সিলেটের লিটল থিয়েটারের ‘ভাইবে রাধারমণ’-এ মুগ্ধ শিলচর

নিজস্ব প্রতিবেদক ::

‘অনেক বছর পর সিলেট শহরের, এই কথাটা মনে রাখবেন, অনেক বছর পর সিলেট শহরের একটি ভাল নাটক এই উপত্যকার মানুষ উপভোগ করলো। আমরা আশাবাদী ভবিষ্যতেও আমরা অনেক ভাল ভাল নাটক দেখতে পাব। -বললেন শিলচরের নাট্য সংগঠক অজয় রায়। সেখানকার নাট্য সংগঠন কায়ানাট’র অন্যতম সংগঠক তিনি। লিটল থিয়েটার, সিলেট (লিথিসি)-এর নাটক ‘ভাইবে রাধারমণ’ দেখেই এমন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা অজয় রায়ের।

গত ১২ জানুয়ারি ভারতের আসাম রাজ্যের শিলচর শহরের রাজীব ভবনের সন্তোষমোহন দেব স্মৃতি মঞ্চে লিথিসি মঞ্চস্থ করে তাদের ২৬তম প্রযোজনা ‘ভাইবে রাধারমণ’। কায়নট উৎসবের শেষ দিনে মঞ্চস্থ হয় তানভীর নাহিদ খানের রচনা ও নির্দেশনা এবং আব্দুল কাইয়ুম মুকুলের পরিকল্পনা ও প্রয়োগে নাটক ‘ভাইবে রাধারমণ’। বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তের জীবন ও কর্ম নিয়ে নির্মিত এই নাটকটি মুগ্ধ করে শিলচরের দর্শকদের। প্রশংসা কুড়ায় নাট্যবোদ্ধাদেরও।

অজয় রায়ের মন্তব্যেই তার কিছুটা প্রমাণ পাওয়া যায়। শিলচরের উৎসবের আয়োজক সংগঠনের অন্যতম এই সংগঠক আরও বলেন, ‘এই নাটক মানুষের মনে এতোটা দাগ কেটেছে যারা দেখতে পায়নি তাদের অনেকের ফোন এসেছে আমার কাছে যে বিভিন্ন কারণে তারা আসতে পারেনি। আবার কবে আসা হবে, আবার কোথায় কোন জায়গায় নাটকটি দেখা যাবে। সত্যি আমরা আয়োজক হিসাবে এই দলকে এনে, আমরা প্রচন্ডভাবে গর্বিত এবং তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই।’

আসামের কাছাড় জেলার প্রধান শহর শিলচর। কাছাড়-করিমগঞ্জ তো একসময় সিলেটেরই অংশ ছিলো। ’৪৭-এর দেশভাগের সময় গণভোটে আলাদা হয় সিলেট। তবে এখনো সেখানকার ভাষা-জীবনযাত্রা-খাদ্যাভ্যাস সবকিছুই সিলেটের মতো। শিলচরের অনেকেই, বিশেষত এই অঞ্চলে শেকড় থাকা লোকেরা, এখনও নিজেদের ‘সিলেটি’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে এতো মিল সত্ত্বেও সিলেটের সাথে শিলচরের সাংস্কৃতিক আদান প্রদান শুরু হয় অনেকটা দেরীতেই। ১৯৯৭ সালে। অভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের মধ্যে বিভাজনের দেয়াল তোলার ক্ষত কাটিয়ে উঠতেই কিছুটা বেশি সময় লেগে যায় হয়তো। তবে কাকতালীয়ভাবে, এই আদান-প্রদান শুরু হয় লিথিসি’র মাধ্যমেই। সেবার শিলচরে ‘লাল লণ্ঠন’ নাটক নিয়ে যায় লিথিসি। এরপরে অনেকেই শিলচর গেছে। শিলচর থেকেও অনেক নাট্য সংগঠন সিলেট এসেছে। তবে লিথিসি’র আর যাওয়া হয়নি। দীর্ঘ ২৩ বছরের বিরতি। ২৩ বছর পর ২০২০-এ এসে আবার শিলচরের মঞ্চে লিথিসি।

২৩ বছর আগের সেই স্মৃতি রোমন্থন করে কায়ানট নাট্য উৎসবের আহ্বায়ক মনোজ কান্তি দেব বলেন, ‘‘১৯৯৭ সালে ‘লাল লন্ঠন’ নাটক নিয়ে সিলেট এসেছিলো লিটল থিয়েটার। এরমাধ্যমেই সিলেট-শিলচরের নাটকের দলের সম্পর্ক তৈরি হয়। এইবার তারা মঞ্চস্থ করলো ‘ভাইবে রাধারমণ’। অনেক প্রলোভনকে জয় করেই কিন্তু এই নাটকটি তৈরি করতে হয়েছে। এটি অসাধারণ একটি নাটক এবং আমরা লিটল থিয়েটারের কাছ থেকে আরও ভালো নাটক পাবো এবং আমরা এই শহর শিলচরে ভারতবর্ষে বসে দেখবো। আমরা মনে করি যারা এসেছেন তাদের সাথে আমাদের নাড়ির টান রয়ে গেছে। ফলে এই নাড়ির টান কিন্তু অবিচ্ছেদ্য। এই নাড়ির টান কিন্তু সহজে শেষ হতে পারে না।’’

সিলেটের মতো শিলচরেও রাধারমণ দত্তের গান ব্যাপক জনপ্রিয়। রাধারমণের ধামাইল গান সেখানকার বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আবশ্যিক অনুষঙ্গ। তবে রাধারমণের গান যেমন সকলেরই জানা, তেমনি তার জীবন প্রায় সকলেরই অজানা, একেবারেই অনালোচিত; এই বাংলার মতো বরাক উপত্যকার সেই ‘ছোট্ট বাংলা’য়ও। কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য যে অঞ্চলকে বলেছেন- ‘নির্বাসিত বাংলা’। ফলে তুমুল জনপ্রিয় এই গীতিকবি ও বৈষ্ণব সাধকের জীবন ও কর্ম নিয়ে নাটক ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করে শিলচরের নাট্যপ্রেমীদের। ১২ জানুয়ারি হলভর্তি দর্শকের উপস্থিতিতে মঞ্চস্থ হয় নাটকটি।

বাঙালির লোক সংস্কৃতির এই অবিচ্ছেদ্য পুরুষের অনালোচিত জীবন নিয়ে নাটক নির্মাণের প্রশংসা করে শিলচরের লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. অমলেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই নাটকে একরেবারে নতুন আঙ্গিকে আমাদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়েছে। এই ধরণের উপস্থাপনার মধ্য যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক, আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে আমরা দর্শকদের মাঝে তুলে ধরছি। ‘ভাইবে রাধারমণ’-এ আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে নাটকে রূপান্তর করে তার মধ্যে একটা বিশ্বজনীন রূপ দেওয়া হয়েছে। ফলে এই নাটকটি শেষপর্যন্ত কেবল একজন মানুষের জীবনী হয়ে থাকেনি, মানুষের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মানবিতাই যে শেষ কথা সেই বার্তাই এই নাটকের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে।’

লিটল থিয়েটার, সিলেটের আহ্বায়ক আব্দুল কাইয়ুম মুকুল বলেন, এরআগে দেশে আমরা ‘ভাইবে রাধারমণ’-এর ১০টি মঞ্চায়ন করেছি।  এবারই প্রথম দেশের বাইরে মঞ্চায়ন করা হলো। শিলচরের দর্শক ও নাট্যবোদ্ধারা যেভাবে নাটকটি গ্রহণ করেছে তা আমাদের অভিভ’ত করেছে। তাদের প্রশংসা আগামীতে আমাদের আরও ভালো করতে প্রেরণা জোগাবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close