রাজনীতিবীদরা ‘ক্রসফায়ারকে’ উস্কে দিচ্ছেন

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আশ্বর্যজনক একটি দিন বোধহয় ছিল গত মঙ্গলবার। ঐ দিন ধর্ষণকারীদের ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) দুজন সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ ও মুজিবুল হক। শুধু তাই নয় তাদের দাবিকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান সরকারি দলের সাংসদ তোফায়েল আহমেদ। প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাহলে কী বিচারবর্হিভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে? কি অদ্ভুট চিন্তাচেতনা নিয়ে এমপিরা সংসদে যান।

আশ্বর্য হই, স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আইন প্রণেতারা কীভাবে এত সাহস দেখায়? তাও আবার আইনবর্হিভূত হত্যাকান্ড উৎসাহিত করতে। সাংসদরা ‘ক্রসফায়ারে’ মত নৃংশস হত্যাকান্ডকে সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশের আইন ও আদালতকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। দেশের আইনের প্রতি তাদের সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ নেই  । অথচ রাষ্ট্র পরিচালনা তাদের হাতে ন্যাস্ত। তোফায়েল আহমেদের মত একজন প্রবিণ রাজনীতিবীদ যখন বিচারবর্হিভূত হত্যাকে সমর্থন দেন তখন আমাদের কি ভাবা উচিত।

সাংসদরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘ক্রসফায়ারে’ বৈধতা দেওয়ার যে ব্যার্থ প্রয়াস চালাচ্ছেন তা আমাদের আংতকিত করে। মানুষ হত্যা মহাপাপ, আর এটা যদি হয় বিচারবর্হিভূত তখন সত্যিই হতবম্ভ হই। তবে অবাক হই কেউ যদি মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে নেয়। যেমনটা করেছেন তরিকত ফেডারেশনের সাংসদ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি। তিনি সাংসদে বলেন, ‘আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে বলছি, এদের (ধর্ষকদের) ক্রসফায়ার করলে কোনো অসুবিধা নাই।’ আল্লাহ ত কখনোই জীব হত্যার অনুমতি দেন নাই। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৮ সালে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড ঘটেছে ৪৪৯ টি যা চমকে উঠার মত ঘটনা।

‘ক্রসফায়ার’ এর মাধ্যমে কী দেশে অপরাধ কমেছে? ক্রসফায়ার বাংলাদেশে একটি জগন্য হত্যাকান্ড। এর বিরুপ প্রভাব ইতিমধ্যেই দেশবাসী প্রত্যাক্ষ করেছে। মাদক বিরুধী অভিযানে এর অপব্যবহার আমাদের উদ্বেগকে আর দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে সে যুদ্ধ আনুমানিক ১৫০ টি লাশ পড়েছিল তাপরও কী মাদক কমেছে? কোথায় কি হলো মাদক ত এখন আর বেপরোয়া গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে-কানাচে। মাদক সম্রাটরা প্রকাশ্য দিবালোকে ঘোরে বেড়াচ্ছে। সেদিন ক্রসফায়ার থেকে বাদ যায়নি নিরহ একরামুল হক। এগুলোই সব ভুয়া। আসলে ক্রসফায়ার হলো একরামুল হকের মত নিরহ মানুষদের কন্ঠ রুদ্ধ করা কৌশল মাত্র।

সাংসদ সদস্যরা ক্রসফায়ারের পক্ষে সাফাই গেয়ে রাষ্ট্র এবং সংবিধান প্রকাশ্যে অবজ্ঞা করেছেন। সংবিধান ২৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে যে, আইনের চোখে সমতা:  সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। এমনকি ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার। বিশেষত: আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোন ব্যাক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। তাহলে কী এই আইন প্রণেতারা সংবিধানকে পাশ কেটে ক্রসফায়ারকে সমর্থন দিতে চাচ্ছেন? ইস, বিস্মিত ও ব্যথিত হয়েছি দেশের রাজনীতিবীদের নীতির জ্ঞান অবলোকন করে।

ক্রসফায়ার বা বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড কখনো একটি গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া হতে পারে না। ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর রোগ প্রতিরোধ বা নিরাময় না করে যদি রোগীকে হত্যা করা হয় তখন ভাইরাস তার অবস্থানে থেকে যাবে। এটা সত্য ধর্ষণ বর্তমান সমাজে মহামারী আকার ধারণ করেছে। তাই মহামারী প্রলয় প্রতিরোধ করার কৌশল বের করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা একমাত্র পন্থা। কাজেই মানুষ মারার কৌশল বাদ দিয়ে আইন ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন দেখবেন মহামারী জীবাণু উল্টো পথে হাটবে।

মোঃ হাফিজুর রাহমান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অনলাইন এক্টিভিষ্ট

Sharing is caring!

Loading...
Open