বড়লেখায় খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী ‘শাডসুক মেনসিম’ উৎসব

সবুজ উঁচু টিলাবেষ্টিত খোলা মাঠ। সকালের কুয়াশা কেটে নরম রোদ এসে পড়েছে মাঠে। খোলা মাঠের ভেতর তখন পাহাড়ি নৈশব্দ। তবে এই নৈশব্দ ভেঙে নানা রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে খালি মাঠে জড়ো হতে থাকেন আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন। শিশু থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ সবাই এসেছেন মাঠে। তাদের উচ্ছ্বাসে মুখরিত পুরো মাঠ।

শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) ছিল মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার ৭ নম্বর খাসিয়া পুঞ্জি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী ‘শাডসুক মেনসিম’ উৎসব। বেসরকারি সংস্থা ইন্ডিজিনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস (আইপিডিএস) এই উৎসবের আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করেছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ইউকেএইড।

প্রথমবারের মত ৭ নম্বর পুঞ্জিতে এ উৎসব ঘিরে সাজানো হয় মাঠের আশপাশ এলাকা। উৎসব উপলক্ষে বসে মেলা। ছিল গ্রামীণ বিভিন্ন ধরনের খেলা। এতে অংশ নেন আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায়ের নানাবয়সী লোকজন। দিনভর নিজেদের সংস্কৃতির এই উৎসবে আনন্দমুখর সময় কাটায় আদিবাসী জনগোষ্ঠী।

আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে, ‘শাডসুক মেনসিম’ হচ্ছে আদিবাসী খাসিয়াদের একটি অন্যতম প্রধান উৎসব। যার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে মনের প্রশান্তির জন্যে নৃত্য। প্রতি বছর বসন্তকালে এই উৎসব পালন করা হয়। প্রধানত ভালো ফসল এবং সুখে শান্তিতে বসবাস করার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে এই নৃত্য-উৎসব পালন হয়। উৎসবটিতে নারী-পুরুষ ও শিশুরা নানা রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে খালি মাঠে এই নৃত্য উৎসবে অংশ নেয়। মূলত ৩টি ভিন্ন ধরণের নৃত্যের সহযোগে উৎসব পালন হয়।

এ উপলক্ষে আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন খাসি উৎসব শাডসুক মেনসিম উদযাপন কমিটির আহবায়ক মি. এলিয়াস বারে। আইপিডিএসের প্রকল্প সহায়তাকারী জেসলিনা প.লং এর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বড়লেখা উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের প্রশিক্ষক কাজী হুমায়ুন কবির, কুবরাজ আন্ত:পুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের উপদেষ্টা ফাদার যোসেফ গমেজ, বড়লেখার সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর আব্দুল্লাহ আল মামুন, বরমচাল মিশনের পাস্টার পাইরিন সুটিং,  সাংবাদিক তপন কুমার দাস, কুবরাজ আন্ত:পুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলী তালাং প্রমুখ। আলোচনা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইপিডিএস এর প্রকল্প সমন্বয়কারী মি. অরিজেন খংলা।

এসময় বড়লেখা সরকারি কলেজের আইসিটি বিভাগের অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস, দোহালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রঞ্জিত সিংহ, কুমারশাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আব্দুস সালাম, কবি রিপন দাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের উপদেষ্টা ফাদার যোসেফ গমেজ বলেন, ‘নানা কারণে খাসিয়াদের নিজস্ব সংস্কৃতি কালের আবর্তে প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় খাসিয়াদের ঐতিহ্যগত কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও উৎসবগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম খাসিয়াদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও উৎসবগুলো সম্পর্কে জানেনা। এগুলো ধরে রাখার জন্য কোনো পৃষ্ঠপোষকতা হচ্ছে না। কোনো সংগঠন এগিয়ে আসছে না। এটা দুঃখজনক। নিজেদের সংস্কৃতি নিজেদের তুলে ধরতে হবে। কিন্তু এটা আমরা তুলে ধরতে পারছি না। এক্ষেত্রে সকল যুবকদের জাগতে হবে। যুবকরা জাগলে এই ঐতিহ্যগুলো রক্ষা হবে।’

উৎসবের আয়োজনকারী সংস্থা আইপিডিএস এর প্রকল্প সমন্বয়কারী মি. অরিজেন খংলা বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মের কাছে ‘শাড সুখ মেনসিম’ উৎসব সম্পর্কে পরিচিতি, সংস্কৃতির চর্চা ও এর পুনরুদ্ধারের জন্যে এ উদ্যোগ। খাসিদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে। এগুলো চর্চা ও সংরক্ষণের জন্য সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ খুব প্রয়োজন।’

সকালে ফিতা কেটে খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী ঢোল ও খাসিয়া সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী পতাকা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে উৎসব শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন পুঞ্জি থেকে আসা সাংস্কৃতিক দল নৃত্য পরিবেশন করে। এতে বড়লেখা ও কুলাউড়ার ৮টি পুঞ্জির দল অংশ নেয়। এছাড়া বড়লেখার বিভিন্ন পুঞ্জির খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন অনুষ্ঠান দেখতে আসেন।বিজ্ঞপ্তি

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close