বিনা পুঁজির ব্যবসায় কোটিপতি ওরা !

আহমেদ শাকিলঃ শাহপরান মাজার- এ যেন আলাদীনের প্রদীপ । বিনা পুঁজির ব্যবসায় কোটিপতি । বাড়ী গাড়ী, ফ্লাট, মার্কেট, হোটেলের মালিক। একি হিন্দি ফিল্মের কৌন বনেগা কোটিপতি’র ছোঁয়া। না এরা একজন নয়, দুজন নয় কোটিপতি হয়েছে ওরা উনত্রিশ জন। শুধু দেশে নয় সুদূর ব্রিটেন ইউরোপ আমেরিকায় তাদের বিত্তের ঢেউ লেগেছে। কি সেই বিনা-পুঁজির ব্যবসা ?

মাজার ব্যবসা । না লালসালু উপন্যাসের মজিদের মত কোন ভুয়া মাজারকে কেন্দ্র করে নয়। উপমহাদেশের অন্যতম অলি হযরত শাহপরান (রহ.) এর মাজার কে কেন্দ্র করেই এ চক্রের আলীসান জীবন যাপন। সুরমা টাইমস’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে খাদেম,

মোতাওয়াল্লি মুখোশে সমাজের মানুষকে চুষে খেকো এসব মানুষরুপী জোঁকের আসল চেহারা। তাদের পুঁজি ভন্ডামি আর নিরপরাধ মানুষের ভক্তি – আবেগ। সরল বিশ্বাসে চরম দু:সময়ে মানুষ শরনাপন্ন হয় অলি – আউলিয়ার মাজার খানকায়। দানকরে মুক্ত হস্তে। আর এসব দান খয়রাতের টাকা ভক্ষণ করে এই খাদেম, মোতাওয়াল্লি নামধারীরা । সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা একটি দুষ্ট চক্রের বিস্তর চিত্র তুলে ধরছি আমরা সুরমা টাইমসে ।

হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের টাকা লুটপাট করে ২৯ ব্যক্তি এখন কোটিপতি। তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে ভক্ত ও আশেকান সহ এলাকাবাসী। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগে প্রকাশ,মাজারের শ’ শ’ কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনায় প্রায় দশ বছর ধরে এলাকাবাসীর সঙ্গে ওই সিন্ডিকেটদের দেন-দরবার চলছে। এই মাজার ব্যবসায়ীরা এখন গাড়ি-বাড়ির মালিক। গড়ে তুলেছে নামে বেনামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শাহপরান (রহ.) মাজার নিয়ে ব্যবসা করে যারা কোটিপতি হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন- মাজার মসজিদের মুয়াজ্জিন হারুনুর রশিদের ছেলে মামুনুর রশীদ, তার ভাই আমিনুর রশিদ, মামা হাফিজ আব্দুল হান্নান তিনি শাহপরান মাজার মসজিদের ইমাম মাদ্রাসা র মুহতামিম, মামুনুর রশিদের ভাইপো ও সাবেক কমিশনার কামাল আহমদ, জামাল আহমদ, আমাল শাহ, মামুনুর রশিদের চাচাতো ভাই আজিজুর রহমান কুনু, লাল মিয়া, কবির আহমদ, ছাদিকুর রহমান, বেলাল আহমদ, জালাল আহমদ, জাবেদ আহমদ, মামুনুর রশিদের ভাতিজা ফিরোজ মিয়া, ফরিদ গাজী, ফজলুর রহমান, আবদুল ওয়াহিদ তৌহিদ মিয়া, অরিদ মিয়া, শাহজাহান আহমদ, আজাদুর রহমান, কাবুল মিয়া, ইরন মিয়া, নুর মিয়া, রঞ্জু মিয়া,

আলি আহমদ, আবদুল আহাদ ও আবদুল আজিজ। ওদের বিত্তের নেটওয়ার্ক শাহপরানের মাজার এলাকা থেকে শুরু করে সিলেট ঢাকা ব্রিটেন ইউরোপ আমেরিকা পর্যন্ত – বিস্তৃত। বিলাস বহুল গাড়ি বাড়ি, আধুনিক বিপণী বিতান, ক্লিনিক, হোটেলসহ খ্যাত অখ্যাত বহু ব্যবসার নিয়ন্ত্রক এখন তারা। এক সময় নূন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা অনেকের তো কাপড় পড়ারও টাকা ছিলোনা অথচ কোনো ত্যাগ বা কষ্ট ছাড়া গদিতে বসে শাহপরান মাজারের দানের টাকা লুটপাট করে তারা একেকজন এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। তাদের সন্তানাদি থাকেন ইউরোপ আমেরিকায়। তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন রায়তি বাপ দাদার নামের আগে ছিলো না কোনো টইটেল সন্তারা সবাই এখন নামের আগে লাগান সৈয়দ।শাহপরান(রহ:) এর মাজারের মোতাওয়াল্লি নামধারী

মামুনুর রশিদ শহরতলির খাদিমপাড়া গ্রামের হারুনুর রশিদের ছেলে। তাদের মূল বাড়ি মৌলভীবাজারের রাজনগরে। হারুনুর রশিদ ছিলেন হযরত শাহপরান মাজার মসজিদের মুয়াজ্জিন। ছেলে মামুনুর রশিদ এখন মাজারের হর্তাকর্তা। সাবেক মোতোওয়াল্লি তারা মিয়া ছিলেন একাত্তরে শানি- কমিটির স্থানীয় এলাকার চেয়ারম্যান । এজন্য তাকে ১৯৭২ সালে কারাভোগ করতে হয়। তখন এলাকাবাসীর সমর্থনে স’ানীয় কুটি মিয়াকে মাজার পরিচালনার দায়িত্বে দেয়া হয়। এ সময় তার সঙ্গে মসজিদের মুয়াজ্জিনের ছেলে হিসেবে সহযোগী মোতোওয়াল্লি হিসেবে মামুনুর রশিদকে নিয়োজিত করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই ডিসেম্বর মামুনুর রশিদ কৌশলে মাজারে প্রধান খাদিম হয়ে যান। আর এরপর থেকে অবাধে লুটপাট চালান মাজার এলাকায়। তিনি এখন শত হাজার কোটি টাকার মালিক। সিলেট শহরতলির খাদিমপাড়া ইউনিয়নে রয়েছে তার প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পত্তি। নোয়াগাঁও দেওয়ানের চক

এলাকায় আছে প্রায় ৩’শ একর জমি। সিলেট ও মৌলভীবাজার শহরে তার মালিকানাধীন দুটি ক্লিনিক রয়েছে ।

সিলেট শহরের সেন্ট্রাল ক্লিনিকের সত্বাধিকাত্মী মামুনুর রশীদ। নগরীর শোকরিয়া মার্কেট, আলহামরা মার্কেট, করিম উল্লাহ মার্কেট, ব্লু-ওয়াটার মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটে রয়েছে তার দোকান। সিলেট নগরীর উপশহরের বি ব্লকে রয়েছে তার একটি বাড়ি। এছাড়া বৃটেনের ওল্ড টাউন সিটিতে সম্প্রতি তিনি একটি বাড়ি করেছেন। এ বাড়ির মূল্য বাংলাদেশী টাকায় কয়েক শ’ কোটি টাকা। ঢাকার উত্তরায় তার একটি ফ্ল্যাট বাড়ি রয়েছে। শেয়ার বাজারে কোটি কোটি টাকা খাটাচ্ছেন। ব্যাংক অব শীলন সিলেট দরগাহ গেইট শাখার টাকা লুটপাটের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে আরো ৪ টি মামলা হয়েছে।

এর মধ্যে মাজারের টাকা শীলন ব্যাংকে নিয়ে লোপাটের ঘটনায় দুদোকের দায়েরকৃত মামলা রয়েছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে আছে চাঁদাবাজি, জালিয়াতি, ভূমি দখলসহ আরও কয়েকটি মামলা।এ ব্যাপারে শাহপরান মাজার স্বার্থ ও সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক ও বাজার কমিটির সভাপতি হাজী মোঃ. ফজল মিয়া বলেন, মামুনুর রশিদ মাজারকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছেন।

তার বিরুদ্ধে এখন এলাকাবাসী সোচ্চার। তিনি বলেন, অলি-আউলিয়ার মাজার নিয়ে কোন দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, তারা মাজারের রক্ষক নয় ভক্ষক। যদি রক্ষক হতো তাহলে তাদের নামে কোন সম্পত্তি হতো না।তবে কাগজে-কলমে তার বিরদ্ধে সব অভিযোগের সত্যতা মিললেও বরাবরই মামুনুর রশিদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি এসব অভিযোগের জবাব দিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন দপ্তরে। ওই দপ্তরগুলোতে অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী। মামুনুর রশিদের ভাতিজা ও সিলেট নগরীর ১৯ নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার কামাল আহমদ বিগত সরকারের সময় একজন প্রভাবশালী হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন।

মাজার ব্যবসা করে ঢাকায় একটি হোটেল করেছেন। উত্তর কমলাপুরে রয়েছে হযরত শাহপরান আবাসিক হোটেল। এই হোটেলের মালিক তিনি। শহরের মীরাবাজার এলাকায় আলিশান বাড়ি । খাদিমপাড়া এলাকায় রয়েছে তার আরেকটি বাড়ি। বিভিন্ন হাউজিং ব্যবসার সঙ্গে তিনি জড়িত ্রশহরতলির খাদিমপাড়া ও শাহপরান এলাকায় সুদ ব্যবসায় রয়েছে তার হাত রয়েছে এ অভিযোগ এলাকাবাসীর। মাজারের টাকা লুটপাটে মামুনুর রশিদের ডান হাত হিসেবে পরিচিত কামাল আহমদ।

মামুনুর রশিদের ভাই আমিনুর রশিদ বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। প্রায় ২৫ বছর আগে আমেরিকা যান তিনি। এর আগে মাজারের গদিতে বসে টাকা-পয়সা তুলতেন। মাজারের টাকা লুটপাট করে এক সময় আমেরিকায় পাড়ি জমান। সেখানে রয়েছে তার মালিকাধীন দু’টি রেস্টুরেন্ট। খাদিমপাড়া এলাকায় একটি সুরম্য বাড়ি নির্মাণ করেছেন আমিনুর রশীদ। এছাড়া, ওই এলাকায় বিশাল সম্পত্তির মালিক তিনি।

মামুনুর রশিদের চাচাতো ভাই আজিজুর রহমান কুনু মাজারের খাদিম। তিনি কয়েক কোটি টাকার মালিক। কুনু সিলেট শহরতলির কালাগুল এলাকায় প্রায় ৭০ একর জায়গা কিনেছেন। শ্বশুরবাড়িতে সম্পত্তি কিনেছেন। নগরীর টিলাগড় এলাকায় তার মালিকানাধীন একটি ব্রিকফিল্ড রয়েছে। খাদিম-পাড়ায় রয়েছে একটি বাড়ি। মাজারের টাকা আত্মসাৎ করে বড় ভাই লাল মিয়াকে লন্ডনে পাঠিয়েছেন কুনু। মামুনুর রশিদের চাচাতো ভাই ছাদিকুর রহমান ও কবির আহমদ দু’জনই কোটি কোটি টাকার মালিক।

তাদের নামে আলাদা আলাদাভাবে বাড়ি গাড়ি রয়েছে। কবির লন্ডনে একটি বাড়ি করেছেন। সুবহানি ঘাট এলাকায় ছাদিকের মোটর পার্টসের একটি ব্যবসা রয়েছে। ছাদিক মাজারের টাকা লুটপাটের মাধ্যমে বেলাল ও জালাল নামের তার দু’ভাইকে লন্ডনে পাঠিয়েছেন। কবিরের অনেক জমি আছে খাদিমপাড়া এলাকায়। ফিরোজ মিয়ার শাহপরান এলাকায় একটি মার্কেট রয়েছে।

এই মার্কেটের নাম শাহপরান মার্কেট। তিনতলার ওই মার্কেটে একটি বোর্ডিং রয়েছে। শাহপরান মাজার এলাকায় তার খাদিম অ্যান্ড সন্স নামের একটি দোকান রয়েছে। মাজারে যে সমস- গোলাপ জল, ছান্দুয়া, আগরবাতি, কুরআন শরীফ যায় সেগুলো আবার এনে ওই দোকানে বিক্রি করা হয়। এক জিনিস কয়েকবার বিক্রি হয় এই দোকানে। মাজারের টাকা লুটপাট করে শাহপরান খাদিমপাড়া এলাকায় প্রায় ৩০ একর জমির মালিক হয়েছেন ফিরোজ মিয়া। ফজলুর রহমান, ময়না মিয়া, ফরিদ গাজী, অরিদ মিয়া, তৌহিদ মিয়া, ফারুক মিয়া, কাবুল মিয়া, ইরন মিয়া, হাফিজ আব্দুর নুর, রঞ্জু মিয়া, আলি আহমদ, আবদুল আহাদ, আব্দুল আজিজও কোটি টাকার মালিক। তারা সবাই মাজারের খাদেম হওয়ার সুবাদে অবাধে টাকা লুটপাট করেছেন।ওই মাজার সিন্ডিকেটের ২৯ জনের বিরুদ্ধে ২০০৯ ইং সালের ১২ই জুলাই ওয়াকফ এস্টেট এলাকার কয়েক হাজার মানুষ অভিযোগ করেন।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ২০ বার তদন্ত – হয়েছে।মাজারে নজরানার কোটি কোটি টাকা আৎসাত ও নানান অনিয়মের বিরুদ্ধে ওয়াকফ প্রসাশনের তদন্ত কারী কর্মকর্তারা মোতাওয়াল্লী ও মাজার কমিটির বিরুদ্ধে ২০ বার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

সব প্রতিবেদনেই দোষী সাব্যস্ত ও কমিটি অবৈধ ঘোষনা করা হয়। তদন্ত – প্রতিবেদন ওয়াকফ এস্টেটে যাওয়ার পর শুনানি হয়েছে। এর পেক্ষিতে মিস কেইস ৫/২০০৯ ইং মামলা চালু হয় এলাকার বদরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিসহ বিভিন্ন ব্যক্তি সাক্ষী হিসেবে গোটা এলাকার মানুষের পক্ষে শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন বিভিন্ন প্রমানাদি সহ কাগজপত্র মামলায় দাখিল করেন কিন্তু দীর্ঘ শুনানির পর গত ২৩/১২/২০১৩ ইং ওয়াকফ প্রশাসন থেকে মামুনুর রশীদকে বহাল রেখে কমিটি গঠনের দিকনির্দেশনা সম্বলিত মনগড়া আদেশ হলে উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর পক্ষে মোঃ বদরুল ইসলাম উচ্চ আদালতে মোতাওয়াল্লী অপসারন ও অবৈধ কমিটির বিরুদ্ধে একটি রিট করেন। বর্তমানে রীট মামলা বিচারাধীন আছে। বদরুল ইসলাম সুরমা টাইমসকে বলেন, আমরা চাই মাজার রক্ষা করতে। এই মাজারে এলাকাবাসীর জায়গা রয়েছে। এলাকার লোকজন মাজারের স্বার্থ সংরক্ষণে ত্যাগ স্বীকার করে কোটি টাকার সম্পত্তি মাজারের নামে দিয়েছেন। কিন্তু’ মামুনুর রশিদের গোষ্ঠী তা দখল করে অবাধে লুটপাট করছে।…চলবে ।

Sharing is caring!

Loading...
Open