বড়লেখার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে ডিআইজি, পঞ্চায়েত কমিটির কাছে ৫ লাশ হস্তান্তর

বড়লেখা প্রতিনিধি ::

মৌলভীবাজারের বড়লেখার উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউপির পাল্লাথল চাবাগানে পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রী-শাশুড়ি এবং দুজন প্রতিবেশীকে হত্যার পর এক যুবকের আত্মহত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি কামরুল আহসান।

সোমবার বিকেলে সাড়ে চারটার দিকে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

এসময় তিনি বাগানের চা-শ্রমিকদের সাথে কথা বলেন এবং নিহত জলি বুনার্জির মেয়ে চন্দনা বুনার্জির (০৯) খোঁজ খবর নেন। এসময় তাঁর সঙ্গে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমদ, সিলেটের জ্যেষ্ঠ সহকারি পুলিশ সুপার গৌতম দে, বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জ কর্মকর্তা ইয়াছিনুল হক, উত্তর শাহবাজপুর ইউপির চেয়ারম্যান আহমদ জুবায়ের লিটন, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জসীম ও মোশাররফ হোসেন প্রমুখ।

এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকার রবিবার ভোররাতে পারিবারিক কলহ নিয়ে নির্মলের সঙ্গে তার স্ত্রী জলি বুনার্জির ঝগড়া হয়। এরই জের ধরে সে জলিকে দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। এসময় জলিকে বাঁচাতে তাঁর মা লক্ষ্মী ও পাশের ঘরের বসন্ত ভৌমিক এবং বন্তের মেয়ে শিউলী এগিয়ে এলে নির্মল তাদেরও কুপিয়ে হত্যা করে। ঘটনার সময় কোনো মতে বেঁচে যায় জলির মেয়ে চন্দনা। চন্দনা দৌঁড়ে পালিয়ে গিয়ে চিৎকার দিলে আশাপাশের শ্রমিকরা বাড়ি ঘেরাও করেন। এ অবস্থায় নির্মল ঘরের দরজা লাগিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ঘটনার খবর পেয়ে সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশগুলো উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়।

এই ঘটনায় রবিবার রাতে পাল্লাথল চা বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন বাদি হয়ে থানায় মামলা করেন। সোমবার (২০ জানুয়ারি) রাতেই বাগানের ৮ নম্বর শ্মশান ঘাটে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

সোমবার (২০ জানুয়ারি) বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, কাজের দিনেও বাগানে নেই কোনো কর্মচাঞ্চল্য। প্রতিদিনের মত কেউ আর যার যার কাজ করছেন না। চায়ের ফ্যাক্টরিও বন্ধ। চা শ্রমিক পরিবারের লোকজনদের চেহারায় হতাশার চাপ। লোমহর্ষক এই হত্যাকান্ডের মত ঘটনা আগে কখনোই দেখেননি পাল্লাতল চা বাগানের শ্রমিকরা। এই ঘটনার আকস্মিকতায় প্রায় সকলেই বাকরুদ্ধ। বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে নিজেদের মধ্যে ফিস ফিস করে কথা বলছিলেন নারী চা শ্রমিকেরা। আফসোস আর আহাজারি ছাড়া তেমন কোনো কথাই বলতে পারছেন না কেউ।

বাগানের ফ্যাক্টরির সামনে কথা হয় পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি কার্তিক কর্মকারের সাথে। তিনি বলেন, ‘হত্যাকান্ডের এই ঘটনাটিতে সকলেই মর্মাহত। সোমবার বাগানের কাজের দিন। কিন্তু ঠিকমত কেউ কাজে যোগ দেয়নি। শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে সবাই। অনেকের ঘরে রান্নাই হয়নি। খাবার খেতে মন চাইনে। কেউ এই ঘটনাটি ভুলতে পারছে না।’

জানা গেছে, গত রবিবার (১৯ জানুয়ারি) ভোররাতে বড়লেখার ভারত সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পাল্লাথল চা-বাগানে পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রী, শাশুড়ি এবং দুই প্রতিবেশীকে কুপিয়ে হত্যা করেন নির্মল কর্মকার (৩৮) নামের এক ব্যক্তি। এরপর ঘরের তীরের সাথে রশিতে ঝুলে নিজেই আত্মহত্যা করেন।

নিহতরা হচ্ছেন নির্মল কর্মকারের স্ত্রী জলি বুনার্জি (৩০), শাশুড়ি ল²ী বুনার্জি (৬০), প্রতিবেশী বসন্ত ভৌমিক (৬০) এবং বসন্তের মেয়ে শিউলী ভৌমিক (১৪)। হামলায় বসন্ত বক্তার স্ত্রী কানন ভৌমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার সময় কোনোরকম পালিয়ে প্রাণে বেঁচে গেছে জলি বুনার্জির আগের স্বামীর পক্ষের মেয়ে চন্দনা বুনার্জি (৯)। সব হারিয়ে বেঁচে যাওয়া চন্দনা এখন বাগানের ফ্যাক্টরি বাবুর পরিবারের আশ্রয়ে আছে।

বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইয়াছিনুল হক সোমবার (২০ জানুয়ারি) বলেন, ‘এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু ও একটি হত্যা মামলা হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পঞ্চায়েত কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

Sharing is caring!

Loading...
Open