সিলেট বিআরটিএ:দুই কর্মকর্তার ১৬ খলিফা, কোটি টাকার বাণিজ্য


অনুসন্ধানী প্রতিবেদনঃঃ বিআরটিএ সিলেট অফিস সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। তবে দালালের জন্য স্বর্গরাজ্য। কারণ একজন সাধারণ গ্রাহক যে কাজ বছরের পর বছর ঘুরেও করতে পারছেন না সেই কাজ বিআরটিএর দালালরা করে দিচ্ছেন মুহুর্তেই। তবে এজন্য আপনাকে গুনতে হবে সরকারি ফি এর অতিরিক্ত পরিমাণ টাকা। যে টাকা ভেতরের-বাইরের দালালদের মাধ্যমে চলে যায় বিআরটিএ সিলেট অফিসের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. সানাউল হক ও লাইসেন্স শাখার মোটরযান পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে।

তবে এসব অবৈধ আয়ের সিংহভাগই পান সহকারী পরিচালক ও মোটরযান পরিদর্শক। বাকী টাকা বিভিন্নভাবে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে থাকে।


কিভাবে তাদের কাছে টাকা পৌঁছায় এমন প্রশ্নের উত্তর খুজঁতে শুরু করে সুরমা টাইমস। অনুসন্ধানে জানা যায়, বাইরে থেকে লাইসেন্স, ফিটনেস, মালিকানা বদলী, নাম পরিবর্তন, নতুন গাড়ি রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন কাজ নেয়ার জন্য ১৬ জন লোক রয়েছেন।

তারা হলেন- উত্তম, মাহদী, মনসুর, আনোয়ার, ইব্রাহীম, পিংকু, খছরু, আজিজ, সাব্বির, তানভীর, জাহাঙ্গীর, জিহাদ, মন্নু, রাজু, সাদেক এবং আজাদ। এর বাইরেও আরো কয়েকজন আছেন তবে তারা নিয়মিত নন। এই ১৬ জনের মধ্যে আবার কাজেরও ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এমনকি এসব লোকজন অফিসের কেউ না হলেও দেয়া হয়েছে চেয়ার-টেবিল। কেউ তো আবার কম্পিউটারে বসেও কাজ করছেন।


এরমধ্যে মাহদী লাইসেন্স শাখার কম্পিউটারে কাজ করেন, মুন্নু ফিটনেস শাখার প্রিন্টের কাজ, আজাদ ফিটনেস ডেলিভারি, খছরু গাড়ি দেখার দায়িত্বে, জিহাদ ফিটনেস শাখায়, রেকর্ড রুমের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সাব্বির, জাহাঙ্গীর আর তানভীরকে, বিআরটিএ ৩০৯ নাম্বার রুমে বসে লাইসেন্সের বিভিন্ন কাজ করেন উত্তম, মনসুর, ইব্রাহীম, পিংকু এবং আনোয়ার, আজিজ, রাজু এবং সাদেক লাইসেন্স ও ফিটনেস শাখার দেখা শোনা করেন।


এসব দালালদের অফিসে কাজ করার জন্য অনুমতি দেয়া সহকারী পরিচালক মো. সানাউল হক ও লাইসেন্স শাখার মোটরযান পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুন তাদের মাধ্যমে বাণিজ্য করছেন প্রায় কয়েক কোটি টাকা। সেই টাকা আনুপাতিক হারে বিআরটিএ অফিস সিলেটের বিভিন্ন স্থরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ হয়। সেই ভাগের সিংহভাগ টাকা সহকারী পরিচালক ও লাইসেন্স শাখার মোটরযান পরিদর্শক পেলেও এসব দালালরা পাচ্ছেন নির্ধারিত হারে কমিশন। সেই কমিশনেই পোয়াবারো এসব দালালরা।


আর বিআরটিএ’র বাইরের দালালরা এদেরকে দুই কর্মকর্তার ‘খলিফা’ হিসেবেই চিনেন এবং জানেন। বাইরের দালালরা কোন কাজ সরাসরি কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ে গেলে হয় না। কারণ কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট শাখার দায়িত্বে যেসব ‘খলিফা’ আছেন তাদেরকে কাজ বা কাগজপত্র এবং নির্ধারিত টাকা দিয়ে যেতে বলেন। এভাবেই চলছে বিআরটিএ সিলেট অফিসের দুর্নীতি আর কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য।
এদিকে বিআরটিএ সিলেট অফিসের সহকারী পরিচালক মো. সানাউল হক ও লাইসেন্স শাখার মোটরযান পরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনের শুভদৃষ্টিতে ‘ভেতরের-বাইরের দালাল সিন্ডিকেট’ খুশি থাকলেও খুশি নয় সাধারণ গ্রাহক থেকে পরিবহন শ্রমিকরা।


পরিবহন শ্রমিকদের অভিযোগ, এই দুই কর্মকর্তা আসার পর থেকে দুর্নীতির ¯¦র্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে বিআরটিএ সিলেট অফিস। তাদের নির্ধারিত দালাল ছাড়া কাজ দিলে কোন কাজ হয় না। উল্টো পরিবহন শ্রমিকদের করা হয় নানা ধরণের হয়রানি।


বিআরটিএ সিলেট অফিসের সদ্য সাবেক লাইসেন্স শাখার মোটরযান পরিদর্শক মো. জমির হোসেনের সাথের ১৬ খলিফার কয়েকজন।সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফলিক আহমদ সেলিম সুরমা টাইমসকে বলেন, ‘আমি এসব হয়রানির বিষয় নিয়ে বিআরটিএ সিলেট অফিসের এডি সহকারী পরিচালক এর সাথে কথাবর্তা বলেছি। কারণ এই এডি আসার পরপরই বিআরটিএ সিলেট অফিসে দুর্নীতি বেড়ে গেছে। আর তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন।

কারণ সে এক নম্বর ঘুষখোর। প্রায় দেড় মাস আগে আমার এক শ্রমিকের লাইসেন্স এসেছে। অথচ মামুন সাহেব লাইসেন্স নিজের টেবিলে রেখে বলছিলেন আসেনি। এরপর আমি বিআরটিএ সিলেট অফিসে গিয়ে চাপ প্রয়োগ করলে তিনি লাইসেন্স বের করে দেন।’ তিনি আরও বলেন, লাইসেন্স, ফিটনেস, কাজগপত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঝামেলা করার কারণে আমি শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বরাবর একটি অভিযোগ দিয়েছি। এদিকে এতো অভিযোগ থাকার পরও চিহ্নিত দালালদের বৈধ বলছেন বিআরটিএ সিলেট অফিসের সহকারী পরিচালক মো. সানাউল হক।

তিনি বলেন, বিআরটিএ অফিসে চাপ বেশি থাকায় এদেরকে দৈনিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বছরের পর বছর এসব দালালরা চুক্তিভিত্তিক কিভাবে কাজ করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি এরকম নয়, কারণ যখনই প্রয়োজন হয়, তখন আমরা এদেরকে ঢেকে পাঠাই।’ তখন এ প্রতিবেদক তাকে প্রশ্ন করেন- এসব লোক বিআরটিএর চিহ্নিত দালাল, তাহলে কেন তাদেরকে আনা হচ্ছে। তখন সানাউল হক বলেন, ‘আমি জানতাম না তারা বছরব্যাপী রয়েছে। আমি এদেরকে বের করে দেব।’ তবে দৈনিক চুক্তির ভিত্তিতে কিংবা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নেয়ার ক্ষমতা বিআরটিএ সিলেট অফিসের নেই জানিয়ে বিআরটিএ’র পরিচালক (প্রশাসন) মো. ইউছুব আলী মোল্লা বলেন, যদি অতিরিক্ত লোক প্রয়োজন হয়, তাহলে তিনি সদর দপ্তরে বলবেন। আমরা ব্যবস্থা করে দেব।

আর যদি তিনি বছরব্যাপী এদেরকে নিয়ে থাকেন তাহলে তিনি পুরো কাজটি অবৈধ করেছেন। কারণ বছরব্যাপী তো আর অতিরিক্ত কাজের চাপে হতে পারে না। অতিরিক্ত কাজ অবশ্যই কিছু সময়ের জন্য হয়। আর যেহেতু তিনি লোক নিতে পারেন না সেহেতু তিনি পুরো কাজটি অবৈধ করেছেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ব্যপারে বিআরটিএ সিলেট অফিসের সহকারী পরিচালক মো. সানাউল হকের মুঠোফনে একাদিক কল দেওয়া হলে তিনি কল রিসিভ করেননি । চলবে , , ,

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close