৭৫ বছরে পর্দাপন করলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আলহাজ্ব এম এ মান্নান

নিজস্ব প্রতিবেদক:
আজ রবিবার ৭৫ বছরে পর্দাপন করলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আলহাজ্ব এম এ মান্নান এমপি। ভাঁটি অঞ্চল থেকে উঠে আসা সাবেক এ সফল আমলা এখন রাজনীতিতেও সফল। প্রথমে এমপি তারপর প্রতিমন্ত্রী। সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-দক্ষিণ সুনামগঞ্জ) আসনের টানা তিনবারের সাংসদও হয়েছেন। তৃতীয়বার সাংসদ হওয়ার পর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হয়ে প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসা ভাঁটি অঞ্চলের উন্নয়নের রূপকার রবিবার পর্দাপন করেছেন ৭৫ বছরে। ১৯৪৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ডুংরিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হাওর রত্ন খ্যাত এমএ মান্নান।

জানা যায়- জন্মের পর পিতা-মাতায় স্নেহ মমতা পেয়ে এমএ মান্নান গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় আকষ্মিক দূঘর্টনা। ছোটবেলায় কলেরা রোগ থেকে অলৌকিত ভাবে বেঁচে গেলেও হারিয়ে পেলেন ছোট ভাই-বোনকে। নদীর পানি খেয়ে বড় হওয়া এমএ মান্নান গ্রামের বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রের্ণী পর্যন্ত পড়ালেখা করার পর মামার বাড়ি জেলার ছাতক উপজেলার ধারনে চলে যান। সেখানে পড়াশোনার পর মামা স্কুল শিক্ষকের বদলীজনিত কারনে তিনি আলমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে সুনামগঞ্জ সরকারি জুবলি স্কুলে ভর্তি হন। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় এক সহপাঠীর মাধ্যমে জানতে পারেন পাকিস্তানের সারগোদা বিমান বাহিনীর বিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগের আবেদন নেয়া হচ্ছে। তিনি চট্রগ্রামে গিয়ে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে সেখানে গিয়ে পাকিস্তানের সারগোদা বিমান বাহিনীর স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল সম্পন্ন করেন।

পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্মাতক পিজিডি (অর্থনীতি) ম্যানচেষ্টার বিশ্ববিদ্যালয় ইংল্যান্ড ও ব্রাসলেস বিশ্ববিদ্যালয় বেলজিয়াম থেকে সার্টিফিকেট ইন ম্যানেজমেন্ট ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে তাঁর নির্দেশে সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। পর্যায়ক্রমে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে কাজ করেন। এরপর পদোন্নতি পেয়ে সরকারের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক এবং এনজিও ব্যুারোতে মহাপরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন।

এছাড়া জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের ইকোনমিক মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে চাকরি অবসর নেওয়ার পূর্বে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকুরী জীবনের ইতি ঘটলেও দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে যায় তাঁর। পরবর্তীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় নির্বাচন করতে সুনামগঞ্জ-৩ আসন জগন্নাথপুর-দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ছুঁটে আসেন। প্রয়াত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের মৃত্যুজনিত কারণে উপ-নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করেন সুনামগঞ্জ-৩ আসনে। যদিও প্রকাশ্যে সেসময় দলীয় প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগের সমর্থিত এ প্রার্থী সেসময় বিজয়ী হতে পারেননি। পরবর্তীতে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন।

আওয়ামী লীগ গঠিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ লাভ করেন। এরপর থেকে পিছিয়ে পরা ভাঁটি অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং বাস্তবায়ন করতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেন। এসময় তাঁকে সংসদে পাবলিক অ্যাকাউন্টস সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি মহাজোট সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছিলো। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফের আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে একই আসন থেকে পুনরায় বিজয়ী হয়ে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন।

সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পাওয়ায় সুনামগঞ্জ জেলাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এক এক করে সিলেট বিভাগের সর্ববৃহৎ সেতু ‘রাণীগঞ্জ কুশিয়ারা সেতু’, সুনামগঞ্জ টেক্সটটাইল ইন্সটিটিউট, সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ, জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজ সরকারীকরণ, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষিবিদ ইন্সটিটিউট নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কয়েকটি কাজ চলমান রয়েছে এবং কয়েকটি কাজের প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক নির্বাহী পরিষদ একনেকে অনুমোদন করিয়ে এনেছেন। আগামী বছর নাগাত এসব কাজ সম্পাদন হবে। এসব কাজ সম্পন্ন করতে দিনরাত পরিশ্রমী এ প্রবীণ রাজনৈতিক পুনরায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হয়ে পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদা লাভ করেন। হয়েছেন মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। গুরুত্বপূর্ণ এ পদ পেয়ে তৎপর হয়ে উঠেন কর্মযজ্ঞে। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (একনেকে অনুমোদনপ্রাপ্ত), ছাতক-সুনামগঞ্জ-মোহনগঞ্জ রেলপথে হচ্ছে রেললাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন, হাওরে ফ্লাইওভার নির্মাণ ইত্যাদি প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছেন।

এরপূর্বে ২০১০ এবং ২০১৩ সনে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ব্যক্তি জীবনে এমএ মান্নান দু সন্তানের জনক। স্ত্রী জুলেখা মান্নানও স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অবসরপ্রাপ্ত এ অধ্যাপিকা ছিলেন রাজধানী ঢাকার সুনামধন্য হলিক্রস মহিলা কলেজের অধ্যাপক হিসেবে অবসর নিয়েছেন। মান্নান দম্পতির দুই সন্তান। পুত্র সাদাত মান্নান যুক্তরাজ্যের বার্কলেইস ক্যাপিটাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে দীর্ঘদিন যাবত বসবাস করে আসছেন। আর তাঁদের কন্যা সারাহ্ মান্নান হোসাইন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

বর্তমানে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ণ নিয়ে কাজ করছেন। সুযোগ পেলে হাওর পাড়ের এ সন্তান ছুঁটে আসেন নিজ জন্মভিটায়। জন্মভূমি ও জন্ম এলাকা নিয়ে বেশ আগ্রহ আছে তার। প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন প্রায়ই সরকারি ছুটির দিন কাটাতে নির্বাচনী এলাকায় ছুটে আসতেন। এখনো আসেন। যদিও দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো এলাকায় যাওয়া আসা হয় কম তাঁর। তিনি হাওরবাসীর উন্নয়নে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান বলে একাধিকবার বলেছেন। তাঁকে সুনামগঞ্জে একসংবর্ধনায় “হাওর রত্ন” উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

হাওর রত্ন এমএ মান্নান হাওরাঞ্চলের মাটি ও মানুষের সাথে মিলেমিলে একাকার হয়ে যাওয়া মানুষটি জনকল্যাণকে ব্রত মনে করে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেয়ার সংগ্রামে তাঁর প্রচেষ্ঠা অনস্বীকার্য। তিনি মহান মুক্তিযোদ্ধের চেতনা, বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি সুখি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনায় যুক্ত রয়েছেন। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি জনগনের জন্য কাজ করতে চান। জনকল্যাণে নিবেদীতপ্রাণ সৎ, সজ্জ্বন, সফল সাদামনের মানুষ এম এ মান্নানকে জন্মদিনে জানাই অভিবাদন। শুভ জন্মদিন হাওরাঞ্চলের উন্নয়নের বরপুত্র।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close