বর্বরতার শেষ কোথায়?

দৈনিক পত্রিকাগুলো পড়তে এখন ভয় হয়। কাগজগুলো খুললেই চোখ আটকে যায় কোন না কোন নৃংশস ঘটনায়। প্রতিদিন কোথায় না কোথায় বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে যা আমাদেরকে অসুস্থ করে দেয়। আর তখনই মাথায় ভর করে অজানা সব শংকা, রাগ, ক্ষোভ , মান এবং অভিমান। চারিদিকে এত বর্বরতা কেন? মানুষ এত রক্ত পিপাসু কী করে হতে পারে? অথচ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষ দিন দিন এত হিংস হচ্ছে কেন? মানুষের এই অধংপতন কী প্রমাণ করে? মাঝে মাঝে শংসয় হয় তাহলে কী আমরা অন্ধকার যুগে অগ্রহসর হচ্ছি? মানুষের বিবেক বুদ্ধি লোপ পাওয়ার কারণ কী?

প্রতিদিন অজানা সব আতঙ্কে প্রহর গুনতে হয় মানুষকে। কখন, কোথায়, কি হচ্ছে বুঝা মুশকিল। অনৈতিকতা আর বর্বরতায় দিশেহারা মানুষজন। কি আজব এক যুগে আমরা বসবাস করছি, নেই শ্রদ্ধাবোধ, সাম্মানবোধ এবং মানবতা, নেই সামাজিক মূল্যবোধ।যার ফলে মানুষের হিংসাত্মক রপ চরম আকার ধারণ করেছে। সমাজে হানাহানি , মারামারি, খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, দুর্নীতি এবং অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে অপ্রত্যাশিতভাবে। আমাদের দিন দিন কী হচ্ছে ? মনটা খারাপ হয়ে যায়।

এইত গত জুন মাসে বরগুনায় রিফাত নামে একটা ছেলেকে দুইজন লোক কোপিয়ে হত্যা করেছে তা আবার দিবালোকে সবার সামানে, রিফাতের স্ত্রী আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে স্বামীকে বাচাঁনোর জন্য কিন্তু সে ব্যার্থ…ইস! একটা মেয়ে স্বামী কে বাঁচানোর জন্যে একা লড়ে গেল,আর সবাই দাড়িয়ে থেকে তামশা দেখলো। আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? নৃশংসতারও একটা সীমা আছে কিন্তু এটা কোন ধরণের মানবতা? এ কোন দেশে বাস করছি আমরা! এ লজ্জা আমাদের সবার—এই সমাজের ও রাষ্ট্রের। কেননা আমরা আমাদের বিবেকবোধকে কবর দিয়েছি অনেক আগে। রিফাতকে যখন কোপানো হয় তখন মানুষ দাড়িয়ে তামাশা দেখে কেউ তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে না। যদি কেউ সাহস করে এগিয়ে আসত হয়তবা একটি প্রাণ বেঁচে যেত।

বগুড়ার কাহালুতে আফরিন জুট মিলে শিশু শ্রমিকের পায়ুপথে পেটে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যা করেছে অপর এক শ্রমিক। নিহত শিশু শ্রমিক আলাল (১২) কাহালু উপজেলার ঢাকন্তা গ্রামের মোতাহার হোসেনের ছেলে দৈনিক সংগ্রাম (২৫ অক্টোবর ২০১৯)। এই পৈশাচিক ঘটনা আমাদের সমাজ, রাষ্ট্রকে কী প্রশ্নবিদ্ধ করে না? সিলেটে কিশোর সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করে অপরাধীরা। আমাদের মনে সেই দাগ এখনও কাঠেনি। অন্যদিকে, গাইবান্ধায় বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেওয়ায় সম্ভু চন্দ্র হাওলাদার নামের এক মৎস্যজীবীকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে বেদম মারপিটের করা হয়( Dhaka Tribune, ২০ অক্টোবর ২০১৯)। আজকাল বুঝি কথা বলা অপরাধে পরিণত হয়েছে প্রভাবশালীদের সামনে। মানুষ নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি তুলে ধরতে অন্যায় করতে দ্বিধাবোধ করে না। প্রভাবশালীরা যেন সব, তাদের উর্দে কেউ নেই।

গত ৭ জুলাই, দেশে শিশু ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ঘটনা আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি প্রতিবেদন তুলে ধরে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৩৯৯টি শিশু। ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এ তথ্য তুলে ধরেছে। অন্যদিকে, একই সময়ে সারাদেশে ৪৯৬টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ)। সহজে বুঝা যাচ্ছে সমাজটা কোন পথে ধাবিত?

আমাদেরকে আতংকিত করে যখন আমরা দেখি এক জন রোগী হসপিটালে আরেকজন শিশু রোগী মায়ের সাথে ব্যাভিচার করতে লজ্জাবোধ বিষর্জন দেয়। গত বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রতিদিন এর একটি শিরোনাম এরকম ছিল, কুমিল্লার লাকসাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অসুস্থ শিশু সন্তানকে নিয়ে ভর্তি হওয়া এক নারীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে আমজাদ হোসেন (২৮) নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশে দেয়া হয়েছে।মানুষগুলোর হলো কী? এরা এত নিছ নির্লজ্জ কী করে হতে পারে?

নারায়ণগঞ্জে ফতুল্লার পশ্চিম নন্দলালপুর এলাকায় নিজের দেড় বছরের শিশুপুত্র আশফাক জামান জাহিনকে চারতলা বাড়ির ছাদ থেকে নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে এক মা। ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৪ অক্টোবর। এক জন মমতাময়ী মা কি করে তার শিশু সন্তাকে হত্যা করতে পারে। আবার দেখা গেছে মসজিদে মাদকের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ায় কক্সবাজার সদরের ইসলামাবাদে এক মসজিদের ইমামকে বর্বর নির্যাতন ও লাঞ্ছিত করেছে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারীরা(দৈনিক নয়াদিগন্ত)। এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য ইমাম সাহেবের বক্তব্যের পরিণতি যদি এই হয়, তাহলে মানুষের পশুত্বের ভয়ংকর রুপ আগামীতে কী হতে পারে?

শিশু তুহিনের বীভৎস লাশের ছবি আমাদেরকে আতঙ্কিত করেছে। এ কেমন বর্বরতা? তুহিনের চেহারা দেখে আমার স্নায়ুগুলো ঠান্ডা হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। প্রতিবেশীদের ফাঁসাতে গিয়ে আপন সন্তানকে টুকরো টুকরো করে হত্যা করে পিথা। সাথে সহযোগী ছিল আপন চাচা। এটা কী মেনে নেওয়া যায়? তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের লোমহর্ষক ঘটনা, খুশিপুরের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক কর্তৃক ৫ম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ ও তার গর্ভবতী হওয়া, সোনাগাজীর একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ কর্তৃক আলীম পরীক্ষার্থী নুসরাত নামে এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি ও প্রতিবাদের কারণে আগুনে পুড়ে হত্যা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

যদিও নুসরাত মরে গিয়ে প্রমাণ করেছেন তার গায়ে যে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে সেটি আসলে প্রতীকী আগুন, আসল আগুন লাগানো হয়েছে সমাজের গায়ে।আমাদের সমাজ এত পৈশাচিক হয়ে উঠেছে যে মরণ নেশার উত্তাল নৃত্য তারা উপভোগ করছে। বিবেকে পচন ধরেছে। এই পচনটা কী রোধ করা যায় না?

গত ২৯ অক্টোবর মানবজমিন একটি শিরোনাম করে ‘মেয়েদের সামনে দিগম্বর করে বাবাকে নির্যাতন (ভিডিও)’। দুই শিশু কন্যা হাউমাউ করে কাঁদছে। তাদের সামনেই হাত-পা বেঁধে বাবাকে দিগম্বর করে নির্যাতন করছেন এক ব্যক্তি। কন্যারা কাঁদলেই নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। শত শত মানুষ সেই দৃশ্য দেখছে। কিন্তু কেউ কোন প্রতিবাদ করছে না। এমনই একটি নৃংশস নির্মম নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে। ঘটনাটি গেল বছরের ডিসেম্বরে ভোলা জেলার কালমা ইউনিয়নে। এত নির্যাতনের পরও প্রভাবশালীরা থেমে নেই নির্যাতিত ব্যাক্তিকে জেলে ঢুকিয়েছে। আমারা আসলে কোথায় আছি? স্ত্রী-সন্তানের সামনে লোমহর্ষক অত্যাচার করে লোকগুলো কি পেল? একবারও কি বিবেক জাগ্রত হলো না যে এটা অন্যায়। আসলে ন্যায় অন্যায় মানুষ ভুলে গেছে। অনৈতিকতা আর অরাজকতা ভর করেছে তাদের।

এত নির্মমতা-হিংস্রতার পরও আমরা মানুষ, আমাদের ভাল পরিচয় আছে। মানবজাতি হিসেবে আমরা কি না করতে পারি। অসম্ভবকে সম্ভব করা আমাদের কাজ। তার মানে এই নয় যে, অন্যায় কে সমাজে প্রতিষ্টা করা। মানুষ পারে পশুত্ব পরিহার করে তার অসাধারণ মনুষ্যত্ব প্রকাশ করতে। পাাশাপাশি আইনের শাসন দমাতে পারে এই হিংস্রতা। সমাজে বর্বরতার এই ব্যাধিকে নিরাময়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ রক্ষা করতে পারে আমাদের সামাজিক বন্ধন। মানবিক আচার-আচরণই মানুষকে অপরাধ থেকে রক্ষা করতে পারে। বর্বরতা পরিহার করে মানবিকতা অর্জন করা হবে সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্টায় আদর্শিক লক্ষণ।

মোঃ হাফিজুর রাহমান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অনলাইন এক্টিভিষ্ট

Sharing is caring!

Loading...
Open