কুলাউড়ায় একবছরে ৯ হত্যাকাণ্ড, ১৩টি ধর্ষণ

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ও মারধরের মতো বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে দু’দিন বাদে শেষ হতে যাওয়া বছরে। এবারের এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙেছে বিদায়ী বছরের মাঝামাঝি সময়ে। এদিকে কুলাউড়ায় এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও অপরাধের প্রবণতা হঠাৎ করে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন উপজেলার সাধারণ মানুষ। সচেতন মহলের দাবি সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে কুলাউড়ায়।

উপজেলায় বিদায়ী বছরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে একটি বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম, বাড়িতে ঢুকে প্রবাসীর স্ত্রীকে মারধর, এক শিশুকে অপহরণ, উপজেলার এক গৃহপরিচারিকাকে গণধর্ষণ ও খুনের মতো লোমহর্ষক ঘটনা। বছরজুড়ে কুলাউড়ায় এসব ঘটনা দেখেছে দেশবাসী।

তবে এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন হওয়ার পাশাপাশি কছুটা স্বস্তি খবর হচ্ছে প্রতিটি ঘটনায় অভিযুক্তদের ও মামলার আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারপরও হঠাৎ করে এমন অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় শঙ্কা কাটেনি স্থানীয়দের।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে থানায় ৯টি হত্যা মামলা, একটি গণধর্ষণসহ ১৩টি ধর্ষণ মামলা এবং ১০টি ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন হয়রানি মামলা দায়ের করা হয়। স্থানীয় বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে কুপিয়ে জখম ও বাড়িতে ঢুকে প্রবাসীর স্ত্রীকে মারধরের ঘটনায় নারী শিশু নির্যাতনে মামলা ৩টি মামলা এবং ১টি শিশু অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়াও উপজেলায় তিনটি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়াও উপজেলার সীমান্ত এলাকায় মাদকের বিস্তার বেশি বেড়েছে। থানায় ৬৫টি মাদক মামলা হয়েছে।

কুলাউড়ায় বছরজুড়ে যত হত্যাকাণ্ড:

২৭ জানুয়ারি উপজেলার কর্মধার টাট্টিউলি গ্রামে ঘুমন্ত অবস্থায় মুসলিম উদ্দিন (৪০) নামে এক ব্যক্তি স্ত্রী রিমা বেগমের এলোপাথাড়ি দায়ের কোপে নিহত হন।

২৯ মে উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নের গাজীপুর এলাকায় মসজিদের আম গাছ থেকে আম পাড়তে বাধা দেওয়ায় প্রতিপক্ষের পিটুনিতে নিহত হন মন্তর মিয়া (৭০) নামে এক বৃদ্ধ।

১৭ এপ্রিলে উপজেলার সদর ইউনিয়নের গুতগুতি গ্রামে জমিজমা বিরোধের জেরে চাচা ও চাচাতো ভাইয়ের সাথে সংঘর্ষে দিলু মিয়া (৩৫) নামে দুই সন্তানের জনক মারা যান।

২১ আগস্ট উপজেলার ভূকশিমইলের সাদিপুর গ্রামে নদীতে দারাজাল (খেউ) ইজারার জেরে মামা-ভাগ্নের ঝগড়ার সময় ছুরিকাঘাতে মাদ্রসাছাত্র অনিক মিয়া (১০) খুন হয়।

২৭ এপ্রিল উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে নোয়াগাঁও গ্রামে শশুড়বাড়ির লোকজন কর্তৃক নির্যাতনে ফাহিমা আক্তার (২২) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুর অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করেন তাঁরই পিতা আবুল কালাম।

৩১ জুলাই কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের বালিশ্রী গ্রামের পরিমল শব্দকরের ছেলে পলাশ শব্দকর (৯) নামে এক স্কুলছাত্রকে বলাৎকারের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

১১ আগস্ট উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের হোসনাবাদ গ্রামে আপন বড় ভাই মামুনুর রশীদ মামুন ঘরে ঢুকে ছোট ভাই রাজিবুল ইসলাম রাজুকে (১৭) ভোরে ঘুমন্ত অবস্থায় নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।

৬ সেপ্টেম্বর উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নে কিশোর সুলেমানকে (১৩) নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

১৫ অক্টোবর কর্মধার বিরোধপূর্ণ লম্বাছড়া পুঞ্জির পাহারাদার ইসমত আহমদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে ওই পুঞ্জির গারো সম্প্রদায়ের লোক।

কুলাউড়ায় বছরজুড়ে আলোচিত যত ঘটনা:

১৫ এপ্রিল রাতে প্রেমিকের সাথে ঘুরতে গিয়ে ৭ যুবক কর্তৃক গণধর্ষণের শিকার হন ১৭ বছর বয়সী এক গৃহপরিচারিকা। উপজেলার আছুরীঘাটে এ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এসময় মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে ধর্ষণকারীরা এবং ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ করলে ভিডিও প্রকাশের হুমকি প্রদান করে। পরে পুলিশ দ্রুত ঘটনার সাথে জড়িত ধর্ষকদের আটক করে জেল হাজতে প্রেরণ করে। এছাড়াও বছর জুড়ে আরও ১২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এসব ধর্ষণের শিকার হন শিশুরাও।

প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় (১৫) স্থানীয় একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ২৭ এপ্রিল কুলাউড়া-ঘাটের বাজার সড়কের মীরশংকর এলাকায় প্রকাশ্যে দা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে জুয়েল আহমদ (২০) নামের এক যুবক।

৩০ জুন উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নে পারিবারিক বিরোধের কারণে এলাকার রহুল আমীন কর্তৃক (১৪) এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হলে রুহল আমীনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করে পুলিশ। এক সপ্তাহ পর সেই জামিনে মুক্ত হয়ে এসে রুহুল ও তাঁর পরিবারের লোকজনদের নিয়ে ওই ছাত্রীর মাকে মারধর করে এবং মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি দেয়। এতে ভয়ে মাসখানেক ধরে ঘরছাড়া থাকে ওই ছাত্রীসহ তার মা বাবা। পরে কুলাউড়া থানা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁদেরকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।

১৩ মে উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে এক প্রবাসীর বাড়িতে ঢুকে স্ত্রী স্ত্রী তিন কন্যার জননীকে মারধর করে একই এলাকার মোলাইম খান নামের এক ব্যক্তি। মোলায়েম খান এবং ওই প্রবাসীর বাড়ি পাশাপাশি গ্রামে। ওই নারীর দুই মেয়ের সামনে অর্ধনগ্ন করে প্রকাশ্যে বেধড়ক লাঠিপেটা শুরু করেন।

৩১ মে রাত ৮টার দিকে পৌরশহরের থানা রোডস্থ (৯) এক ৪র্থ শ্রেণির স্কুল শিক্ষার্থীকে প্রতিবেশী রেদওয়ানসহ কয়েকজন যুবক মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করে। ৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পরদিন ভোরে শ্রীমঙ্গল থেকে অপহরণকারীসহ অমিকে উদ্ধার করে পুলিশ।

এসব প্রবণতা কেন বৃদ্ধি পায় সে প্রসঙ্গে কুলাউড়ার লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম বলেন, বর্তমান আধুনিক যুগে অধিকাংশ মানুষ সুস্থ বিনোদন, জ্ঞান চর্চা এবং খেলাধুলা ছেড়ে ইন্টারনেট ও আকাশ সংস্কৃতি নির্ভর হয়ে পড়েছে। মানুষ স্বভাবজাত সামাজিক জীব। সমাজে যদি অস্থিরতা ও অবক্ষয় বিরাজ করে তাহলে মানুষের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় ঘটে এবং এর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে মানুষ সৃষ্ট অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইয়ারদৌস হাসান বলেন, কুলাউড়ার আইনশৃঙ্খলা বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সবসময় তৎপর ছিল এবং আছে। আয়তন ও জনসংখ্যার তুলনায় কুলাউড়ায় অনেক কম পুলিশ সদস্য রয়েছে। আরও কিছু জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ালে মানুষের দ্বারপ্রান্তে বেশি আইনি সেবা দেয়া সম্ভব হবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close