হবিগঞ্জ শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে লুটপাট বানিজ্যঃ নেপথ্যে কারা?

বিশেষ প্রতিবেদনঃ হবিগঞ্জ তথা পূর্বাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর বছরেই ‘পুকুরচুরি’র অভিযোগ উঠেছে। প্রভাবশালী একটি চক্রের যোগসাজশে কলেজের চলতি দায়িত্বে থাকা অধ্যক্ষ প্রায় ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮১ হাজার ১শ’ ৯ টাকার টেন্ডার ভাগ-বাটোয়ারা করেছেন।

সেখানে বাজার মূল্যের চেয়ে কায়েকগুণ বাড়তি দামে জিনিসপত্র কিনে নীট বরাদ্দের বড় অংশই পকেটস্থ করা হয়েছে। টেন্ডার আহ্বানের সূচনা থেকে বিল পাস হওয়া পর্যন্ত যাবতীয় ডকুমেন্ট পর্যালোচনায় এটি নিশ্চিত যে, নব প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল কলেজটি লুটেরাদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকার প্রধানের নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজটির সম্মানও তারা ধূলায় মিশিয়ে দিতে বসেছেন।

উল্লেখ্য, উত্তরে সুনামগঞ্জ ও সিলেট, পূর্বে মৌলভীবাজার এবং পশ্চিমে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মেডিকেল পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থী এবং জনসাধারণের উন্নত চিকিৎসার কথা বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত ইচ্ছায় হবিগঞ্জে তাঁর নামেই মেডিকেল কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

তাছাড়া ২৪ টি চা বাগানের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এবং কর্মকার, ভৌমিক, বাউরি, সাঁওতাল, মুন্ডা, মৃধা, তাঁতী, কন্দ, রিকিয়াশন কৈরী, গোয়ালা, পার্শী, তেলেঙ্গা, মণিপুরী, ত্রিপুরা, পাইনকা, বাড়াইক বুনার্জী, ঝরা, চৌহান, রুদ্রপাল, কানু, কাহার, ছত্রী, অহির, রাজবংশী, শুকবদ্য, বিহারী, গঞ্জু, রবিদাস মহালী, বাক্তী, জংলী, তেলেগু, ভোজপুরী, উৎকোল, উরাং প্রভৃতি লুপ্ত প্রায় ক্ষদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নের কথা বিবেচনায়ও এ কলেজটি হবিগঞ্জে করা হয়েছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য মতে, কলেজটির ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বইপত্র, সাময়িকী, যন্ত্রপাতি অন্যান্য সরঞ্জমাদি ক্রয়ে প্রকৃত প্রস্তুতকারী, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী এবং সরবরাহকারীদের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১৮ সালের সূচনাতে। ওই বছরের ১৭ই মে প্রয়োজনীয় পণ্যের শিডিউল দাখিল করতে বলা হয়।

একই সঙ্গে অধ্যক্ষ (চলতি দায়িত্ব) ডা. মো. আবু সুফিয়ান স্বাক্ষরিত আদেশে বাজার দর মূল্যায়ন এবং টেন্ডার সংক্রান্ত বিষয়ে যাবতীয় পর্যালোচনায় ৩ জন প্রভাষককে দিয়ে একটি কমিটি করা হয়। যার সভাপতি করা হয় ফিজিওলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. মো. শাহীন ভূঁইয়াকে। সদস্য ছিলেন বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রভাষক ডা. কুদ্দুস মিয়া এবং ফিজিওলজি বিভাগের প্রভাষক পংকজ কান্তি গোস্বামী। পংকজ গোস্বামীকে কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়ন রিপোর্টে ওই কমিটির সদস্যদের কোনো সই ছিল না।

টেন্ডারেই লুটপাটের আয়োজন: বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সে মতে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। বইপত্র ও মালামাল কেনা হয় ১৫ কোটি ৪৯ লাখ ৭৮ হাজার ৮শ ৫৭ টাকার। ভ্যাট ও আয়কর খাতে সরকারি কোষাগারে জমা হয় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা ৯৭ হাজার ৭শ’ ৪৮ টাকা। ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮১ হাজার ১শ’ ৯ টাকা মালামাল ক্রয় বাবত ব্যয় দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে ওই মালামালের মূল্য ৫ কোটি টাকার বেশি নয়- এমনটাই বলছে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। বাকি টাকার পুরোটাই ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে।

সূত্র মতে, দরপত্রে মোট ৭টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এরমধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে উপযুক্ত দরদাতা (রেসপনসিভ) হিসেবে গ্রহণ করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। সেখানে বইপত্র ও সাময়িকীর জন্য ৪ কোটি ৫০ লাখ, যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য ৫ কোটি, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ, আসবাবপত্রের জন্য ১ কোটি টাকা, এমএসআর’র (মেডিকেল এন্ড সার্জিকেল রিকোয়্যারমেন্ট) জন্য ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা ধরা হয় (ভ্যাট আয়কর সহ) মালামাল কেনা বাবত। মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত মতে, ঢাকার শ্যামলী এলাকার বিশ্বাস কুঞ্জছোঁয়া ভবনের ‘নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ’ নামক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি মালামাল সরবরাহ করে। প্রতিষ্ঠানটি বইপত্র, যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, আসবাবপত্র, মেডিকেল ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে বিল নিয়েছে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার ৪শ’ ৯ টাকা।

সরবরাহকৃত মালামালের মধ্যে ৬৭টি লেনেভো ল্যাপটপের (মডেল ১১০ কোর আই ফাইভ, কিঙ জেনারেশন) মূল্য নেয়া হয় ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫শ’ টাকা। প্রতিটি মূল্য পড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫শ’ টাকা। ঢাকার কম্পিউটার সামগ্রী বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ফ্লোরায় একই মডেলের ল্যাপটপ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪২ হাজার টাকায়। ৬০ হাজার টাকা মূল্যের এইচপি কালার প্রিন্টার (মডেল জেড প্রো এম ৪৫২এন ডব্লিউ)-এর দাম নেয়া হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯শ’ টাকা। ৫০ জন বসার জন্য কনফারেন্স টেবিল, এঙিকিউটিভ চেয়ার ও সাউন্ড সিস্টেমে ব্যয় হয়েছে ৬১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। জনপ্রতি চেয়ার-টেবিল ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যয় পড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪শ’ টাকা। চেয়ারগুলোতে ‘ইয়ামিন ফার্নিচার’ লেখা থাকলেও টেবিলগুলো কোন প্রতিষ্ঠানের এর কোনো স্টিকার লাগানো নেই। দেশের নামিদামি ফার্নিচার প্রতিষ্ঠান হাতিল ও রিগ্যালে এসব চেয়ারের মূল্য ওই দামের অর্ধেকের চেয়েও কম। এছাড়া বিলের ৬ নম্বরে আবারো কনফারেন্স সিস্টেম নামে ৫০ জনের জন্য (জনপ্রতি ২১ হাজার ৯শ’ টাকা) ১০ লাখ ৯৯ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। অত্যন্ত সাধারণ মানের ১৫টি বুক সেলফের মূল্য ৬ লাখ ৬০ হাজার, ৫টি স্টিলের আলমিরা ২ লাখ ৮৫ হাজার, ১০টি স্টিলের ফাইল কেবিনেট ৪ হাজার ২২ হাজার, ২৫টি স্টিলের র‌্যাক ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল দেয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি ৬৪৭৫টি বইয়ের জন্য নিয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮ হাজার ৬শ’ ৬৪ টাকা।

শুধু তাই নয়। মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ১০৪টি প্লাস্টিকের মডেলের মূল্য ১ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৩ টাকা নিয়েছে। দেশের বাজারে ‘পেডিয়াটিক সার্জারি’ (২ ভলিয়মের সেট) বইটির দাম ৩৩ হাজার টাকা। নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ দাম নিয়েছে ৭০ হাজার ৫শ’ ৫০ টাকা। রাজধানীর মতিঝিলের মঞ্জুরি ভবনের পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে ৮১টি কার্লজিস প্রিমো স্টার বাইনোকুলার মাইক্রোস্কোপ সরবরাহ করেছে। যার মূল্য নিয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৩শ’ ২৫ টাকা। বাজারে এর মূল্য ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩শ’ টাকা। পুনম ইন্টারন্যাশনাল একই কোম্পানি ও মডেলের এসি’র দাম ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা দরে ৩১টির মূল্য নিয়েছে ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ওয়ালটনের যে মডেলের ফ্রিজ ৩৯ হাজার ৩শ’ ৯০ টাকা, একই কোম্পানি ও মডেলের ফ্রিজের মূল্য গুনতে হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। এ রকম ৬টি ফ্রিজ কেনা হয়। ল্যাবরেটরিতে ব্যবহারের জন্য ডিজিটাল ওয়েইং (ওজন মাপার যন্ত্র) মেশিন ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা দাম নেয়া হয়েছে। যার বাজার মূল্য ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ছবি সংবলিত কাগজে ছাপা চার্ট বাজারে ১শ’ থেকে ৫শ’ টাকায় পাওয়া গেলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রতিটি চার্ট কিনেছে ৭ হাজার ৮শ’ টাকা দরে।

এ রকম ৪৫০টি চার্ট ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। দেশে ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় পাওয়া যায় ‘স্টারবোর্ড‘ নামে হিটাচি কোম্পানির ৭৯ ইঞ্চির ইন্টারেক্টিভ বোর্ড। কিন্তু একই কোম্পানি ও মডেলের এই ইন্টারেক্টিভ বোর্ডটি কেনা হয়েছে ১৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়। কম্পিউটার ও প্রজেক্টরের সমন্বয়ে স্পর্শ সংবেদনশীল ইন্টাররেক্টিভ বোর্ডটি লেকচারের কাজে ক্লাসে ব্যবহার হয়।ওই সব মালামালের বাড়তি দাম নিয়ে কানুঘুষা আছে খোদ কলেজেই।কলেজের দু’জন শিক্ষক এ প্রসঙ্গে এক আড্ডায় বলেন, যেসব বই কেনা হয়েছে এর কিছু বই এমবিবিএস ক্লাসের ছাত্রদের কোনো কাজে লাগবে না। কারণ এসব বই গবেষণার কাজে লাগে। তারা বলেন, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের ফার্স্ট ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখন ৩য় বর্ষে পদার্পণ করেছে। আগামী ২০২২ সালে তারা ৫ম বর্ষে পৌঁছাবেন। কিন্তু ২০১৮ সালে ৫ম বর্ষে পড়ানোর জন্য বই কিনতে হবে এর কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাই না। বরং শিক্ষার্থীরা নতুন সংস্করণের বই থেকে বঞ্চিত হবে। সরবরাহকৃত বইয়ের মধ্যে ঢাকার নীলক্ষেতে কালার প্রিন্টারে ফটোকপি ও বাঁধাই করা বইও থাকতে পারে বলে অনেকের সন্দেহ। তাদের মতে, ওয়ালটন ও সনি কোম্পানির যে ৬টি টিভি কেনা হয়েছে তার মূল্যও নেয়া হয়েছে ২/৩ গুণ বেশি।

মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. আবু সুফিয়ানের সঙ্গে মোবাইলে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। টেন্ডার প্রক্রিয়ার অনিয়ম প্রসঙ্গে তার বক্তব্য জানার জন্য বিষয়টি উল্লেখ করে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

Sharing is caring!

Loading...
Open