সিলেট সিভিল সার্জন অফিসে ঘুষ বাণিজ্য টাকা দিতে হয় কাগজে মুড়িয়ে

সিলেট সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় স্ত্রীকে নিয়ে প্রবেশ করেন সাংবাদিক আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহর স্ত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হিসেবে নতুন নিয়োগ পেয়ছেন।

১৬ ফেব্রুয়ারি জেলা শিক্ষা অফিসে যোগদান করার কথা। আব্দুল্লাহর স্ত্রীসহ সিলেট জেলায় মোট ৪১২ জন সহকারি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। কর্মস্থলে যোগদানের আগে তাদের প্রত্যেককে ‘সরকারি চাকুরীর জন্য প্রার্থীর স্বাস্থ্য বিষয়ক সার্টিফিকেট’ নিতে হয় সিলেটের সিভিল সার্জন অফিস থেকে।

২৫-২৬ জনের লম্বা লাইন সিভিল সার্জনের রুমের বাইরে। শুধু প্রাথমিক শিক্ষক নয়, লাইনে রয়েছেন অন্য সরকারি চাকুরিতে যোগদানকারীরাও। লাইনের একেকজন স্বাস্থ্য বিষয়ক সার্টিফিকেট নিচ্ছেন, বিনিময়ে মুঠোভরে টাকা দিচ্ছেন সিভিল সার্জনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) শামীম আহমদের হাতে।

কে কত দিচ্ছেন তা বোঝার জো নেই। কারণ টাকা দিতে হয় কাগজে মুড়িয়ে। ৭ জনের পরে এলো আব্দুল্লাহর স্ত্রীর সিরিয়াল। সাথে আব্দুল্লাহও ছিলেন। তার কাছে ২০০ টাকা চাইলেন শামীম আহমদ।

কেন টাকা দিতে হবে? জানতে চাইলেন আব্দুল্লাহ। প্রশ্ন শুনে তেলেবেগুনে জ¦লে উঠেন শামীম। বললেন, ‘কেন টাকা দিতে হবে সেটা জানতে চাচ্ছেন? আপনি যদি বেশি কথা বলেন তাহলে ডোপ টেস্ট বডি চেকআপসহ বিভিন্ন টেস্ট করাতে হবে। আর টেস্টগুলো করাতে লাগবে ৩-৪ হাজার টাকা।

আমাদের প্রেমানন্দ স্যার সিভিল সার্জন হওয়ার পর থেকে বাইরে প্র্যাকটিস করতে পারেন না। এখান থেকে স্যারকে টাকা দিতে হয়। সরকারি ফি ও স্যারের টাকা মিলিয়ে ২শ দিতে হবে। এর মধ্যে ১’শ সরকারি ফি এবং ১’শ টাকা সিভিল সার্জন স্যারের। আপনাদের সুবিধার জন্যই টাকাটা দিতে হবে।

নাহলে টেস্ট করাতে হবে। ভেজাল না করে টাকাটা দিয়ে সার্টিফিকেটটা নিয়ে যান।’ নিজের স্ত্রীর নতুন চাকরীর কথা ভেবে ২’শ টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে চলে আসেন আব্দুল্লাহ।


আরেক ভূক্তভূগী শিরিনও একই কাহিনী জানান। আগেই তার কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ২শ টাকা। রসিদ চাইলে তাকে বলা হয় এ টাকার কোনো রসিদ নেই। ২০০৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদানকারী মাছুমা বেগমও একই গল্প শোনালেন। তখন প্রাথমিক শিক্ষকদের স্বাস্থ্য বিষয়ক সার্টিফিকেটের জন্য সিভিল সার্জন অফিসে ৫০ টাকা করে দিতে হতো। দেড়যুগ পর ঘুষের পরিমাণ বেড়েছে।


একই কাহিনী ঘটে স্বাস্থ্য সার্টিফিকেট নিতে আসা প্রত্যেকের সাথে। এ যেনো ওপেন সিক্রেট। সিলেটে এটাই প্রথম নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলছে এ ঘুষ বাণিজ্য। সিভিল সার্জন অফিস থেকে স্বাস্থ্য বিষয়ক সার্টিফিকেট আনার জন্য জনপ্রতি গুণতে হয় ২শ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত। এই উৎকোচ গ্রহণ করে আসছেন সিভিল সার্জনের ব্যাক্তিগত সহকারী (পিএ) শামীম আহমদ। চল্লিশোর্ধ ভদ্রলোক নির্বিকারভাবে টাকা নিচ্ছেন দিনের পর দিন।


বিষয়টি নিয়ে কথা হয় সিলেটের সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার গকুল চন্দ্র দেবনাথের সাথে। তিনি বিষয়টি স্বীকার করে জানান, ‘দীর্ঘদিন থেকে এটা চলে আসছে। স্বাস্থ্য বিষয়ক সার্টিফিকেট আনার জন্য প্রাথমিক শিক্ষকদের টাকা দিতে হয়। এটি সরকারি ফি কিনা আমার জানা নেই। তবে সিলেটসহ অন্য অনেক স্থানেই এ টাকা গ্রহণ করা হয়।


সিলেটের সিভিল সার্জন প্রেমানন্দ মÐলের সাথে আলাপকালে তিনি জানান, আসলে বিষয়টি আমার জানা নেই। সার্টিফিকেট নিতে কোনো টাকা নেয়ার কথা নেই আর এভাবে টাকা নেয়ার কোনো নিয়মও নেই। আমি বিষয়টি দেখছি।


সিভিল সার্জনের অভিযুক্ত পিএ শামীম আহমদ শোনালেন এক অন্য গল্প। তিনি বলেন, সিভিল সার্জন স্যার ঘুষ নেয়ার ব্যাপারে অবগত আছেন। সিলেট ওসমানী হাসপাতালে টেস্ট করার মতো যন্ত্রপাতি না থাকায় স্বাস্থ্য বিষয়ক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। বাইরে থেকে এসব টেস্ট করাতে গেলে অনেক টাকা লাগে। তাই নতুন চাকুরীতে যোগদানকারীদের এত ঝামেলায় না ফেলে আমরা এমনিতেই সার্টিফিকেট দিয়ে দেই। কাউকে টাকা দেয়ার জন্য জোর করিনা। কেউ যদি খুশি হয়ে কিছু দেয় তাহলে গ্রহণ করি। তবে তিনি সিভিল সার্জনের নাম ভাঙিয়ে ঘুষ গ্রহণ করেন না বলেও জানান।

Sharing is caring!

Loading...
Open