হবিগঞ্জ শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে কেনাকাটায় হরিলুট ৪২ হাজার টাকার ল্যাপটপ দেড় লাখ টাকা কেনা

মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ছবি সম্বলিত কাগজে ছাপা চার্ট বাজারে ১শ’ থেকে ৫শ’ টাকায় পাওয়া যায়। কিন্তু হবিগঞ্জের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ এরকম প্রতিটি চার্ট কিনেছে ৭ হাজার ৮শ’ টাকা দরে। ৪৫০ টি চার্ট ক্রয়ে তাদের ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ১০ হাজার টাকা।

এই মেডিকেল কলেজের জন্য ৬৭টি লেনেভো ল্যাপটপ কেনা হয়েছে। ১১০ কোর আই ফাইভ মডেলের সিক্স জেনারেশনের এসব ল্যাপটপের মূল্য রাখা হয়েছে ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫শ টাকা। প্রতিটির মূল্য পড়েছে ১লাখ ৪৮ হাজার ৫শ টাকা। কম্পিউটার সামগ্রী বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ফ্লোরা লিমিটেডে খোঁজ জানা গেছে, এই মডেলের ল্যাপটপ তারা বিক্রি করছে ৪২ হাজার টাকায়।

শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের কেনাকাটায় এমন অনিয়মের তথ্য মিলেছে আরও। কেনাকাটার নামে রীতিমত হরিলুট হয়েছে নতুন প্রতিষ্ঠিত এ মেডিকেল কলেজে।

২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়। ওই বছরের মে মাসে বইপত্র, জার্নাল, কম্পিউটার, ফার্নিচার, এসিসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দুটি জাতীয় ও একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় দরপত্র আহবান করেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও দরপত্র কমিটির সভাপতি ডা. মো. আবু সুফিয়ান। দরপত্রে মোট ৭টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।

যাচাই-বাছাই শেষে ঢাকার ‘নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে ১৫ কোটি টাকার এই কেনাকাটার কাজ দেওয়া হয়। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে উপর মহলের চাপে এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ আছে।

এই কেনাকাটার জন্য দরপত্র আহবান কমিটির সদস্য ছিলেন হবিগঞ্জের তৎকালীন সিভিল সার্জন সুচিন্ত্য চৌধুরী। তবে দরপত্র সংক্রান্ত কোন সভায় তাকে ডাকা হয়নি। এ ব্যাপারে ডা. সুচিন্ত্য বলেন, আমাকে কোনো সভায় ডাকা হয়নি। পরে আমার সাক্ষর নিতে চাইলে আমি সাক্ষর করিনি।

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ছিলেন জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ পরিচালক ডা. নাসিমা খানম ইভা। ডা. নাসিমা বলেন ‘আমি কোন সভায় যাইনি। তবে অফিসিয়াল ফর্মালিটিজ হিসেবে পরে স্বাক্ষর দিয়েছি। কোন দুর্নীতি হলে আমি এর দায়ভার নেব না।’

কলেজ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ – ১৮ অর্থ বছরে বইপত্র ও সাময়িকীর জন্য ৪ কোটি ৫০ লাখ, যন্ত্রপাতি অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য ৫ কোটি, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ, আসবাবপত্রের জন্য ১ কোটি টাকা, এমএসআরের (মেডিকেল এন্ড সার্জিকেল রিকোয়ারমেন্ট) জন্য ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ আসে।

দরপত্র পাওয়া ঢাকার শ্যামলী এলাকার বিশ্বাস কুঞ্জছোঁয়া ভবনের ‘নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ’ নামক প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশী মালামাল সরবরাহ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বইপত্র, যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, আসবাবপত্র, মেডিকেল ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে বিল নিয়েছে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার ৪শ ৯ টাকা।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, দেশে ১লাখ ৩৮ হাজার টাকায় পাওয়া যায় ‘ষ্টারবোর্ড’ নামে হিটাচি কোম্পানির ৭৯ ইঞ্চির ইন্টারেক্টিভ বোর্ড। কিন্তু একই কোম্পানি ও মডেলের এই ইন্টারেক্টিভ বোর্ডটি কেনা হয়েছে ১৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়। কম্পিউটার ও প্রজেক্টরের সমন্বয়ে স্পর্শ সংবেদশীল ইন্টারেক্টিভ বোর্ডটি ক্লাসে ব্যবহার হয়। কলেজের জন্য প্রতিটি ওজন মাপার যন্ত্র কেরা হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ টাকা করে। তবে দেশে উন্নত মানের ওজন মাপার যন্ত্র ৪০ হাজার টাকায় পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কলেজের ক্রয়কমিটির থেকে প্রাপ্ত কাগজপত্রে দেখা গেছে, এইচপি কালার প্রিন্টার (মডেল জেড প্রো এম ৪৫২এন ডব্লিউ) দাম নেওয়া হয়েছে ২লাখ ৪৮ হাজার ৯শ টাকা। ৫০জন বসার জন্য কনফারেন্স টেবিল, এক্সিকিউটিভ চেয়ার ও সাউন্ড সিস্টেমে ব্যয় হয়েছে ৬১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। চেয়ারগুলোতে ‘ইয়ামিন ফার্নিচার’ লেখা থাকলেও টেবিলগুলো কোন প্রতিষ্ঠানের স্টিকার লাগানো নেই। বাজারে এগুলোর দাম অর্ধেকেরও কম বলে জানা গেছে।

এছাড়া বিলের তালিকায় ৬নম্বরে আবারো কনফারেন্স সিস্টেম নামে ৫০ জনের জন্য (জনপ্রতি ২১ হাজার ৯শ টাকা) ১০লাখ ৯৯ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানের ১৫টি বুক সেলফের মূল্য ৬লাখ ৬০ হাজার, ৫টি স্টিলের আলমিরা ২লাখ ৮৫ হাজার, ১০টি স্টিলের ফাইল কেবিনেট ৪ লাখ ২২ হাজার, ২৫টি স্টিলের র্যাক ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি ৬৪৭৫ টি বইয়ের জন্য ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮ হাজার ৬শ ৬৪ টাকা বিল নিয়েছে। মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ১০৪টি প্লাস্টিকের মডেলের মূল্য নিয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৩ টাকা নিয়েছে। দেশের বাজারে ‘পেডিয়াটিক সার্জারি (২ ভলিউমের সেট) বইটির দাম ৩৩ হাজার টাকা। নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ দাম নিয়েছে ৭০ হাজার ৫শ ৫০ টাকা।

রাজধানীর মতিঝিলের পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৮১টি কার্লজিস প্রিমো স্টার বাইনোকুলার মাইক্রোস্কোপের মূল্য নিয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৩শ ২৫ টাকা। বাজারে এর মূল্য ১লাখ ৩৯ হাজার ৩শ টাকা বলে জানিয়েছেন কলেজটির একাধিক চিকিৎসক। ২ টনের এসি ১লাখ ৬৮ হাজার টাকা দরে ৩১টির মূল্য নিয়েছে ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ওয়ালটনের ৩৯ হাজার ৩শ ৯০ টাকা দরের ফ্রিজের জন্য গুনতে হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা করে। এরকম ৬টি ফ্রিজ কেনা হয়। ল্যাবরেটরিতে ব্যবহারের জন্য ডিজিটাল ওয়েইং (ওজন মাপার যন্ত্র) মেশিন ৬লাখ ৪০ হাজার টাকা দাম নেয়া হয়েছে।

সরবরাহকৃত বইয়ের তালিকা দেখে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মেডিকেল কলেজের দুজন শিক্ষক বলেন, যেসব বই কেনা হয়েছে এর কিছু বই এমবিবিএস ক্লাসের ছাত্রদের কোন কাজে লাগবে না। কারণ এসব বই গবেষণার কাজে লাগে।

এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. আবু সুফিয়ান বলেন, সরকারি কেনাকাটার সব ধরনের আইন ও বিধি মেনে দরপত্র কার্যক্রম চালানো হয়েছে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া বা কোন দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। অডিট রিপোর্টেও জিনিসপত্র কেনাকাটায় সম্পর্কে কোন নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়নি।

তবে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ ও বাজার দরের কয়েকগুণ বেশী দাম নেওয়ার বিষয় স্বীকার করে করে তিনি নিজের ব্যবহৃত টেবিল দেখিয়ে বলেন, এটি সেগুন কাঠের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর অধিকাংশ জায়গায় লাগিয়ে দেয়া হয়েছে হালকা বোর্ড। অথচ দাম দিতে হয়েছে সেগুন কাঠের।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close