একুশের চেতনা আজও অবহেলিত

সর্বস্তরে চালু হোক বাংলা…….

চলে গেল একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ, যার ধারাবাহিকতায় অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বাঙালির এই আত্মত্যাগের দিনটি এখন রাষ্ট্রীয় সীমানার গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হয়ে থাকে। বাঙালির ভাষার সংগ্রামের একুশ এখন বিশ্বের সব ভাষাভাষীর অধিকার রক্ষার দিন। বাঙালির আত্মত্যাগের দিন এখন শুধু আর বাংলার নয়, প্রত্যেক মানুষের মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার দিন। যে চেতনায় বলীয়ান হয়ে বাংলার দামাল ছেলেরা সেদিন বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন, সেই চেতনা আজ আমাদের মধ্যে কতটা সঞ্চারিত? আমরা আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় একুশের চেতনাকে কতটা ধারণ করতে পেরেছি? এসব প্রশ্ন আজ সামনে এসে পড়ে এ কারণেই যে আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশের মাধ্যমিক স্তরের ৩৩ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাড়ে ২২ হাজার প্রতিষ্ঠানেই শহীদ মিনার নেই। আর ৬৩ হাজার ৬০১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০ হাজার বিদ্যালয়েই নেই শহীদ মিনার। একুশে ফেব্রুয়ারি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা অস্থায়ী শহীদ মিনার তৈরি করে সেখানে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানায়। পালন করে বাঙালির জাতীয় জীবনের অসাম্প্রদায়িক চেতনার পবিত্রতম দিনটি।

ভাষার জন্য জীবন দিয়ে বিশ্বে ইতিহাস সৃষ্টি করেছি আমরা। কিন্তু এই বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা চালু করা সম্ভব হয়নি এখনো। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন যে শহরের তরুণরা, সেই শহরের রাস্তাঘাট, বিপণিবিতানগুলোর সাইনবোর্ড বা পরিচয়ফলক ও নামফলক থেকে বাংলা উধাও হতে চলেছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন ও হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকার পরও পরিস্থিতির কোনো উত্তরণ লক্ষ করা যাচ্ছে না। ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এক আদেশে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বর প্লেট, সরকারি দপ্তরের নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন সরকারকে। আবার সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এ ছাড়া বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭-এর ৩ ধারায়ও সব কাজে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু এসবের প্রতিফলন কি আমরা কোথাও দেখতে পাচ্ছি? রাজধানীর তিনটি প্রধান সড়ক এবং প্রধান তিনটি মার্কেটের ৫৯০টি প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ফলক পর্যবেক্ষণ করে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সেগুলোতে বাংলার অবস্থান তলানিতে, স্পষ্ট আধিপত্য ইংরেজি ভাষার। পরিচয়ফলকগুলোর মধ্যে ৪৬.৭৭ শতাংশ ইংরেজিতে, ৩১.১৮ শতাংশ বাংলা-ইংরেজি মিশেলে এবং মাত্র ২২.০৩ শতাংশ বাংলায় লেখা। ভাষাসংগ্রামীদের স্মরণ করতে তাঁদের নামে ঢাকার ধানমণ্ডির কয়েকটি সড়কের নামকরণ করেছিল সিটি করপোরেশন। শুভ সেই উদ্যোগটিও এখন অবহেলা-অনাদরে জরাজীর্ণ।

এ তো আমাদেরই মানসিক দৈন্য। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় সর্বস্তরে বাংলা চালু, এর কোনো বিকল্প নেই।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close