷ কেউ যদি হাত পা গুটিয়ে বসে থাকেন তাহলে তার চিকিৎসা সনদ বাতিল করা উচিৎ৷ করোনাভাইরাস মুখ দিয়ে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে৷ তাই মাস্ক ব্যবহার করলেই যথেষ্ট৷ ডাক্তার-রোগী উভয়েই মাস্ক পরতে হবে৷ তারপর যদি কারো করোনা আক্রান্ত সন্দেহ হয় তাহলে তাকে আলাদা কর্নারে রেখে আইইডিসিআরকে খবর দিতে হবে৷ নমুনা পরীক্ষায় করোনা ধরা পড়লে আদালাভাবে তার চিকিৎসা চলবে৷

অধ্যাপক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা আরো বলেন, করোনার আগেই প্রতিদিন নানা ধরনের প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসা দিয়ে আসছেন চিকিৎসকরা৷ কিন্তু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে রোগীর সেবা দেবো না, তাহলে ডাক্তার হয়েছি কেন? কোনো রোগীর সেবা না দেওয়া খুবই অন্যায়৷

অধ্যাপক মোস্তফা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে পাঁচ থেকে ছয় লাখ ক্যান্সারের রোগী রয়েছেন৷ প্রতি বছর ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার মানুষ ক্যান্সারে মারা যান৷ তার মতে, ক্যান্সার প্রতিদিনই ছড়াতে থাকে, যার চিকিৎসা না হলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে৷

কিডনি ফাউন্ডেশনের হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় আড়াই কোটি থেকে তিন কোটি মানুষ কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত৷ প্রতি বছর ৪০ হাজার রোগীর কিডনি অকার্যকর হয়, প্রায় ৩০ হাজার মানুষ মারা যান বছরে৷ ডায়বেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে ১১ ভাগ মানুষ কিডনি সমস্যায় ভুগছেন৷ দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগী আছেন তিন কোটি৷ এসব রোগীদেরও কিডনি সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভবনা বেশি৷

ইন্টারন্যাশনাল ডায়বেটিসে ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ৮৪ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত৷ তবে দেশের ডায়বেটিক সমিতির জরিপ অনুযায়ী এই সংখ্যা দ্বিগুণ৷ তাদের হিসেবে শতকরা ৮ ভাগ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত৷ সেই হিসেবে ১৬ কোটি মানুষের দেশে সংখ্যাটি দাঁড়ায় এক কোটি ২৮ লাখে৷

অধ্যাপক মোস্তফা বলেন, কিডনি, ক্যান্সার বা ডায়বেটিসে আক্রান্তদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে৷ এ কারণে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হলে এ ধরনের রোগীদের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি থাকে৷ তারা নিয়মিত চিকিৎসা না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি৷ বলেন, প্রতি বছর এই সময়ে অনেকের জ্বর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা হয়৷ ক্যান্সার, ডায়াবেটিস বা কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদেরও জ্বর, সর্দি, কাশি হতে পারে৷ তাই বলে তাকে সেবা না দেওয়া অমানবিক৷

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলোর এই ধরনের আচরণ খুবই অন্যায়৷ আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব৷ বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের বর্হিবিভাগ প্রতিদিনই খোলা রয়েছে৷ আমি বলব, কারো যদি খুব বেশি জরুরি হয়ে পড়ে তারা যেন আমাদের এখানে চলে আসেন৷ আমরা সাধ্যমত চিকিৎসা দেবো৷ সরকারের উচিৎ দ্রুত বেসরকারি হাসপাতালগুলো মালিকদের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করা৷ যাতে রোগীরা চিকিৎসা পান৷’

সূত্র: ডয়চে ভেল

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close