কার হাত ধরে উঠে আসে পাপিয়ারা ?

সুরমা টাইমস ডেস্ক :: রাজনৈতিক পদ-পদবির আড়ালে কোনো কোনো অসাধু ব্যক্তি যেসব সামাজিক অনাচার অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন, তার নিকৃষ্ট নমুনা উঠে এসেছে যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়ার কর্মকাণ্ডে। তার পাপের সাম্রাজ্য সামনে আসার পর যদিও তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে সংগঠন থেকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শে নীতি-নৈতিকতার চর্চা না থাকায় দলগুলোতে এমন অনেক পাপিয়া ঘাপটি মেরে রয়েছেন। এসব রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।

শনিবার দেশত্যাগের সময় র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া। এরপর একে একে বের হয়ে আসতে থাকতে তার ভয়াবহ কুকীর্তির কথা। সামাজিকভাবে ঘৃণিত এসব কর্ম চালিয়ে নিতে তিনি ঢাল হিসেবে নিয়েছিলেন রাজনীতি ও কথিত সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড।

অসামাজিক কার্যকলাপসহ নানা অপকর্মের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর পাপিয়াকে ইতোমধ্যে তার সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ারও অনুরোধ করা হয়েছে। এই নেত্রীর অপকর্মের দায় সংগঠন নেবে না বলেও জানিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল।

রাজনৈতিক পদ-পদবির আড়ালে এমন অন্যায়-অপকর্মের খলনায়ক পাপিয়াই প্রথম নন। খালেদ, সম্রাট, শামীমরা গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে দেশজুড়ে আলোচিত। এখনো প্রায়ই নানাজনের অন্ধকারের রাজ্যের গল্প গণমাধ্যমে আসছে। অনেক ঘটনা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। এরই কিছু ঘটনা হঠাৎ হঠাৎ সামনে আসে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশজুড়ে আলোচিত ক্যাসিনো কাণ্ড। এতে জড়িত থাকার দায়ে বহিষ্কার করা হয় যুবলীগসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের। বেশ কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পর বের হয়ে আসে ভয়ংকর সব তথ্য। কারও নেতৃত্বে পরিচালিত হতো টর্চার সেল, কেউ বা পদ-পদবির আড়ালে করতেন চাঁদাবাজি।

অভিযোগ আছে, সরকার ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তুলে সেগুলোকে ব্যবহার করে দাপিয়ে বেড়াতেন এরা। দিনের পর দিন এমন অনৈতিক কাজ করে এলেও সবাই এদের ভয়ে তটস্ত থাকত। সব কটি ঘটনাতেই গ্রেপ্তারের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বহিষ্কার করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে- এরা দিনের পর দিন কীভাবে এসব অপকর্ম নির্বিঘ্নে করে বেড়াতেন?

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক দল বা সংগঠন কোনোভাবে তাদের নেতাকর্মীদের অপকর্মের দায় এড়াতে পারে না। এমন অপকর্ম বাড়ার পেছনে স্থানীয় প্রশাসনেরও দায় দেখছেন তারা। আর তাদের বেড়ে ওঠার পেছনে পদ ও প্রভাবশালী রাজনীতিকের আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ না হলে সরকারের সব উদ্যোগই ভেস্তে যাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক নেহাল করিম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সমাজে প্রতিনিয়ত যা ঘটে তা প্রধানমন্ত্রী না জানলেও স্থানীয় প্রশাসন সবচেয়ে ভালো জানে। চাইলে তারা এসব নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সেটা খুব কার্যকর দেখা যায় না। তাই ধরা পড়ার পর বহিষ্কার করে এক ধরনের আইওয়াশ করা হয়।’

নেহাল করিম বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলে তা নিয়ে সর্বোচ্চ দশ দিন হইচই হয়। এরপর অন্য ঘটনা এলে সবাই আগেরটা ভুলে যায়।

পাপিয়াকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব জানায়, ঢাকা ও নরসিংদীতে পাপিয়ার বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়িসহ নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব আয়ের অন্যতম মাধ্যম ছিল রাজধানীর বিভিন্ন পাঁচতারকা হোটেলে নারীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করে অর্থ আয়। তার রাজধানীর ফার্মগেট ইন্দিরা রোডের বাসায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, গুলি, বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক, বেশকিছু বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করে র‌্যাব।

রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে প্রায়ই শোনা যায়, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী এদের কারো সংগঠনে আসার সুযোগ নেই। তারপরও এমন পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হয়- জানতে চাইলে নেহাল করিম বলেন, ‘নিজেদের দল ভারি করার চিন্তা থাকায় রাজনৈতিক দলগুলো বা সংগঠন তাদের গঠনতন্ত্র বা নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি গুরুত্ব দেয় না। তবে যখন স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দেয় তখন একে-অন্যকে সরিয়ে দিতে কৃপণতা করে না।’

এদিকে যাচাই-বাছাই ছাড়াই দলে লোক ভেড়ানোর ফলে এমনটা হচ্ছে বলে মনে করছেন কেউ। যারা পাপিয়াদের মতো লোকজনকে দলে নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা চান তারা।

রাজনীতির আড়ালে অপকর্মে পাপিয়াদের গুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সম্রাট আর পাপিয়া হলো গুঁটি। এমন অসংখ্য পাপিয়া আছে রাজনীতিতে। কিন্তু এদের যারা সৃষ্টি করেছে তাদের আমরা দেখি না। সেই গডফাদাররা সব সময় আড়ালে থেকে যায়। রাজনীতিতে দূষণ ছড়ানোর দায় এদের সবার।’

সরকার আন্তরিক হলে পেছনে থাকা ব্যক্তিদেরও মুখোশ উন্মোচন করবে বলে আশা করে সুজন সম্পাদক বলেন, ‘তা না হলে এমন অভিযান মূল্যহীন হয়ে পড়বে।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে বদিউল আলম বলেন, ‘রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তির আগে এসব অপকর্মকারীদের ঠেকানো দুরূহ। কারণ তারা দলে যোগ দিয়ে পদ আর প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় এসব করে থাকে। তাই এই অপরাধীদের সঙ্গে পেছনে শক্তি জোগানো মানুষগুলোকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close