শাবান মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য : এইচ.এম.কাওছার

আরবি বার মাসের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্ব ও ফজিলতপূর্ণ মাস হল পবিত্র শাবান মাস। শাবান আরবি শব্দ এর অর্থ হলো ছড়িয়ে দেওয়া, বিস্তৃত হওয়া, বিচ্ছিন্ন হওয়া ইত্যাদি।আরবিতে এই মাসটির পূর্ণনাম হল ” আশ শাবানুল মুআজজম ‘ অর্থ-মহান শাবান মাস।

অন্য অর্থ হলো-মধ্যবর্তী সুস্পষ্ট। সুতরাং এই মাস টি রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী, তাই এই মহিমান্বিত মাসকে শাবান নামে নামকরণ করা হয়। হিজরি বার মাসের মধ্যে আরবি শাবান মাসের ফজিলত ও তাৎপর্য অপরিসীম।

এই মাসে মাসে রাব্বে কায়নাতের পক্ষ থেকে অসংখ্য কল্যাণ এবং রহমত বর্ষিত হয়।বান্দার হায়াত, মউত,রিজিক ও তাকদীরের ভালো, মন্দ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
শাবান মাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস।

নবি করিম (সা.) এই মাসে সবচেয়ে বেশি নফল ইবাদত, নফল রোজা ও নফল নামাজ আদায় করতেন।
মূলত এটি মাহে রমযানের সিয়াম সাধনা ও পূর্ব প্রস্তুতির মাস। তাই নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসকে স্বীয় মাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইরশাদ করেন- রজব আল্লাহ তাআলার মাস, শাবান নবীজির (সা.)এর মাস; রমজান হলো আমার উম্মতের মাস।

এই মাসে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশি বেশি করে এই বরকতময় দোয়া পাঠ করতেন -(“আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রামাদ্বান।”) অর্থ-

হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রজব ও শাবান মাসে বিশেষ বরকত দান করুন এবং আমাদের রামাদ্বান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন।

(মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রথম খন্ডঃ২৫৯,বায়হাকি,শুয়াবুল ইমান,৩:৩৭৫,আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৩৯৩৯)

শাবান মাস সম্পর্কে-উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিক্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন -রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবি বার মাসের মধ্যে বরকতময় একটি মাস হল শাবান। এ মাসে বেশি বেশি নফল রোযা আদায় করেই তিনি মাহে রমযানের রোযা পালন করতেন।’ [আবু দাউদ-২৪৩১]। অপরদিকে এ মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত রয়েছে যেটাকে আরবিতে “লাইলাতুল বরাত বা মুক্তির রজনী বলা হয়। শবে বরাত কথাটি ফারসি থেকে এসেছে।শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত ১৫ তারিখের রাতকে ‘শবে বরাত’ বলা হয়।বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ শাবান মাসের এই পবিত্র রজনীকে শবে বরাত নামে আখ্যায়িত করে।


হাদিস শরীফে যাকে ‘নিসফ শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্য দিবসের রজনী বলা হয়েছে,পবিত্র করআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন -শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের।বরকতময় রাতে নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে,আমিই প্রেরণকারী। এ হলো আপনার প্রভুর দয়া, নিশ্চয় তিনি সব শোনেন ও সব জানেন। তিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এ উভয়ের মাঝে যা আছে, সেসবের রব তিনি। যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাস করো, তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন, তিনিই তোমাদের পরওয়ারদিগার আর তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও, তবু তারা সংশয়ে রঙ্গ করে। তবে অপেক্ষা করো সে দিনের, যেদিন আকাশ সুস্পষ্টভাবে ধূম্রাচ্ছন্ন হবে।’ (সুরা- দুখান, আয়াত: ১-১০)। অসংখ্য মুফাসসিরিনে কেরামগন বলেন, এখানে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রজনী বলে শাবান মাসের পূর্ণিমা রাতকেই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে মাজহারি, রুহুল মাআনি ও রুহুল বায়ান)।

এই পবিত্র মহিমান্বিত রাত্রে মহান আল্লাহ তায়ালা তার অসংখ্য গোনাহগার বান্দাদের কে ক্ষমা করে দেন।
অন্যদিকে পবিত্র শাবান মাসে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে কিব্বলা সম্পর্কিত আয়াত নাযিল করেন, এরশাদ করেন- কাদ নারা-তাকাল্লুবা ওয়াজহিকা ফিছছামাই ফালানুওয়ালিলয়ান্নাকা কিবলাতান তারদাহা-ফাওয়ালিল ওয়াজহাকা শাতরাল মাছজিদিল হারা-মি ওয়া হাইছুমা-কুনতুম ফাওয়াললূ উজূহাকুম শাতরাহূ ওয়া ইন্নাল্লাযীনা ঊতুল কিতা-বা লাইয়া‘লামূনা আন্নাহুল হাক্কুমির রাব্বিহিম ওয়ামাল্লা-হু বিগা-ফিলিন ‘আম্মা-ইয়া‘মালূন।


অর্থঃ নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহলে-কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে।

সূরাঃ আল- বাকারা, আয়াত: ১৪৪, তাই শাবান মাস একদিকে ইসলামি ঐক্যের মাস, অন্যদিকে কাবাকেন্দ্রিক মুসলিম জাতীয়তা ও ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জীবিত হওয়ার মাস।


অন্যদিকে এ মাসে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের নির্দেশনাসংবলিত অসাধারণ একটি আয়াত এই মাসেই অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ইন্নাল্লা-হা ওয়া-মালাইকাতাহূইউসাললূনা ‘আলান নাবিইয়ি ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আমানূসাললূ‘আলাইহি ওয়া ছালিলমূতাছলীমা-।


অর্থঃ আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের তরে দোয়া কর এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরন কর।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close