সিলেটে যেভাবে গ্রেপ্তার হলো নবীগঞ্জের লিটন

ওয়েছ খছরু: স্কুলে ভর্তি করানোর কথা বলে সুরমা আক্তারকে নিয়ে যায় নবীগঞ্জের লিটন মিয়া। এ সময় মা ও ভাই ছিলেন সিলেট নগরীর সুবহানীঘাটে। এরপর থেকে সুরমাসহ লিটন নিরুদ্দেশ। বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষার পর লিটন আর আসে না। মেয়ে সুরমারও খোঁজ নেই। লিটনের মোবাইল ফোনে কল দেয়া হলে রিসিভ হচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে মেয়ের জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন সুমিতা বেগম। রাতেই সিলেটের কোতোয়ালি থানায় জিডি করেন।


পরে অবশ্য ফোন ধরেছে লিটন মিয়া। মোবাইলে জানায়, ৩০ হাজার টাকা দিলে সুরমাকে ফেরত দেবে। এরপর লিটনকে ধরতে ফাঁদ পাতেন সিলেটের কোতোয়ালি থানার এসি নির্মলেন্দু চক্রবর্তী। দুইদিন অপেক্ষার পর পুলিশের ফাঁদে পা দেয় লিটন। গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। আর উদ্ধার করা হয় অপহৃত স্কুলছাত্রী সুরমাকে। বর্তমানে সুরমা সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে আছে। অপহরণকারী লিটন মিয়ার বাড়ি নবীগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে। পিতার নাম আব্দুন নুর। নবীগঞ্জে বাড়ি হলেও প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে সে বাস করে মৌলভীবাজারে।

সিলেটে রয়েছে তার পরিচিতি। আর সুরমা আক্তারের বয়স ১২ কিংবা ১৩ হবে। হাইস্কুলের ছাত্রী। তার পিতা মৃত আজাদুর রহমান আজাদ। সুরমার বাড়ি নবীগঞ্জ উপজেলায়। স্থানীয় পানি উমদা গ্রামের বাসিন্দা তারা। পিতার অবর্তমানে সুরমার মা সুমিতা বেগমই পরিবারের হর্তাকর্তা।

স্বামীর অবর্তমানে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে অভাবে বাস করছেন সুমিতা বেগম। একই উপজেলায় বাড়ি হওয়ার কারণে লিটন তাদের পূর্ব পরিচিত। সুমিতা বেগম জানান, কয়েক দিন আগে লিটন তার কাছে প্রস্তাব দেয় সিলেট নগরীতে সে তার ছেলে সিদ্দিকুর রহমান আশিককে কাজ পাইয়ে দেবে।

এবং মেয়ে সুরমা বেগমকে স্কুলে ভর্তি করে দেবে। এ কারণে লিটন মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে সিলেট আসার কথা বলে। তার কথায় বিশ্বাস করে গত শুক্রবার সকালে ছেলে আশিক ও মেয়ে সুরমাকে নিয়ে সিলেটে আসেন তিনি। এ সময় লিটন জানায়, সে আশিককে নগরীর সুবহানীঘাটস্থ ইবনে সিনা হাসপাতালে লিফটম্যানের চাকরি দেবে। আর সুরমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেবে। সুবহানীঘাটের ইবনে সিনা হাসপাতালের পাশে তাদের দেখা হয়। এরপর সে সুরমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়ার কথা বলে নিয়ে যায়।

তাদেরকে ওখানে থেকে অপেক্ষা করতে বলে। এদিকে- সুরমা বেগমকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় লিটন মিয়া। সুমিতা বেগম ফোন দিলেও রিসিভ করছে না। বিকাল গড়িয়ে রাত হয়ে গেল লিটন সুরমাকে নিয়ে ফিরে আসে না। কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে রাতেই সঙ্গে থাকা ছেলে আশিককে নিয়ে কোতোয়ালি থানায় যান সুমিতা বেগম। থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর থেকে পুলিশও সুরমার সন্ধানে নামে। এদিকে- রাতেই লিটনের সঙ্গে যোগাযোগ হয় সুমিতা বেগমের। এ সময় লিটন মেয়ে সুরমা আক্তারের মুক্তিপণ হিসেবে ৩০ হাজার টাকা দাবি করে। বলে টাকা দিলে সুরমাকে ছেড়ে দেবে।

এ খবর পুলিশে পৌঁছামাত্র তদন্তের দায়িত্বে থাকা এসি কোতোয়ালি ফাঁদ তৈরি করেন। কথামতো লিটনকে ৩০ হাজার টাকা দেয়া হবে জানিয়ে বিকাশ নম্বর চাওয়া হয়। গত রোববার লিটন দক্ষিণ সুরমা এলাকার একটি দোকানের বিকাশ নম্বর দেয়। এরপর কথামতো সে ওই বিকাশের দোকানে গেলে কোতোয়ালি থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার ভাষ্যমতে নগরীর সুবহানীঘাট এলাকার একটি বাসা থেকে সুরমা আক্তারকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, যে বাসা থেকে সুরমাকে উদ্ধার করা হয়েছে সেটি ছিল লিটনের বন্ধুর বাসা। ওখান থেকে উদ্ধারের পর তাকে আদালতে তোলা হয়। জবানবন্দি গ্রহণের পর আদালত সুরমাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সিলেটের কোতোয়ালি থানার এসি নির্মলেন্দু চৌধুরী জানিয়েছেন, আসামি লিটন মিয়া সুরমাকে অপহরণের কথা স্বীকার করেই সুরমার অবস্থান পুলিশকে জানায়। এরপর পুলিশ গিয়ে সুরমাকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় রোববার সিলেটের কোতোয়ালি থানায় সুরমার মা সুমিতা বেগম বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ মামলার আসামি হিসেবে লিটনকে আদালতে সোপর্দ করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, মামলার এজাহারে সুমিতা বেগম দাবি করেছেন লিটন মিয়া তার মেয়েকে নির্যাতন করেছে। এ কারণে লিটনের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করা হয়।

সুমিতা জানান, ছেলেকে চাকরি ও মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর কথা বলে তাদের সিলেটে নিয়ে আসে লিটন। কিন্তু সুরমাকে অপহরণ করে নিয়ে যাবে সেটি তিনি চিন্তা করতে পারেননি। তিনি লিটনের শাস্তি দাবি করেন।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close