সামনে আসবে কি পাপিয়ার প্রশ্রয়দাতারা ?

সুরমা টাইমস ডেস্কঃঃ

নরসিংদীর যুব মহিলা লীগের বহিস্কৃত নেত্রী শামিমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরীকে তিন মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৫ দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া তাদের সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়ি্যবাকে এক মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের করা রিমান্ড আবেদনের শুনানি করে ঢাকার দু’জন মহানগর হাকিম গতকাল সোমবার এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিকে, পাপিয়াকে রিমান্ডে নেওয়া হলেও তার প্রশ্রয়দাতারা সামনে আসবে কিনা, রয়েছে সে প্রশ্নও। এ ছাড়া গতকাল সোমবার নরসিংদী জেলা মহিলা লীগের কমিটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

পাপিয়াকে দেখতে ভিড় :জাল টাকা সরবরাহ, মাদক ব্যবসা ও অনৈতিক কাজের অভিযোগে গ্রেপ্তার পাপিয়াকে দেখতে আদালতে ভিড় করেছেন অনেকেই। গতকাল সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন  ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রিমান্ড শুনানির সময় এমন দৃশ্য দেখা গেছে। এদিন বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে আদালতের এজলাসে হাজির করা হয় পাপিয়াকে। এরপর কাঠগড়ার পাশে একটি চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। এ সময় পাপিয়াকে না দেখতে পেয়ে সেখানে উপস্থিত বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, ‘তাকে কাঠগড়ায় ওঠানো হচ্ছে না কেন?’ বিচারক এজলাসে আসেন ৩টা ৪৫ মিনিটে। এরপর পাপিয়াকে কাঠগড়ায় ওঠানো হয়। ছবি তুলতে চাইলে আসামি শেখ তায়ি্যবা এক সাংবাদিককে বলেন, ‘আপনি ছবি উঠাচ্ছেন কেন?’ রিমান্ড শুনানির পর প্রায় ১৫ মিনিট বিরতির সময় কাঠগড়ায় থাকা পাপিয়া ও তার স্বামীর সঙ্গে আইনজীবীরা কথা বলেন। তখন পাপিয়াকে বলতে শোনা যায়, এ ঘটনায় তার জীবন শেষ হয়ে গেল। ওই সময় আইনজীবী তাদের বলেন, রিমান্ডে নিয়ে স্বীকারোক্তির জন্য চাপ প্রয়োগ করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হলেও তারা যেন জিজ্ঞাসাবাদকারীদের শেখানোমতে কোনো কথা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে না বলেন।

এদিকে পাপিয়ার রিমান্ড শুনানির সময় আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বেশ কয়েকবার বচসা হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, মামলার এজাহার বা রিমান্ড আবেদনে অনৈতিক কাজে পাপিয়ার জড়িত থাকার কোনো তথ্য নেই।

দুই পুরুষ আসামিকে শুরুতেই কাঠগড়ায় তোলা হলেও আদালতের কার্যক্রম শুরুর আগমুহূর্তে পাপিয়াকে কাঠগড়ায় তোলা হয়। এ সময় আইনজীবীদের কেউ কেউ বলেন, তাকে অবশ্যই কাঠগড়ায় তুলতে হবে। তারা অপকর্ম করবে আর ছবি তুলতে গেলে বাধা দেওয়া হবে, এটা কেন?

বাবার সংসারের ভিন্ন হাল :– পাপিয়া কোটি কোটি টাকার মালিক হলেও তার বাবার সংসার চলে অটো গাড়ির ভাড়ায়। তার বাবা সাইফুল বারী পেট্রোবাংলার গাড়িচালক ছিলেন। বর্তমানে নরসিংদীতে নিজ এলাকায় তার একটি অটো গাড়ির গ্যারেজ রয়েছে। সেখানে বেশ কয়েকটি অটো গাড়ি ভাড়া দিয়ে চলে তাদের সংসার। আর পাপিয়ার স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন গানের শিক্ষক মতিউর রহমান চৌধুরীর বড় ছেলে। মতিউর রহমান স্থানীয় নজরুল একাডেমির অধ্যক্ষের দায়িত্বে রয়েছেন। ২০০০ সালের দিকে নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক সুমনের উত্থান শুরু। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও ছিল তার আয়ের উৎস। পরে সুমন ২০১১ সালে বিয়ে করেন পাপিয়া চৌধুরীকে। এরপর পাপিয়াকে রাজনীতির মাঠে কাজে লাগান তিনি।

ক্যাসিনো কাণ্ডে পাপিয়ার নাম :– ক্যাসিনোকাণ্ডে পাপিয়ার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। সে বিষয়েও গোয়েন্দারা খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন। পাপিয়া ও তার স্বামী অনলাইন ক্যাসিনোর গডফাদার সেলিম প্রধানের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন। তার গুলশানের বাসায় পাপিয়ার ও তার স্বামীর যাতায়াত ছিল। সেলিম প্রধান ধরা পড়ে কারাগারে গেলেও অনেকেই কৌশলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ক্যাসিনোর টাকা দিয়েই ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডের এক বাসায় ২০১৮ সালে একটি ও ২০১৯ সালে আরেকটি ফ্ল্যাট কেনেন। ফার্মগেট, ২৮ ইন্দিরা রোডের একেকটি ফ্ল্যাটের দাম প্রায় দেড় কোটি টাকা। একেকটি ফ্ল্যাটে ডেকোরেশন করেছেন অন্তত দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা দিয়ে। ফ্ল্যাটে রয়েছে দামি খাট-পালঙ্ক, ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি ও আসবাব। এ ধরনের অভিযান চলার কারণে ক্যাসিনো থেকে পাওয়া টাকা পাপিয়া সরাতে পারেননি। ব্যাংকের টাকাগুলো বিভিন্ন সময়ে উঠিয়ে নিয়েছেন। অনেক টাকা দেশের বাইরে পাঠিয়েছেন। বাকি টাকা দেশে রেখে হুন্ডি চালিয়ে আসছিলেন- এমন তথ্যও পেয়েছে র‌্যাব। তবে তাদের সব অ্যাকাউন্ট তল্লাশি ও দেশের বাইরে পাঠানো টাকার সন্ধান করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সহায়তা চাওয়া হবে।

পরস্পরবিরোধী বক্তব্য :– পাপিয়াকে নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের পদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হীরু সমকালকে বলেন, পাপিয়া লবিং করে ঢাকা থেকে জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পান। ২০১৭ সালে সম্মেলন মঞ্চে স্থানীয় নেতাদের তোপের মুখে সে সময় পাপিয়াকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করতে পারেনি কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগ। পরে ঢাকায় গিয়ে পাপিয়াকে যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা করা হয়।

নজরুল ইসলাম হীরু বলেন, সরাসরি পাপিয়া ও তার স্বামীর সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই। কারও সঙ্গে ছবি থাকার অর্থ তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকা নয়। পাপিয়া ছিল দুর্বৃত্ত চক্রের। এ চক্রের ধান্ধা ছিল ঢাকায়। কয়েক বছর আগে পাপিয়ার স্বামীর বাসায় গুলি করা হয়। এ সময় পাপিয়ার শরীরে গুলি লাগে। এরপর তারা নরসিংদী ছেড়ে চলে যান।

নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘যুব মহিলা লীগের কাউন্সিলের সময় আমি মঞ্চে বসে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমা আক্তারকে অনুরোধ করেছিলাম, পাপিয়াকে কোনোভাবেই দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে না আনতে। তখন নাজমা আক্তার, বর্তমান শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূঁইয়া আমার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল একমত না হওয়ায় আমার সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয়। পরে আমি নরসিংদীর কাউন্সিলে কমিটি ঘোষণা করতে দিইনি।

তিনি বলেন, ‘পাপিয়ার অপকর্মের দায় যুব মহিলা লীগ নিচ্ছে না, সেখানে আওয়ামী লীগের দায় নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। পাপিয়ার স্বামী সুমন কার লোক, তাদের জন্ম কোথায় থেকে- নরসিংদীবাসী জানে। আমি রাজনীতিতে আসার আগেই সুমন ছিলেন প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের দেহরক্ষী। সুমনকে যারা তৈরি করেছে এ দায় তাদের, আওয়ামী লীগের নয়। আর নরসিংদীর রাজনীতিতে সুমন ও পাপিয়া আমার অনুসারী নয়। পাপিয়া কখনও নাগাল পায়নি। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমার নির্বাচনী প্রচার করতে চায় পাপিয়া ও সুমন। আমি বলেছি, আমার নির্বাচনী প্রচার তোমাদের করতে হবে না। কারণ, তারা ভোট চাইলে ভোট আরও কমবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল বলেন, তৎকালীন নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি রহিমা আক্তার ও রাজি উদ্দিন রাজুর তদবিরে পাপিয়াকে যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়। কমিটি গঠনের দিন পাল্টাপাল্টি শোডাউন হচ্ছিল। তাই ঢাকা থেকে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল।

তবে নরসিংদী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূঁইয়া বলেন, পাপিয়াকে রাজনীতির মাঠে আমদানি করেছেন এমপি নজরুল ইসলাম হীরু। এর দায় দলের অন্য কেউ নেবে না।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close