৭০-এর ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় বদলে দেয় ফজলে হাসান আবেদকে

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা ছিল ধারণার বাইরে। চারদিক থেকে খবর আসতে থাকে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করেন শেল অয়েলের কর্মকর্তা (তৎকালীন) ফজলে হাসান আবেদ। শেল অয়েল থেকে একটি স্পিডবোট জোগাড় করেন, সঙ্গে কিছু জ্বালানি তেল, কেরোসিন, ম্যাচ ও কিছু খাবার। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে যা দেখলেন তা হৃদয়বিদারক। সর্বত্রই মৃতদেহ—কোথাও মানুষের, কোথাও প্রাণীর। অনুভব করলেন, যে জীবন তিনি যাপন করছেন তা অর্থহীন, বিশেষ করে এমন প্রেক্ষিতে। নিজেকে বদলে ফেললেন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের শেল অয়েল কোম্পানির হেড অব ফিন্যান্স ফজলে হাসান আবেদ। গড়ে তুললেন হেল্প নামে একটি সংগঠন।

এর কয়েক মাসের মধ্যেই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। ফজলে হাসান আবেদ তখনো শেল অয়েল কোম্পানিতে কর্মরত। জ্বালানি তেল ও সরবরাহ বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃত্ব দখল করে নেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। প্রতিষ্ঠানটির আর্মি লিয়াজোঁ বিভাগের প্রধান করা হয় ফজলে হাসান আবেদকে। কিন্তু ফজলে হাসান আবেদ তখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বর্বরদের সঙ্গে কাজ করবেন না তিনি। তত্কালীন পাকিস্তানের দুই অংশ মিলিয়ে সর্বোচ্চ বেতনধারী কর্মকর্তাদের একজন হলেও দেশের টানেই সে চাকরির মায়া ত্যাগ করেন ফজলে হাসান আবেদ। শেলের আর্মি লিয়াজোঁ বিভাগের প্রধান হিসেবে তাকে একটি পাস দেয়া হয়েছিল। এ পাস ব্যবহার করেই পশ্চিম পাকিস্তান ও কাবুল হয়ে লন্ডনে পালিয়ে গেলেন তিনি। সেখানে তার চেনাপরিচিত অনেকেই ছিলেন। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানে থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত ও তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করেন তিনি। এ লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয় হেল্প বাংলাদেশ (ঘূর্ণিঝড়ের পর গড়ে তোলা সংগঠন হেল্প নয়) নামে একটি সংগঠন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে বেশকিছু মুক্তাঞ্চল গড়ে ওঠে, যেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। পাকিস্তানি বাহিনী দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এসব মুক্তাঞ্চলে খাদ্য সরবরাহও বন্ধ করে দিলে সেখানে খাদ্যাভাব দেখা দেয়ার আশঙ্কা ছিল মারাত্মক। এ অবস্থায় এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এসব মুক্তাঞ্চলে খাদ্যের নিরাপদ মজুদ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এক্ষেত্রে তার কাজ ছিল লন্ডন থেকে তহবিল সংগ্রহ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরি। অন্যদিকে তার বন্ধু ব্যারিস্টার ভিআই চৌধুরীর কাজ ছিল মুক্তাঞ্চলীয় নিরাপদ খাদ্য মজুদ তৈরিতে ভারত সরকারের সহায়তা আদায় করা। স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্যায়ে কোপেনহেগেনে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে দেশটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জন্য স্বীকৃতি আদায়েরও চেষ্টা চালিয়েছিলেন তিনি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে দেশে ফিরে আসেন ফজলে হাসান আবেদ। তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন হেল্প তখনো বিদ্যমান। কিন্তু সেখানকার কতিপয় সদস্যের দুর্নীতিপরায়ণতা ও অর্থগৃধ্নুতায় এর নেতৃত্ব গ্রহণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তিনি।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অবস্থা তখন শোচনীয়। সবকিছু যেন ধ্বংসস্তূপ। এক কোটি শরণার্থী ভারতে। স্কুলগুলো সব বন্ধ হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বলে কিছু নেই। প্রচুর জমি পড়ে আছে অনাবাদি অবস্থায়। আবার আবাদের জন্য বীজের অভাবও প্রকট। অভাব রয়েছে চাষের গরুরও। বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোর অবস্থা ছিল বেশি শোচনীয়। পাকিস্তানি বাহিনী এসব এলাকার ওপর তাণ্ডব চালিয়েছে বেশি। প্রচুর মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে সে সময়। আক্ষরিক অর্থেই অনেকের মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে ছিল গাছতলা।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের গ্রামীণ দরিদ্র জনগণের আবাসনের দিকটি নিয়েই কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন ফজলে হাসান আবেদ। এরই মধ্যে তার ব্যারিস্টার বন্ধুও এসে যোগ দিয়েছেন তার সঙ্গে। প্রথম দিকে কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন সিলেটের ২০০ গ্রাম। এছাড়া অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় সেখানে সরকারি সহায়তা পৌঁছার বিষয়টিও ছিল অত্যন্ত কঠিন। কাজের ক্ষেত্র হিসেবে এ দুর্গম এলাকাটিকেই বেছে নেন তিনি। গঠন করা হয় বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটি।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর গৃহায়ন কার্যক্রম চালাতে প্রথমেই গ্রামগুলোয় জরিপ চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জরিপের উদ্দেশ্য ছিল ন্যূনতম প্রয়োজন ও সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে, কোন পরিবারের কোন ধরনের আবাসন প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা। কিন্তু এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না তার হাতে। লন্ডনে একটি ছোট ফ্ল্যাট ছিল তার মালিকানায়। সেটি বিক্রি করে দায়দেনা শোধ করে তার হাতে অর্থ ছিল ৬ হাজার পাউন্ড। এত বড় পরিসরে গৃহায়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এটুকু যথেষ্ট ছিল না। তবে তা দিয়ে প্রাথমিকভাবে জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এজন্য স্থানীয় তরুণদের মধ্য থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষার্থীকে কাজে লাগান তিনি। প্রাথমিকভাবে ৪০ জন কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে গোটা এলাকার ওপর জরিপ চালান তিনি। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি, মৃত গবাদিপশু, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিশু ইত্যাদি সংখ্যা নিরূপণ করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয় একটি প্রকল্প প্রস্তাব।

এ প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে যোগাযোগ করা হয় বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে। প্রকল্প প্রস্তাবে অভাব-অনটনের মধ্যেও শিশুদের কোনো রকমে যাতে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সে লক্ষ্যে প্রথম বছরের কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোর দেয়া হয়। এজন্য তাদের উচ্চপ্রোটিনযুক্ত খাদ্য দেয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জমি চাষে সহায়তা করা হবে বলে জানানো হয়। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে। মার্চেই ১ লাখ ৮৯ হাজার পাউন্ডের প্রকল্পটিতে অর্থায়নে সম্মতি দেয় অক্সফাম।

এ কাজের জন্য কয়েকটি পাওয়ার টিলার আমদানি করা হয়। কৃষকদের বীজ সহায়তার জন্য বীজ আনা হয় ভারত থেকে। সে সময় প্রতি মাসেই বাংলাদেশ ও ভারতে যাতায়াত করতে হতো ফজলে হাসান আবেদকে। তার কাজ ছিল সেখান থেকে নানা দ্রব্য সংগ্রহ করে নিয়ে আসা। গৃহায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বাঁশ নদীপথে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি গ্রহণ করতে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করেছেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে কুশিয়ারা নদী দিয়ে আসাম থেকে নিয়ে আসা হয় বাঁশ। নয় মাসের মধ্যেই জাপান থেকে গ্যালভানাইজড লোহার পাত আমদানিতে সমর্থ হন ফজলে হাসান আবেদ ও তার সহযোগীরা। এছাড়া সরকারের কাছ থেকেও সহায়তা হিসেবে পান কিছু অতিরিক্ত গ্যালভানাইজড লোহার পাত।

প্রকল্পটির সাফল্য ছিল অভাবনীয়। প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ হাজার ৪০০ ঘরবাড়ি তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার ঘরবাড়ি তৈরিতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটি। কাজ শেষ হতে দেখা গেল প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে এখনো প্রায় ৫ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত রয়ে গেছে। এ উদ্বৃত্ত ফিরিয়ে দিতে গেলে পরবর্তী প্রকল্পের সহায়তার প্রথম কিস্তি হিসেবে রেখে দিতে বলে অক্সফাম। পরবর্তী সময়ে ফজলে হাসান আবেদ লন্ডনে গেলে তাকে জানানো হয়েছিল, সে সময় চলমান ৭০০ প্রকল্পের মধ্যে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটির প্রকল্পটিই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ।

এ অবস্থায় এক নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হন ফজলে হাসান আবেদ। বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটি পরবর্তী সময়ে আরো কার্যক্রম চালাবে কিনা, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাকে।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close