সিলেটের এক গ্রামেই চারশ’ প্রতিবন্ধী!

সিলেটের প্রবাসীবহুল উপজেলার একটি বিশ্বনাথ। এখানকার বেশিরভাগ প্রবাসীই যুক্তরাজ্যে থাকেন। যেখানে-সেখানে গড়ে ওঠা অসংখ্য প্রাসাদসম অট্টালিকা আর বাড়ির সামনে কারুকার্যময় সুরম্য তোরণ- জানান দিচ্ছে বিশ্বনাথের ঐশ্বর্য। তবে আশ্চর্যরকমের ব্যতিক্রম এই উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের আমতৈল গ্রাম।

বিশাল এই গ্রামে পাকা বাড়িই আছে হাতেগোনা কয়েকটি। তারচেয়েও কম আছে নলকূপ। আর স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তো রীতিমত বিরল। তবে তারচেয়েও বড় তথ্য- এই একটি গ্রামেই প্রতিবন্ধী লোক আছেন প্রায় চারশ’। এরমধ্যে তিনশতাধিকই শিশু। এদের বেশিরভাগ আবার জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবারেরই কোনো না কোনো সদস্য প্রতিবন্ধী। শারীরিক প্রতিবন্ধীর পাশাপাশি বুদ্ধি প্রতিবন্ধীও আছে কেউ কেউ।

এই গ্রামের মাওলানা আবুল খায়েরের দুই ছেলে। রাফি মিয়া (৬) ও সাফি মিয়া (২)। তারা হাঁটাচলা করতে পারে না। কথাও বলতে পারে না। জন্মের পর থেকেই শিশু দুটি এমন সমস্যায় ভুগছে।

নিজের ছেলেদের ব্যাপারে মাওলানা আবুল খায়ের বলেন, যে বয়সে এসে ছেলে হাঁটতে শিখে সেই বসে এসে দেখি আমার ছেলেরা উঠে বসতেও পারে না। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কথা ফোটেনি তাদের মুখে। ছেলেদের নিয়ে সিলেট ও ঢাকায় অনেক চিকিৎসকের কাছে গিয়েছি। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না।

আবুল খায়ের ছেলেদের নিয়ে বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে গেলেও সে সামর্থ্য নেই আব্দুল মতিনের। আব্দুল মতিনের মেয়ে মৌসুমি বেগম এ বছর ১৮ তে পা দিয়েছে। এখনও কোলে তুলে তাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিতে হয়। জন্মের পর কোনোদিনও হাঁটতে পারেনি মৌসুমি।

আব্দুল মতিন বাড়ি বাড়ি ফেরি করে শুটকি বিক্রি করেন। দুই ছেলে এক মেয়েসহ ৫ জনের পরিবার তার। তিনি বলেন, পরিবারের খাওয়া খরচ জোগাতেই হিমশিম খেতে হয়। মেয়ের চিকিৎসা করাবো কী করে।

বিশ্বনাথ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবন্ধী সনাক্ত করতে সর্বশেষ ২০১৩ সালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ করেছিলো সমাজসেবা অধিদপ্তর। এরপর থেকে সমাজসেবা কার্যালয়ে এসেই প্রতিবন্ধীদের নাম তালিকাভূক্ত করাতে হয়। কেউ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে কার্যালয়ে এনে নাম তালিকাভূক্ত না করালে তাকে গণনায় ধরা হয় না। এ পর্যন্ত উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নে প্রতিবন্ধী হিসেবে জরিপের আওতায় এসেছেন ৫৯৯ জন। জরিপের আওতার বাইরেও কিছু প্রতিবন্ধী থাকতে পারেন বলে জানিয়েছেন সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তারা।

তারা জানান, এই ইউনিয়ন তথা পুরো উপজেলার মধ্যে আমতৈল গ্রামেই সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধী রয়েছেন। জরিপের আওতায় আসাদের মধ্যে প্রায় প্রায় সাড়ে তিনশ’ প্রতিবন্ধীই আমতৈল গ্রামের বলে জানিয়েছেন সমাজসেবা কর্মকর্তা।

তবে আমতৈল গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল খায়ের ও রামপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, এই গ্রামে প্রতিবন্ধী লোকের সংখ্যা প্রায় ৪শ’। এরমধ্যে প্রায় সাড়ে তিনশ’ই শিশু।

ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, এখানকার প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতিমাসে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে ফিজিওথেরাপি প্রদান করা হয়। এই প্রতিবন্ধীদের মধ্যে অর্ধেক সংখ্যক সরকারি ভাতা পান আর ৮০ শতাংশের প্রতিবন্ধী কার্ড আছে। তবে এই বছরের মধ্যে শতভাগ প্রতিবন্ধীকে ভাতা প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

কেনো এই গ্রামে এতো প্রতিবন্ধী?- এ ব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর বলেন, আমি বিভিন্ন চিকিৎসকদের সাথে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, এই গ্রামের প্রায় সকলেই একজন আরেকজনের আত্মীয়কে বিয়ে করছেন। স্বামী-স্ত্রীর একই গ্রুপের রক্তের কারণে এই সমস্যা হয়েছে।

আর বিশ্বনাথ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুর রহমান মুসা বলেন, এটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম। গ্রামের পরিবেশ খুবই অস্বাস্থ্যকর। দরিদ্রতা, পুষ্টিহীনতা, মাতৃকালীন স্বাস্থ্য ও শিশু স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে এখানকার অনেক শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নিচ্ছে। কেউবা আবার জন্মের পর বিভিন্ন অসুখে ভুগে প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া এখানে জন্মহারও অনেক বেশি।

সরেজমিনে গত রোববার আমতৈল গ্রাম ঘুরে এই দু’জনের কথার প্রমাণও পাওয়া গেলো। উপজেলা সদর থেকে আমতৈল গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৬ কিলোমিটার। গ্রামের প্রায় সকলেই মৎস্যজীবী। লোকসংখ্যা আছেন প্রায় ২৫ হাজার। ইউনিয়ন পরিষদের তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে এই গ্রাম। গ্রাম না বলে একে বড় বস্তি বলাই ভালো। ভাঙাচোরা সব ঘর একটির গায়ে আরেকটি প্রায় ঠেস দিয়ে আছে। যেখানে সেখানে খোলা পায়খানা, ছালা বা পলিথিনের বেড়া দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছে সেগুলো। তবে সে আড়াল ভেদ করে ময়লা ছড়িয়ে পড়ছে সড়কের পাশে। গ্রামের সবগুলো পুকুরই এদো। আবর্জনার স্তূপ জমে পানি তার রঙ হারিয়েছে। এসব এদো পুকুরেই বাসনপত্র ধুচ্ছেন নারীরা। গোসলও করছেন কেউ কেউ।

গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল গনি বলেন, এই গ্রামে নলকূপ খুবই কম। যেগুলো আছে সেগুলোতেও আর্সেনিক খুব বেশি। তাই গ্রামের লোকজন পুকুরের পানিই ব্যবহার করেন। আর গ্রামে স্যানিটারি ল্যাট্রিন খুব একটা নেই। সবাই দরিদ্র মৎস্যজীবী হওয়ায় ল্যাট্রিন বসানোর সামর্থ্য তাদের নেই।

তার নিজের ছেলে কুনু মিয়াও (১৮) জন্মের পর থেকে হাঁটাচলা করতে পারে না বলে জানান আব্দুল গনি।

নিজের চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়েছিলো এই গ্রামেরই বাসিন্দা রাজিয়া বেগমের। বিয়ের বছরখানেক পর জন্ম হয় তার মেয়ে সুমি বেগমের। জন্মের পর থেকেই হাঁটতে পারে না সুমি। রাজিয়া বলেন, কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। চিকিৎসা করানোরও সামর্থ্য নেই। তাই মেয়েও সুস্থ হচ্ছে না।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল খায়ের বলেন, দিনদিন এখানে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। ৪/৫ বছর আগেও কম ছিল। অথচ সম্প্রতি প্রতিবন্ধী শিশু জন্মের হার অনেক বেড়ে গেছে।

বিশ্বনাথ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের বলেন, এই গ্রামটির ব্যাপারে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও অবগত আছেন। এখানে প্রতিবন্ধী ভাতাও বেশি দেওয়া হয়। আমতৈল গ্রামে প্রায় ২৫০ জনকে প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করা হয় বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মণ্ডল বলেন, এক গ্রামে এতো সংখ্যক প্রতিবন্ধী থাকা খুবই আশঙ্কাজনক খবর। পুষ্টিহীনতা কিংবা আয়রনের অভাবে এমনটি হতে পারে। তবে আমি এখানে নতুন যোগ দিয়েছি। তাই সঠিক কারণটি বলতে পারবো না। এজন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close