রাঙ্গাকে ক্ষমা চাইতে হবে : নূর হোসেনের মা

সুরমা টাইমস ডেস্ক :: স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনকে জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার ‘মাদকাসক্ত’ আখ্যা দেওয়ার প্রতিবাদ করেছে শহীদের পরিবারের সদস্যরা। এর প্রতিবাদে সোমবার বিকেল চারটা থেকে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছেন নূর হোসেনের মাসহ পরিবারের সদস্যরা। তারা বলছেন, মসিউর রহমান রাঙ্গা এই বক্তব্যের জন্য ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত তারা অবস্থান চালিয়ে যাবেন।

বিকেল চারটার কিছু আগে নূর হোসেনের পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। প্রেসক্লাবের মূল ফটকের পশ্চিম পাশের ফুটপাথে তারা বসেন।

শহীদ নূর হোসেনের মা মরিয়ম বিবি, তিন ভাই, এক বোনসহ পরিবারের প্রায় ১২ সদস্য এই অবস্থানে অংশ নেন। নূর হোসেনের মা মরিয়ম বিবি কিছুক্ষণ পরপর চোখ মুছছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে একটা সিগারেট পর্যন্ত খেত না। তাহলে মসিউর রহমান রাঙ্গা কোন বিবেকে এই কথা বলল? তিনি কি এসে দেখেছেন, আমার ছেলে দেশের জন্য শহীদ হইছে। ও জনগণের জন্য রাজপথে নেমেছিল, বড়লোক হওয়ার জন্য না।’

মরিয়ম বিবি বলেন, ‘আমি জনগণের কাছে বিচার চাই। তাকে (মসিউর রহমান রাঙ্গা) ক্ষমা চাইতে হবে। তা না হওয়া পর্যন্ত আমি বুড়ো মানুষ, কষ্ট হলেও এইখানে বসে থাকব। নূর হোসেন হত্যারও বিচার হয় নাই। সেই বিচারও আমি চাই। রাঙ্গা তো মন্ত্রী ছিল, সে কোন জ্ঞানে এমন কথা বলল?’

গত রোববার জাতীয় পার্টির মহানগর উত্তর শাখার উদ্যোগে গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় শহীদ নূর হোসেন মাদকাসক্ত ছিলেন বলে মন্তব্য করেন মসিউর রহমান রাঙ্গা। জাপার বনানীর কার্যালয়ে ওই আলোচনা সভা হয়।

মসিউর রহমান ওই অনুষ্ঠানে বলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কাকে হত্যা করলেন। নূর হোসেনকে? নূর হোসেন কে? একটা অ্যাডিকটেড ছেলে। একটা ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর।’ তার দাবি, নূর হোসেনের হত্যার ঘটনায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ বা তার সরকার দায়ী ছিল না। যে ধরনের গুলিতে নূর হোসেন মারা গেছেন, সে ধরনের গুলি তখন পুলিশ ব্যবহার করত না।

এমন বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে ক্ষুব্ধ শহীদ নূর হোসেনের পরিবারের সদস্যরা। নূর হোসেনের বড় ভাই আলী হোসেন বলেন, ‘৩৩ বছর ধরে নূর হোসেনকে সম্মান দিচ্ছে এই জাতি। তাকে গণতন্ত্রের প্রতীক বলে জনগণ। শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে গণতন্ত্র দিবসও পালন করা হয়। সে গণতন্ত্রের জন্য মারা গেল। এখন তার সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ কথা বলা কেমন কথা হলো? আমাদের রাস্তায় নামতে হলো কেন? গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যারা মারা গেছে তাদের অবমাননা হলো। শহীদ পরিবারের অবমাননা হলো। নূর হোসেন হত্যাকাণ্ডের জন্য স্বৈরাচার এরশাদ সংসদে বসে মাফ চেয়েছিল, আমার বাবার কাছে মাফ চেয়েছিল। ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু হলো শহীদ নূর হোসেন গণতন্ত্র দিবস। প্রতিবছর ১০ই নভেম্বর তা পালন করা হয়। এই সময়েই কেন এ বক্তব্য তিনি (মসিউর রহমান রাঙ্গা) দিলেন। জনগণের কাছে আমাদের দাবি, এই লোকের বিচার হোক। এই লোকের নাম মুখে নিতেও কষ্ট হচ্ছে।’ তখন কি ফেনসিডিলের ব্যবহার ছিল, ইয়াবার ব্যবহার ছিল? প্রশ্ন আলী হোসেনের।

প্রতিবছর ১০ই নভেম্বর ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালের এই দিনে তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’—স্লোগান ধারণ করে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। মিছিলটি গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর পর এর পুরোভাগে থাকা নূর হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। তার তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ, বেগবান হয় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।

Sharing is caring!

Loading...
Open