দিল্লিতে সহিংসতার আগুন

সুরমা টাইমস ডেস্ক ::

চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে দিল্লির সহিংসতা। প্রাথমিকভাবে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষ হিসেবে পরিচিতি পেলেও ক্রমেই তা ভিন্ন রূপ নিয়েছে। মুসলিমদের ওপর চালানো হচ্ছে সংঘবদ্ধ হামলা। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা ও দোকানপাট। ঘটেছে ঘরে ঢুকে হামলা চালানোর ঘটনা। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুসারে, গত রোববার শুরু হওয়া দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৪ জন। আহত হয়েছেন ১৮০ জনেরও বেশি। নিহতের মধ্যে এক গোয়েন্দা ও এক পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।

গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে শহরটিতে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একাধিক নেতার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। নিষ্ক্রিয়তা ও হামলাকারীদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের ভর্ৎসনার শিকার হয়েছে দিল্লি পুলিশ। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ’র পদত্যাগের দাবি ওঠেছে। তিনদিন পর দাঙ্গা নিয়ে প্রথমবার মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে এখনো সেখানে বিরাজ করছে তীব্র উত্তেজনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কয়েকদিনের লোমহর্ষক দৃশ্য। সেগুলোতে দেখা যায়, মূলত হিন্দুত্ববাদীরা সাংবাদিকসহ নিরস্ত্রদের পেটাচ্ছে।  রড, লাঠি ও পাথর নিয়ে রাস্তায় দলে দলে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে হিন্দু ও মুসলিমরা। অনেক এলাকায় প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।

বুধবার করা টুইট বার্তায় প্রধানমন্ত্রী মোদি সবার প্রতি সমপ্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এতে তিনি বলেন, শান্তি ও সমপ্রীতি ভারতীয় সংস্কৃতির মূল কথা। দিল্লির ভাইবোনদের কাছে অনুরোধ, সর্বদা শান্তি এবং সৌভ্রাতৃত্ব বজায় রাখুন। যত দ্রুত সম্ভব দিল্লিতে শান্তি এবং স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসা জরুরি। অশান্ত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি পর্যালোচনা বৈঠক করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। মঙ্গলবার মধ্যরাতে দোভাল উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বৈঠক করেছেন পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও। এদিন সকালে প্রধানমন্ত্রীকে গোটা পরিস্থিতি জানিয়েছেন। এরপরেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত কেবিনেট কমিটির বৈঠক ডাকা হয়। সেখানে দিল্লির সহিংস পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ১৪৪ ধারা এবং কারফিউ জারি করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। এমনকি উপদ্রুত এলাকায় দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে গত সোমবার এক পুলিশের হেড কনস্টেবলের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে, দিল্লি পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। তার দাবি, পুলিশ সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হচ্ছে না। তাই সেনা নামানো উচিত। বুধবার সকালে তিনি এ কথা বলেন। এর আগের দিন তিনি সাক্ষাৎ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে। তাকে দিল্লি সহিংসতার বিষয়ে অবহিত করেন এবং বলেন, সংঘাত বন্ধে পুলিশ কিছু করতে পারছে না। তাই কেজরিওয়ালের পরামর্শ সেনাবাহিনী নামানো উচিত। সকালে এক টুইটে তিনি বলেছেন, সারা রাত বিপুল সংখ্যক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি আমি। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সব চেষ্টা সত্ত্বেও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হচ্ছে না। তাই সেনাবাহিনী নামানো উচিত। সহিংস এলাকাগুলোতে অবিলম্বে কারফিউ দেয়া উচিত। এ নিয়ে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে লিখছি।

বুধবার দিনের পরিস্থিতি ::–
বুধবার দিল্লিতে সহিংসতার জেরে কেন্দ্রীয়  গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি)তে কর্মরত এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এদিন চাঁদ বাগে একটি নর্দমা  থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার  হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, পাথরের আঘাত এবং মারধরের জেরেই মৃত্যু হয়েছে এই গোয়েন্দা কর্মীর। সকালেই দিল্লি পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ দেখাতে জড়ো হয়েছিলেন জামিয়া ও জেএনইউ’র ছাত্ররা। তারা দিল্লি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি দাবি তোলেন। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। যারা সহিংসতা উস্কে দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। এ বিক্ষোভে যোগ দেন জেএনইউ’র শিক্ষার্থীরা, এলামনাই এসোসিয়েশন অব জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া এবং জামিয়া কো-অর্ডিনেশন কমিটির সদস্যরা। দিনের শুরুতেই গুরুতর আহত অবস্থায় আরো চার জনকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে, তাদের মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। পরে হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় আরো একজনের মৃত্যু হয়। বেলা বাড়লে আরো দু’জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা  গেছে। মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ার পাশাপাশি এখনো দিল্লিতে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। বুধবার ভোর সাড়ে ৪টা নাগাদ নতুন করে পাথর নিক্ষেপ করতে দেখা গিয়েছে উত্তর-পূর্বের ব্রহ্মপুরী-মুস্তাফাবাদ এলাকায়। গোকুলপুরীতে একটি পুরনো জিনিসপত্রের দোকানে আগুন ধরিয়ে  দেয়া হয়েছে। অভিযোগ, জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়ে একদল সিএএ সমর্থক মুসলমানদের বাড়ি বাড়ি আক্রমণ চালিয়েছে। মুসলমানদের দোকান ও বাড়িতে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এদিন   জোহরিপুরায় ফ্ল্যাগমার্চ করেছে আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ানরা। গতকালই ৬৭ কোম্পানি আধা-সামরিক বাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। গোকুলপুরীর ভাগীরথী বিহার এলাকায় ফ্ল্যাগমার্চ করে সিআরপিএফ, এসএসবি, সিআইএসএফ এবং পুলিশের যৌথ বাহিনী। সীলামপুর, জাফরাবাদ, মৌজপুর, গোকুলপুরীতে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে।

অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি :–
কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী সভাপতি সোনিয়া গান্ধী বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে  কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। তিনি বলেন, সংঘর্ষ এত বড় আকার নেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ গোটা কেন্দ্রীয় সরকারই দায়ী। অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করছে কংগ্রেস। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে সোনিয়া বলেন, গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  কোথায় ছিলেন? কী করছিলেন তিনি? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখেও কেন আগে থেকে আধাসেনা ডাকা হলো না? তিনি আরো অভিযোগ করেন, এই সংঘর্ষের পেছনে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে। দিল্লির ভোটের সময় দেশবাসী সেটা দেখেছে। অনেক বিজেপি  নেতা উস্কানিমূলক মন্তব্য করে ভয় ও হিংসার পরিবেশ তৈরি করেছে। এমনকি, গত রোববারও এক বিজেপি নেতা একই রকম মন্তব্য করেছেন। অবশ্য সোনিয়ার এই সংবাদ সম্মেলনের পরই পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে সোনিয়ার বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে রাজনীতি করার অভিযোগ করেছেন বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকার। তিনি বলেন, কংগ্রেস সভানেত্রীর মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। এমন পরিস্থিতিতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সব রাজনৈতিক দলের চেষ্টা করা উচিত। সেটা না করে উনি নোংরা রাজনীতি করছেন। সংঘর্ষে রাজনৈতিক  রং  দেয়া অনুচিত।

তিন বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে এফআইআর’র নির্দেশ:– দিল্লি হাইকোর্ট বুধবার দিল্লির হিংসা নিয়ে এক মামলার শুনানিতে বিজেপির তিন নেতার বিরুদ্ধে হেট স্পীচ দেয়ার জন্য এফআইআর দাখিল করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। বিচারপতি এস মুরলিধর ও তালওয়ান্ত সিংয়ের বেঞ্চ নাগরিকত্ব আইনের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দায়ী নেতাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে আদালতে দাখিল করা এক আবেদনের শুনানিতে সলিসিটর জেনালের তুষার মেহতাকে তিন বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে এফআইআর দাখিল করার জন্য পুলিশকে পরামর্শ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই তিন নেতা হলেন, অনুরাগ ঠাকুর, পরভেশ ভার্মা ও কপিল মিশ্র। তিন জন সিএএ বিরোধী বিক্ষোভ নিয়ে নানা উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছেন। এদিন শুনানির সময় দিল্লি সরকারের কৌঁসুলির সঙ্গে সলিসিটর জেনারেলের তীব্র বাক বিতণ্ডা হয়েছে। বিচারপতিরা দিল্লি পরিস্থিতির জন্য পুলিশকে ভর্ৎসনা করেন।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close