‘কামাল বাজার’ এক আদর্শিক নিদর্শন

আমার আইটি বিশেষজ্ঞ বন্ধু জার্মানির বার্লিন থেকে বাংলাদেশে গিয়েছে বেড়াতে প্রায় আট বছর পর। স্বাভাবিকভাবে তাকে বলি সময় সুযোগ হলে কামাল বাজার যেতে। তারপর যথারিতী অনুযায়ী প্রায় চার সাপ্তাহ পর বার্লিন থেকে আমাকে ফোন দেয়। অভারল বাংলাদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে ‘কামাল বাজারের’ প্রশংসার জড়ী নেই। কথাবার্তার অধিকাংশ সময়টা ব্যায় করেছে কামাল বাজার নিয়ে। তার প্রংশসা শুনে ত আমি মুগ্ধ সবকিছুর পর এটা আমার শিকর। অন্যের মুখে নিজ এলাকার ভুলি, খুবই ভাল লেগেছে।

তার অভিব্যক্তি এরকম ছিল, বৃহত্তর সিলেটে যদি কোন অদর্শ, সুন্দর , পরিপাটি এলাকা থাকে তবে তা কামাল বাজার। অনেক এলাকাতে গিয়েছি এমনকি শহরে থেকেও এরকম নিরিবিলি পরিবেশ কোথায় পাইনি যা আমি কামাল বাজারে প্রত্যাক্ষ করেছি। লিডিং ইউনিভার্সিটির দিকে অগ্রহসর হই আমি ত অবাক ‘এ কোথায় এলাম’ এ যেন শহরের বাইরে আরেক ‘মিনি সিটি’।সে আর বলে, এটা শুধু আমার একার অভিজ্ঞতা নয় অনেকে বলে কোন প্রত্যান্ত এলাকাতে শহরের স্বাদ পাওয়া যায় কামাল বাজারে যা আমাকে বিমোহিত করেছে। যাইহোক, এটা আমার বাল্যবন্ধুর আবিষ্কার, আমার কথা নয়। তবে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, কামাল বাজার সম্পর্কে আমি কী জানি? কামাল বাজার এত আধুনিক এবং আকর্ষণীয় হয়ে উঠার রহস্য কী?

আমার খুবই পরিচিত ব্যাবসায়ী,লেখক এবং সাংবাদিক বড় ভাই থাকেন ইংল্যান্ডের লীডস শহরে। উনার সাথে যখন আড্ডায় বসি পাওয়া যায় অনেক অজানা তত্ত্ব। কথা বলার ফাঁকে উনি বার বার বলেন আমি যখন দেশে যাই তখন একবার হলেও পরিবার পরিজন নিয়ে কামাল বাজার ঘুরে আসি বিশেষ করে তোমাদের ঐ দিকে। প্রতিউত্তরে আমি বলি, কি ভাই এটা কী আমাকে খুশি করার জন্য? তিনি বলেন, না, তুমি হয়ত জান না কামাল বাজার এলাকাকে মানুষজন আদর্শ হিসাবে বিবেচনা করে। আর বেড়ানোর জন্য একটা মনোরম পরিবেশ বলা যেতে পারে। এটা যদি সত্যি হয় তাহলে ত কামাল বাজার এলাকার বাসীন্দা হিসাবে মন ভাল হওয়ার মত খবর।

কামাল বাজার, সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা এবং বিশ্বনাথ থানার অন্তরগত একটি বৃহত্তর ঐতিহ্যবাহী এলাকা। শহর থেকে প্রায় চার অথবা পাঁচ কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থান প্রবাসী অধ্যুষিত এই এলাকাটি যার অধিকাংশ প্রবাসী স্ব-গৌরবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করছেন। কামাল বাজারে জন্মগ্রহন করেছেন ড. দানবীর রাগীব আলী যদিও যার নাম শুনলে কালো টাকার মালিকদের গা জ্বলে।এ এলাকাতে ছিলেন সময়ের সাহসী বীর মুক্তিযুদ্ধা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ বীরপুরূষ। আছেন শিক্ষাবীদ, ডক্টর, ইন্জিনিয়ার, প্রভাবশালী রাজনীতিবীদ, ব্যাবসায়ী এবং আইনজীবী। আবার অনেকে চেষ্টা করে যাচ্ছেন কীভাবে এলাকার অমূল পরিবর্তন আনা যায় যা এলাকাবাসীর জন্য খুবই সুখকর। আধুনিক কামাল বাজারকে ব্যাপকভাবে পরিচিতি দিতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন নিংস্বার্থভাবে যা এলাকাবাসীকে সত্যি অনুপ্রাণিত করে। এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে সবাই ঐক্যেবধ্য , এধরণের নজীর আজকাল পাওয়া খুবই দুরুহ ব্যাপার।

কামাল বাজারে এখন অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যা আমাদেরকে আর উম্মুক্ত করেছে জ্ঞানের দুয়ার। ইদানীং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটি স্হায়ী ক্যাম্পাস নিয়ে এসেছে কামাল বাজারে। আছে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, কেজি স্কুল, চিকিৎসালয় ব্যাংক-বীমা, এনজিও, এতিমখানা এবং সরকারী ও বেসরকারী অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। আমার বন্ধু ত বলে বসে যদি রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজে এর একাংশ তোদের এলাকাতে চলে আসে তাহলে ত কামাল বাজার’ গ্লোবাল ভিলেজে’ পরিণত হবে। আমিও আশাবাদী হয়তবা হবে। যদি কোন সময় জনাব রাগীব আলীর সাথে সাক্ষাত হয় তাহলে এ দাবি তুলে ধরব। এটা এলাকার সাধারণ মানুষের চাওয়া। জন্মভুমিতে যদি এরকম একটি উদ্যোগ নেন তাহলে এলাকার পরিবর্তন সন্নিকটে।

রাগীব আলীর অনেকগুলো অবদানের মধ্য বাসীয়া নদীর উপর নির্মিত ব্রিজটি আমাদের অতীত মনে করিয়ে দেয়। রাগীব আলী বাসীয়া নদীর উপর সেতু নির্মাণ করে যে বন্ধন তৈরি করেছেন এলাকাবাসী সারা জীবন মনে রাখবে। যদিত্ত এখন দাবি উঠেছে সেতুটি যদি সংস্কার বা একটু বড় আকারে বৃদ্ধি করা যায় তাহলে চলাচলের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা লাগব হবে। আর এ কাজটি তিনি যদি করে ফেলেন তাহলে ইতিহাস রচিত হবে বলার অপেক্ষা রাখে না। রাগীব আলী আমাদের এলাকার উন্নয়নে অনেক দিয়েছেন, অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। এ সংযোজনটি হতে পারে মানুষের ভালবাসার আরেকটি নতুন অধ্যায়।

রাগীব আলী নিত্য নতুন আবিষ্কারের নেশায় উত্তাল এক নাম। তাকে সফল গবেষক বলা যেতে পারে। তার অনেকগুলো আধুনিক চিন্তা ভাবনা রয়েছে নিজ এলাকাকে নিয়ে, কিন্তু তিনি কী সব পূর্ণ করেছে? না, পারেন নি! আর পারবেন ও না, যদি ভুল মানুষগুলোকে ত্যাগ না করেন।কারণ কিছু সংখ্যক সুবিধাবাদীরা তাকে ভুল পথে পরিচালিত করেছেন যার ফলস্বরূপ তাকে অনেক বাধা পোহাতে হয়েছে। তিনি যখনই ভাল উদ্যোগ নেন, বাধা আসে। ধাপে ধাপে বাধা কীসের লক্ষণ? তার সু-সময়ের সুবিধাবাদীরা নানান কৌশল অবলম্বন করে সাময়িক সুবিধা নেওয়ার জন্য এলাকার মানুষের সাথে একটা দুরত্ব তৈরি করে রেখেছে। অথচ যারা তার দুর্দিনে অর্থাৎ বিপদে রাস্তায় নেমেছিল তাদেরকে কী তিনি মূল্যায়ন করেছেন? না কী নিয়মিত খোঁজখবর নেন? তারপরও এলাকাবাসী তাকে মনে প্রাণে ভালবাসে। আমি বিশ্বাস করি রাগীব আলী তার গুণের পরিচয় দিবেন এই পড়ন্ত বয়েসে। উনার অধরা স্বপ্ন প্রতিষ্ঠা লাভ করবে ঐতিহাসিকভাবে। রচিত হবে আরেক ইতিহাস।

আমার শৈশব কিশোর কামাল বাজারে। এখানে আমার বেড়ে উঠা। এক দশক পৃর্বে আমি কী দেখেছি, আর, আজ কী দেখছি। অনেক পরিবর্তন ঘটেছে কামাল বাজারে। আসলে কামাল বাজারকে নিয়ে গর্ব করার মত। কী নেই আমাদের? একটু চোখ বুঝে চিন্তা করেন তাফাটা পেয়ে যাবেন নিমিষে। প্রভাবশালী রাজনীতিবীদ থেকে শুরু করে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি সব জায়গাতে এ এলাকার সন্তানরা কৃতত্বের সাথে বিচরণ করছে। কিছুদিন আগে বৃটেনের ইর্কশায়ারে আমার পাশের গ্রামের জৈনক ব্যাক্তি সাথে পরিচয় যে সবে ডক্টরেট ডিগ্রি শেষ করছে। এটা সত্যি মন ভাল করার গল্প। কিন্তু বাইরের কেউ যদি এলাকাকে আদর্শিক ভাবে তাহলে অনুভূতিটাই ভিন্ন।

আদর্শগত দিক দিয়ে চিন্তা করলে কামাল বাজারকে বলা যায় এক অন্যন্য নির্দশক। যদিত্ত স্হানীয় কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তারপরও এলাকার ঐক্যের স্বার্থে সবাই এক এবং একাকার। আমার দূড় বিশ্বাস আগামী প্রজন্ম এই অদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ গঠনে এগিয়ে আসবে। আজকের কৃর্তকর্ম বা উন্নয়নমূলক কাজগুলো সাক্ষী হয়ে থাকবে যুগ যুগ ধরে। আমি আশাবাদী মানুষ, কামাল বাজার শুধু মাত্র বাংলাদেশ নয়, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্লোবাল ভিলেজ হিসেবে পরিচিতি পাবে এই প্রত্যাশা রইল।

মোঃ হাফিজুর রাহমান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অনলাইন এক্টিভিষ্ট

Sharing is caring!

Loading...
Open