সানাউলের নাগপাশে আবদ্ধ সিলেট বি,আর,টি,এ মাসে কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্য !

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনঃ সিলেট বিআরটিএ অফিসের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি:) সানাউল হকের ‘ নাগপাশে ’ আবদ্ধ সিলেট বিআরটিএ । এখানে অনেক কাজ সরকারি নিয়মের বাইরে ‘ঘুষ বাণিজ্য’র মাধ্যমে হলেও সরকারি নিয়ম মেনে কোন কাজ করাতে গেলে তা সম্ভব হচ্ছে না।

এতে একদিকে যেমন সেবাগ্রহীতা সুফল পাচ্ছেন না অন্যদিকে বাড়ছে দালালদের সংখ্যাও। সব মিলিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী আর সানাউলের দালালদের সিন্ডিকেটের ‘ নাগপাশে ’ বন্দি হয়ে পড়েছে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠান। শুধু তাই নয়, শিক্ষানবিশ লাইসেন্সে জালিয়াতির মাধ্যমে বাণিজ্য, পরীক্ষায় টাকা দিলে পাশ করানোর নামে বাণিজ্য, ব্যবহারিক পরীক্ষায় হাজিরা দিলেই লাইসেন্স, নিয়মবহির্ভূত ভাবে ১৬ খলিফাকে অফিস করার অনুমতি দেয়া, মালিকানা বদলিসহ নানা ঘটনায় প্রতি মাসে ‘কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য’ করা বিআরটিএ সিলেট অফিসের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মো. সানাউল হকের নিত্যনৈমিত্তক কাজ ।

আর এভাবেই নিয়ম-অনিয়মের বেড়াজাল তৈরি করে কয়েক কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করছেন বিআরটিএ সিলেটের সহকারী পরিচালক মো. সানাউল হক ও মোটরযান পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে গঠিত দালাল সিন্ডিকেট।

কারণ বিআরটিএ সিলেট অফিস সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। তবে দালালদের জন্য স্বর্গরাজ্য। কারণ একজন সাধারণ গ্রাহক যে কাজ বছরের পর বছর ঘুরেও করতে পারছেন না সেই কাজ বিআরটিএর দালালরা করে দিচ্ছেন মুহুর্তেই। তবে এজন্য আপনাকে গুনতে হবে সরকারি ফি এর অতিরিক্ত পরিমাণ টাকা। যে টাকা ভেতরের-বাইরের দালালদের মাধ্যমে চলে যায় বিআরটিএ সিলেট অফিসের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মো. সানাউল হক ও লাইসেন্স শাখার মোটরযান পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে। তবে এসব অবৈধ আয়ের সিংহভাগই পান সহকারী পরিচালক ও মোটরযান পরিদর্শক। বাকী টাকা বিভিন্নভাবে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে থাকে।

সিলেট বিআরটিএ তে আগত সেবা গ্রহিতা ও একাধিক ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে নামে ‘ সুরমা টাইমসের’অনুসন্ধানী টিম ।অনুসন্ধানে জানা যায়, বাইরে থেকে লাইসেন্স, ফিটনেস, মালিকানা বদলী, নাম পরিবর্তন, নতুন গাড়ি রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন কাজ নেয়ার জন্য ১৬ জন লোক রয়েছেন। তারা হলেন- উত্তম, মাহদী, মনসুর, আনোয়ার, ইব্রাহীম, পিংকু, খছরু, আজিজ, সাব্বির, তানভীর, জাহাঙ্গীর, জিহাদ, রাজু, সাদেক এবং আজাদ। এর বাইরেও আরো কয়েকজন আছেন তবে তারা নিয়মিত নন। এই ১৬ জনের মধ্যে আবার কাজেরও ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এমনকি এসব লোকজন অফিসের কেউ না হলেও দেয়া হয়েছে চেয়ার-টেবিল। কেউ তো আবার কম্পিউটারে বসেও কাজ করছেন।

এরমধ্যে মাহদী লাইসেন্স শাখার কম্পিউটারে কাজ করেন, মুন্নু ফিটনেস শাখার প্রিন্টের কাজ, আজাদ ফিটনেস ডেলিভারি, জিহাদ ফিটনেস শাখায়, রেকর্ড রুমের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সাব্বির, জাহাঙ্গীর আর তানভীরকে, বিআরটিএ ৩০৯ নাম্বার রুমে বসে লাইসেন্সের বিভিন্ন কাজ করেন উত্তম, মনসুর, ইব্রাহীম, পিংকু এবং আনোয়ার, আজিজ, রাজু এবং সাদেক লাইসেন্স ও ফিটনেস শাখার দেখাশোনা করেন।

এদিকে বিআরটিএ সিলেট অফিসের সহকারী পরিচালক মো.সানাউল হক ও লাইসেন্স শাখার মোটরযান পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনের শুভদৃষ্টিতে ‘ভেতরের-বাইরের দালাল সিন্ডিকেট’ খুশি থাকলেও খুশি নয় সাধারণ গ্রাহক থেকে পরিবহন শ্রমিকরা। পরিবহন শ্রমিকদের অভিযোগ, এই দুই কর্মকর্তার ‘ নাগপাশে ’ আবদ্ধ সিলেট বিআরটিএ, তারা আসার পর থেকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে বিআরটিএ সিলেট অফিস। তাদের নির্ধারিত দালাল ছাড়া কাজ দিলে কোন কাজ হয় না।

উল্টো পরিবহন শ্রমিকদের করা হয় নানা ধরণের হয়রানি। এব্যপারে সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফলিক আহমদ সেলিম বলেন, ‘আমি এসব হয়রানির বিষয় নিয়ে বিআরটিএ সিলেট অফিসের এডি (সহকারী পরিচালক) কে কথাবর্তা বলেছি। কারণ এই এডি আসার পরপরই বিআরটিএ সিলেট অফিসে দুর্নীতি বেড়ে গেছে। আর তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন আবদুল্লাহ আল মামুন।

কারণ সে এক নম্বর ঘুষখোর। তিনি আরও বলেন, লাইসেন্স, ফিটনেস, কাজগপত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঝামেলা করার কারণে আমি শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বরাবর একটি অভিযোগ দিয়েছি।এদিকে শত অভিযোগ থাকার পরও চিহ্নিত দালালদের বৈধ বলছেন বিআরটিএ সিলেট অফিসের সহকারী পরিচালক মো.সানাউল হক। তিনি বলেন, বিআরটিএ অফিসে চাপ বেশি থাকায় এদেরকে দৈনিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানাজায় ব্যবহারীক পরীক্ষার নামে টাকা লেনদেন, মেডিকেল সার্টিফিকেট ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জালিয়াতির বিষয়টি।

বিআরটিএ-তে যারা ড্রাইভিং লাইসেন্স করেন তাদেরকে তিনটি ধাপে পরীক্ষা দিতে হয়। এরমধ্যে লিখিত, মৌখিক এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা (এখানে মোটরসাইকেল ও কার চালাতে হয়) দিতে হয়। কিভাবে এই ব্যবহারিক পরীক্ষা হয় তা দেখতে সম্প্রতি আলমপুরস্থ ব্যবহারীক পরীক্ষার স্থানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নামমাত্র নেয়া হচ্ছে ব্যবহারিক। মোটরসাইকেল ও কার মিলিয়ে দেড় থেকে দুই মিনিট চালালেই টাকার বিনিময়ে সানাউলের ‘নির্ধারিত লোকেরা’ পাশ করছেন ,আর অনির্ধারিত লোকেরা করছেন ফেল। কারণ যারাই দালালদের মাধ্যমে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চুক্তি করেন তারা লিখিত, মৌখিক পরীক্ষার পর নামমাত্র ব্যবহারীক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন, আবার কারো উপস্থিত হলেই চলে।

এখানে গাড়ি চালানো জানা বড় বিষয় নয়, অংশগ্রহণই বড় কথা। কারণ, ভেতরে রয়েছে টাকার খেলা। বিআরটিএ সিলেট অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে ২২শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিআরটিএ সিলেট অফিসে ১৪০ টি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন প্রায় ২০ হাজার ৫শ’ ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রত্যাশী। সেই হিসেবে প্রতিটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন প্রায় ১৪৬ জন। যদি প্রত্যেক লাইসেন্স প্রার্থী দুই মিনিটের মধ্যে কার ও মোটরসাইকেল চালিয়ে পরীক্ষা দেন তাহলে সকল পরীক্ষার্থর জন্য প্রয়োজন ২৯২ মিনিট। আর ঘণ্টা হিসেবে প্রায় ৫ ঘণ্টা।

কিন্তু বিআরটিএ সিলেট অফিস বিকাল তিনটা থেকে ব্যবহারিক পরীক্ষা শুরু করে সেই হিসেবে পরীক্ষা শেষ হবার কথা রাত ৮ টায়। তবে বিআরটিএ সিলেট অফিসের এই ব্যবহারীক পরীক্ষা বিকাল পাঁচটার আগেই শেষ হয়ে যায়। কারণ পরীক্ষার্থীরা মোটরসাইকেল চালিয়ে ১০ থেকে ১৫ ফিট জায়গা ঘুরেন। এতেই শেষ মোটরসাইকেল পরীক্ষা! আর কার পরীক্ষায় চালাতে হয় না গাড়ি, শুধু স্টিয়ারিং ধরবেন আর নামবেন এতেই হয়ে যাবে আপনার কার চালানোর পরীক্ষা। এখানেই শেষ নয়, পরীক্ষা পাশ করার পরই প্রার্থীর তথ্য সম্বলিত বিভিন্ন ফরম পূরণ করে বিআরটিএ অফিসে জমা দিতে হয়।

এরমধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন ফরমে রয়েছে (এখানে সেনশন এ ও বি মিলিয়ে প্রার্থীর বিভিন্ন ধরণের ৪১টি তথ্য পূরণ করতে হয়), জন্মসনদ, মেডিকেল সার্টিফিকেট এবং পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদনকারীদের জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স। আর্শ্চযের বিষয় হল, সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে এসব কাগজপত্র সংগ্রহ না হয়ে আসছে দালালদের মাধ্যমে। আর সেই কাগজপত্র কোন রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই গ্রহণ করছে বিআরটিএ সিলেট অফিস। অনুসন্ধানে জানা যায়, গুরুত্বপূর্ণ এসব ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায় নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে, যার ভাগ পান বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তারা। টাকার বিনিময়ে বিআরটিএ সিলেটের নির্ধারিত দালালদের মাধ্যমে নিজেদের তৈরি শীল-স্বাক্ষরেই হয় এসব কাগজপত্র। তাদের তৈরি করা একটি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে নগর বিশেষ শাখায় যোগাযোগ করা হয়। এসময় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের নগর বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার সুজ্ঞান চাকমা পুলিশ ক্লিয়ারেন্সে নিজের স্বাক্ষর দেখে অবাক হযে যান। তিনি জানান স্বাক্ষরটি তার নিজের নয়।তিনি বলেন বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত শুরু করবো।

যদি এমন হয়ে থাকে তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে বিআরটিএ সিলেটের সহকারি পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মো. সানাউল হক ভুয়া পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জমার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি নগর বিশেষ শাখার এক কর্মকর্তা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন। এর প্রেক্ষিতে আমরা গত বছরের ১লা নভেম্বর থেকে প্রার্থীর কাছ থেকে সরাসরি কোন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জমা নিচ্ছি না। এভাবেই সহকারী পরিচালক সানাউল হকের প্রতি মাসে অবৈধ আয় কয়েক কোটি টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট কিছু ‘ভেতরের-বাইরের দালাল সিন্ডিকেট’ ও নীতিনির্ধারকগণ এ টাকার ভাগ পান বলে একাধিক বিশ্বস্ত সুত্র জানিয়েছে। যার কারনে এদের তদবীরে নিয়মিত তদারকি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয় না।আর এভাবেই সানাউলের ‘ নাগপাশে ’ আবদ্ধ সিলেট বিআরটিএ ।

আর এ ‘ নাগপাশে ’ থেকে মুক্ত হতে বিআরটিএ সিলেট অফিসের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মো. সানাউল হক ও লাইসেন্স শাখার মোটরযান পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনের অপসারণ দাবি করেছেন সিলেটের সাধারন জনগন, সেবা গ্রহীতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিগণ।

একই সাথে এই দুই কর্মকর্তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ও দাবি করছেন সবাই। এব্যপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি অবৈধভাবে লোক নিয়োগ দিতে পারে না। আর এটা করার এখতিয়ার ও তার নেই ।

এজন্য তার শাস্তি হওয়া উচিৎ।আমরা মনে করি সরকার যে বারবার বলছে দুর্নীতি বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, সেই কথার বাস্তবায়ন বিআরটিএ সিলেট অফিসেও করা হোক। এব্যপারে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক সিলেটের ক্লিন ইমেজ রাজনীতিবিদ খ্যত জনাব আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি নিয়ম না মেনে বাইরের লোকদের অফিস করার অনুমতি দিতে পারেন না। সেজন্য তার শাস্তি হওয়া উচিৎ। আমরা আশা করবো সংশ্লিষ্ট দপ্তর তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

এসব অভিযোগ ও অনিয়মের ব্যপারে বিস্তারিত জানর জন্য বিআরটিএ সিলেটের সহকারি পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মো.সানাউল হকের ব্যবহৃত -০১৯৬৬-৬***৮৩ নাম্বারের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি ।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close