৩ মাসে ২৮,০০০ কোটি টাকা ঋণ সরকারের

সঞ্চয়পত্র বিক্রি ব্যাপক হারে কমে যাওয়া ও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সন্তোষজনক না হওয়াসহ নানা কারণে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার হার বেড়েই চলেছে। ফলে পুরো অর্থবছরের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে যে পরিমাণ ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে তার ৬১ শতাংশই অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে নিয়ে ফেলেছে সরকার। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। কিন্তু জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ মাসেই এ খাত থেকে ২৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, আর্থিক খাতে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহে উল্টো গতি বিরাজ করছে। অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেশি হারে বাড়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। বরং গত বছরের তুলনায় কমেছে।
অর্থাৎ বেসরকারি খাতের চেয়ে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেশি মাত্রায় বেড়েছে। এতে বেসরকারি খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, মূলত রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়ায় এবং সঞ্চয়পত্র থেকে গ্রাহক মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় বিক্রি ব্যাপক হারে কমে গেছে। ফলে, অনেকটা বাধ্য হয়েই এখন ব্যাংকিংখাত থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। ব্যাংকিংখাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়া বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে দেশে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ২.০৩ শতাংশ। গত অর্থবছরে একই সময়ে বেড়েছিল ০.৯৫ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ঋণপ্রবাহ বাড়লেও এর বড় অংশই যাচ্ছে সরকারি খাতে। গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ৭.১৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ২২.১৬ শতাংশ। অন্যদিকে, গত বছরের জুলাই-আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ০.২৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ঋণপ্রবাহ তো বাড়েইনি, বরং গত অর্থবছরের ওই সময়ের তুলনায় কমেছে ০.২৮ শতাংশ।

সূত্র জানায়, রাজস্ব আদায় বাড়লে সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার তেমন প্রয়োজন পড়ত না। বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা যেতো। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই-আগস্ট মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার ৯৩৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৬২০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এই দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অন্য দিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩.৩৫ শতাংশ। কিন্তু বাজেটে এই রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ধরা রয়েছে ১৬.শতাংশ। সঞ্চয়পত্র বিক্রি কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে অত্যাধিক কড়াকড়ি আরোপ এবং কর বৃদ্ধির কারণে সঞ্চয়পত্র থেকে গ্রাহকরা অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এ জন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রিও কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে; যা গত বছরের একই সময়ের ৩ ভাগের ১ ভাগ। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে ১১ হাজার ৩০৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৭ হাজার ৬৪৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ হিসাবে এই ২ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

অর্থনীতিবিদরা জানান, বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকার মূলত দুইভাবে ঋণ নিয়ে থাকে। একটি হচ্ছে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এবং অন্যটি হচ্ছে, সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে। যেহেতু সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকেই বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। যদি রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব না হয়। তবে বছর শেষে বাজেটে প্রক্ষেপিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ঋণ সরকারকে ব্যাংক থেকে নিতে হবে।

ব্যাংকিংখাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকিংখাত থেকে ঋণ নিয়েছে ৩০ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এর পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেছে ১৮ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে যে উদ্বৃত্ত তারল্য দেখানো হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তিনি বলেন, কিছু কিছু ব্যাংকের বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাছে বাড়তি তহবিল রয়েছে। কিন্তু ওই সব ব্যাংক ইচ্ছা করলেই অতিরিক্ত ঋণ দিতে পারে না। তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবেই খারাপ অবস্থানে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ঋণ আদায় বাড়ছে না। বর্তমান অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে এর ভবিষ্যৎ কী- এমন এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই গভর্নর জানান, এর ভবিষ্যৎ মোটেও সুখকর নয়। ব্যাংকিং খাতের সমস্যার অর্থ হলো, এটি পুরো অর্থনীতির জন্য সমস্যা হয়ে দেখা দেবে। এতে যে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা কাগজে-কলমে অর্জন হবে, বাস্তবে অর্জন হবে না।

Sharing is caring!

Loading...
Open