বাবা-মায়ের কবরের পাশে শায়িত খোকা

সুরমা টাইমস ডেস্ক:: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় জুরাইন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে পাঁচ দফা জানাজা হয়। এসব জানাজায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে।
বাংলাদেশ সময় সোমবার বেলা ১টা ৫০ মিনিটে (নিউইয়র্ক সময় রাত ২টা ৫০ মিনিটে) নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের মেমোরিয়াল স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় তার মরদেহবাহী কফিন ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে। বিমানবন্দরে খোকার লাশ গ্রহণ করেন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
একই ফ্লাইটে আসেন খোকার স্ত্রী ইসমত হোসেন, ছেলে ইশরাক হোসেন ও ইশফাক হোসেন, মেয়ে সারিকা সাদেক এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালামসহ স্বজনরা।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহবাহী গাড়ি সংসদ ভবনের উদ্দেশে রওনা হয়। সঙ্গে হাজারও নেতাকর্মী। রাস্তার দুইপাশেও নেতাকর্মীরা দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান। বেলা ১১টার দিকে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মরদেহবাহী গাড়িটি পৌঁছায়।
সেখানে তার প্রথম জানাজার আগে বাবার জন্য দোয়া চান বড় ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। জানাজা শেষে বিরোধী দলীয় নেতার পক্ষে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা খোকার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে মেয়র আতিকুল ইসলাম, এলডিপির কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বিএনপির সংসদ সদস্য এবং দলের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। আরও অংশ নেন বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, হাজী সেলিম, আ স ম ফিরোজ, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, ফখরুল ইমাম, কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, কল্যাণ পার্টির মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ প্রমুখ। বিএনপি নেতাদের মধ্যে অংশ নেন মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, জমিরউদ্দিন সরকার, মঈন খান, আবদুল্লাহ আল নোমান, হাফিজউদ্দিন আহমেদ, এম মোরশেদ খান (সদ্য পদত্যাগকারী), জয়নুল আবদীন ফারুক, ফজলুল হক মিলন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু প্রমুখ।
দুপুর ১২টায় খোকার মরদেহ নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে সিপিবির মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, আওয়ামী লীগের গোলাম দস্তগীর গাজী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্যের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের আবু সাইয়্যিদসহ এলডিপি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপি, জাগপা, জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, তাঁতী দল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, মুক্তিযোদ্ধা দল, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট, জাতীয় শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ যুব সমিতি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ভাসানী অনুসারী পরিষদ, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি, জাতীয় হিন্দু মহাজোট, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, ছাত্র ইউনিয়ন ও গণসংহতি আন্দোলনের নেতারা খোকার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
পরে পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিহিংসার যে রাজনীতি চর্চা, তার ভুক্তভোগী আমার বাবা, আমার পরিবার।
বাবার সঙ্গে গত পাঁচ বছর কাটিয়েছি। অনেক কিছু শিখেছি। তিনি বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। এখানে আজ যে হানাহানির রাজনীতি চলছে, এর জন্য বাবা মুক্তিযুদ্ধ করেননি। রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকবে, বহু রাজনৈতিক দল থাকবে, আমাদের লড়াই হবে ভোটের মাধ্যমে।
ইশরাক বলেন, বিএনপির যারা আহত, নিহত ও অত্যাচারের শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, এই রাজনীতির চর্চা কতদিন চলবে? বাংলাদেশে দুজন অভিভাবক আছেন- একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, যিনি জেলে আছেন।
আরেকজন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমি প্রশ্ন রাখতে চাই, আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়? আপনারা এর সমাধান করে দেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার জামিনের যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো দূর করেন। আশপাশের স্বার্থবাদীদের বাদ দিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিয়ে যান।
আমরা যারা নতুন প্রজন্ম, আমারা চাই না আর কোনো বিএনপি পরিবার এই প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হোক এবং অন্য কোনো দল যদি ক্ষমতায় আসে, তখন আওয়ামী লীগের কোনো পরিবার প্রতিহিংসার শিকার হোক।
আমাদের অভিভাবক যারা আছেন, তাদের এর সমাধান করে দিয়ে যেতে হবে। অন্য কারও দিয়ে এটা হবে না। এ সময় শ্রদ্ধা জানাতে আসা সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বাবার জন্য তিনি সবার কাছে দোয়া চান।
দেড়টার দিকে খোকার মরদেহবাহী কফিন নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নেয়া হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরা। এ সময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে আসা মানুষের সমাগম নয়াপল্টন, ফকিরাপুল, কাকরাইল এলাকার সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। ওই এলাকার সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রয়াত নেতার কফিনটি দলীয় পতাকা দিয়ে মুড়িয়ে দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এরপর কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে ফুল দেয়া হয়। কালো কাপড়ে মোড়া অস্থায়ী মঞ্চে রাখা হয় কফিন।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, সবার প্রিয় নেতা সাদেক হোসেন খোকা আমাদের ছেড়ে এমন একসময় চলে গেলেন, যখন আমাদের দেশনেত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে।
তিনি তাকে শেষ দেখা দেখতে পারলেন না। এই ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্যাতনে সারা বাংলাদেশের মানুষ যখন অত্যাচারিত-লাঞ্ছিত, সেই সময়ে যে মানুষগুলো ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, খোকা তার অন্যতম।
তার এই অকালে চলে যাওয়ায় যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হল, তা পূরণ হওয়ার নয়। পরে সেখানে দ্বিতীয় জানাজা হয়। এরপর তার কফিনে স্যালুট জানায় সেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমরের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল।
জানাজায় অংশ নেন বিএনপির শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, শাহজাহান ওমর, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলু, মো. শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, আহমেদ আজম খান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, মাহবুব উদ্দিন খোকন, খায়রুল কবীর খোকন, হাবিবউন নবী খান সোহেল, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, আবদুস সালাম আজাদ, খোন্দকার মাশুকুর রহমান, আকন কুদ্দুসুর রহমান, এবিএম মোশাররফ হোসেন, তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনীর হোসেন, শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদির ভুইয়া জুয়েল, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, এসএম জাহাঙ্গহীর, মাহবুবুল হাসান ভূঁইয়া পিংকু, দুলাল হোসেন, হায়দার আলীর লেলিন, বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ, ওমর ফারুক সাফিন, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান ও শামসুদ্দিন দিদার, জামায়াতে ইসলামীর মজিবুর রহমান, হামিদুর রহমান আজাদ, শামীম সাঈদী, জাগপার খোন্দকার লুৎফর রহমান, এনপিপির ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম প্রমুখ।
বিকাল ৩টায় খোকার মরদেহ নেয়া হয় তার সাবেক কর্মস্থল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নগর ভবন প্রাঙ্গণে। এ সময় মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মেয়র সাঈদ খোকনসহ সাবেক ও বর্তমান কাউন্সিলর, কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ ইমদাদুল হক ও বিভিন্ন দফতরের বিভাগীয় প্রধানসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
পরে সেখানে তৃতীয় জানাজা হয়। এতে মেয়র সাঈদ খোকন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদসহ কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেন। জানাজা শুরুর আগে সাঈদ খোকন বলেন, একজন মেয়র হিসেবে নগরবাসীর সেবা করে গেছেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি দলমত নির্বিশেষে মানুষের জন্য সেবা করে গেছেন, এটাই ছিল তার আদর্শ।
পরে খোকার মরদেহ নেয়া হয় তার প্রিয় ক্লাব ব্রাদার্স ইউনিয়নে। কিছুক্ষণ রাখার পর সেখানে চতুর্থ জানাজা হয়। পরে কফিন গোপীবাগে পৈতৃক বাসভবনে নেয়া হয়। এ সময় আত্মীয়স্বজনদের কান্নায় আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
হাজারও মানুষ মরদেহ একনজর দেখতে ভিড় জমান। সেখান থেকে বাদ আসর ধুপখোলা মাঠে সর্বশেষ জানাজা হয়। পরে জুরাইন কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয় তার লাশ। সেখানে পুলিশের ১৭ সদস্যের একটি চৌকস দল ঢাকা জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার আবদুল আউয়ালের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায় ও গার্ড অব অনার প্রদান করেন।
এ সময় পুলিশের এডিসি নাজমুর নাহারসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আবদুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে স্যালুট জানানো হয়। পরে জুরাইনের পুরনো কবরস্থানে মা সালেহা খাতুন ও বাবা এমএ করীমের কবরের পাশে দাফন করা হয় সাদেক হোসেন খোকাকে।
এ সময় পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিবউন নবী খান সোহেলসহ দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতা ও আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার বাদ আসর চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির উদ্যোগে নাসিমন ভবনের দলীয় কার্যালয়ের মাঠে সাদেক হোসেন খোকার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

Sharing is caring!

Loading...
Open