অচেনা রূপ নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত নগরীর অন্যতম লন্ডন

এ যেন এক ভিন্ন লন্ডন! এমন লন্ডনের সাথে কেউ পরিচিত নয়। আলো ঝলমলে যে শহর ঘুমায় না, সেই শহরই কেমন নিস্তব্দ, সুনশানদ! নেই কোন হৈ হুল্লোড়। ট্রেন বাস সবই বলতে গেলে ফাঁকা। লন্ডন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি জানিয়েছে ইতমধ্যে  ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতির মুখে আছে প্রতিষ্ঠানটি।  

চিরচেনা লন্ডনের রাতের চিত্র বা দিনের চিত্র দেখে যে কেউ থমকে যাবেন। পুরো অচেনা এক নগরীর রূপ নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত নগরীর অন্যতম লন্ডন। চারদিকে খা খা। রাজপথ, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পাব সব শূন্য। মনে হতে পারে প্রাচীন কোনো নগরী। আগে এখানে মানুষের বসবাস ছিল। এখন নিস্তব্ধ চারদিক। কোথাও জনমানুষের দেখা নেই।

সাংবাদিক কাইয়ুম আব্দুল্লাহ গত রাতে লন্ডনের রাতের শহরের একটি ভিডিও শেয়ার করে লিখেন-

“বিশ্বের যে ক’টি শহর একেবারেই ঘুমায় না বলে কথিত লন্ডন তার শীর্ষতম। লন্ডনের সবচে’ ব্যস্ততম পিকাডেলি ও অক্সফোর্ড সার্কাস এলাকা – রাত ভোর হয় তবু সেখানকার মানুষ ও গাড়ির ভিড়, জটলা শেষ হয় না। অথচ আজ (মঙ্গলবার) রাত ন’টা বাজতে না বাজতেই কেমন যেন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। যে কটি বাস চলছে তাও প্রায় খালি”।

দিন রাত সমান প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর একটি শহরকে করোনা এভাবে নিস্তেজ করে ফেলবে তা কি কখনো কেউ কল্পনা করেছিলো?চারপাশে এক ভৌতিক পরিবেশ। রাস্তায় কেউ বেরোলে এমন লন্ডনকে দেখে গা শিউরে উঠবেন- কোথায় এসে পৌঁছালাম। থিয়েটার জনশূন্য, রেস্টুরেন্ট গুলোর অবস্থা একই রকম। একটি বাংলাদেশাই রেস্টুরেন্টের পরিচালক  ফরিদ আহামেদ বুলবুল জানান, গত রবিবার থেকে তাঁর রেস্টুরেন্টে একজন ক্রেতা ও আসেন নি। সামান্য কিছু টেইকওয়ে তারা হোম ডেলিভারি দিচ্ছেন। এতে করে রেস্টুরেন্টের গ্যাস, বিদ্যুতের বিল ও দেয়া সম্ভব হবে না। কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ কিভাবে করবেন এই নিয়ে চিন্তিত তিনি।    পাব-এরও একই অবস্থা। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন জনসাধারণকে ঘরের ভিতর অবস্থান করার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, ১২ সপ্তাহ সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে। এ সময়ে ঘরে বসেই কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। জানিয়েছেন, সব অপ্রয়োজনীয় কাজ বন্ধ রাখতে। এড়িয়ে চলতে বলেছেন অত্যাবশ্যকীয় না হলে ভ্রমণ। সোমবার রাতে এমন পদক্ষেপকে ‘ড্রাকোনিয়ান’ বা কঠোর বলে স্বীকার করেছেন তিনি। তবে বলেছেন, জীবন রক্ষার জন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি সোমবার রাতে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের পর মানুষে মানুষে উপচে পড়া লন্ডনের রাজপথ দেখা যায় জনশূন্য। লন্ডনে খুব ব্যস্ত চায়না টাউনের রাস্তা দেখে গা শিউরে ওঠে। এখানেই মানুষের গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগতো। সেখানে হঠাৎ ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন দু’একজন মানুষ। ওয়েস্ট এন্ডে ভীষণ ব্যস্ত থাকতো পাবগুলো। তা এখন খা খা করছে। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, করোনা ভাইরাস এখন ব্রিটেনে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এ জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। ব্রিটেনে নতুন যেসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে গ্রান্ড ন্যাশনাল ও প্রিমিয়ারশিপ রাগবি বাতিল করা। ৫ সপ্তাহের জন্য এসব আয়োজন স্থগিত করা হয়েছে। সোমবার সকালে ট্রেন স্টেশনগুলো, রাস্তায় বাস স্টেশনগুলো ছিল ফাঁকা। এদিন লন্ডনভিত্তিক অনেক শ্রমজীবী গণপরিবহন খাতে বড় রকমের দুর্ভোগে পড়েন। ডিস্ট্রিক্ট লাইন টিউবে ছিল হাতেগোনা মানুষ। পরিবহনমন্ত্রী গ্রান্ট শেপস বলেছেন, গত সপ্তাহে ট্রেনের যাত্রী কমে গেছে এক পঞ্চমাংশ। করোনা ভাইরাসের কারণে এমন অবস্থা হয়েছে। যদি অবিলম্বে নাটকীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় তাহলে এই ভাইরাসে মারা যেতে পারেন দুই লাখ ৬০ হাজার মানুষ। মন্ত্রীদের এ বিষয়ে সতর্কতা দেয়ার পরে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার রাতে সরকারি পর্যায়ের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, যদি সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেয়া হয় তাহলে ব্রিটেনে মৃতের সংখ্যা ২০ হাজারের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

৭০ বছরের বেশি বয়স এমন ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা এবং ডায়াবেটিস, অ্যাজমা আছে এমন ব্যক্তিদেরকে ঝুঁকি থেকে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সারের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত এমন কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষের জন্য এ সপ্তাহে বিশেষ ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। তাদেরকে ১২ সপ্তাহের জন্য কার্যত লকড-ডাউন করে রাখা হবে। সরকারের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা স্যার প্যাট্রিক ভ্যালেন্স বলেছেন, নতুন গৃহীত এসব পদক্ষেপ ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া বন্ধের ক্ষেত্রে বড় একটি প্রভাব ফেলবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close