যেভাবে কোটিপতি বিশ্বনাথের ‘পলিথিন তবারক’

আক্তার আহমদ শাহেদ, বিশ্বনাথ (সিলেট) থেকেঃ এক যুগ আগেও তিনি ফেরি করে পলিথিন বিক্রি করতেন। মাঝে কিছু দিন বিক্রি করেছেন ঝালমুড়ি। কিন্তু এসবে যে আয় তাতে চলছিল না দিন। সব ছেড়ে দিয়ে মাইক্রোবাসে হেলপারির চাকরি নেন। নাম তার তবারক। দীর্ঘ সময় দোকানে দোকানে পলিথিন বিক্রি করায় ‘পলিথিন তবারক’ হিসেবে পরিচিত পান গোটা বিশ্বনাথে। কিন্তু এক যুগ পর এসে সেই তবারক এখন কোটিপতি। দানবীর।
সর্বত্র প্রশ্ন কি করে সম্ভব এমনটা। কি এমন আলাদীনের চেরাগ পেয়েছেন তিনি? সবই খোলাসা হয়ে যায় সবার কাছে। মাদক কারবারিই বদলে দিয়েছে তার জীবন।

উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের পাঠাকইন গ্রামের মৃত আলকাছ আলীর ছেলে তবারক আলী। পলিথিন বিক্রি ছেড়ে উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের আজাদ তার মাইক্রোবাসের সাহায্যকারী হিসেবে রাখেন তবারককে। এরপরই উচ্চাভিলাষী তবারক জড়িয়ে পড়েন গাড়ি চুরি ও ছিনতাইয়ে। চুরি-ছিনতাই মামলায় একাধিকবার জেলও খাটেন তিনি। জেল থেকে বেরিয়েই ফের অপরাধ জগতে সক্রিয় হন তবারক। এক পর্যায়ে জড়িয়ে পড়েন মাদক ব্যবসায়। মাদকে নাম লিখিয়েই অল্পদিনে ‘মাদক সম্রাট’ বনে যান। নিজের নাম গোপন করে মাদকের জগতে পরিচিত পান ‘ইয়াবা সুমন’ হিসেবে। অপরাধ জগৎ পাল্টে দেয় তবারকের জীবনযাত্রা। এক সময়ের ‘চোর’ তবারক হয়ে যান কোটিপতি ‘দানবীর তবারক’। বর্তমানে সে ও তার স্ত্রী সাবিনা বেগম ও স্বজনদের নামে বিপুল অঙ্কের ব্যাংক সঞ্চয় রয়েছে বলে জানা গেছে। রয়েছে তার মালিকানায় ৪টি মাইক্রোবাস, ৩টি এলিয়ন কার, ১০-১২ সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ১টি ট্রাক। নিজ গ্রামে কিনেছেন ১৫০০ শতক ধানি জমি। ৩৮ ডিসিমিল জায়গার ওপর করেছেন ডুপলেক্স দ্বিতল ভবন। এ ছাড়াও বিশ্বনাথ সদরে কাজ চলমান রয়েছে ১৫ ডিসিমিল জায়গা নিয়ে তার হাউজিং বিল্ডিংয়ের। সদরের অভিজাত শপিংমলে মালিকানা রয়েছে ২-৩টি দোকান ঘরের।

পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ২৪শে নভেম্বর তবারককে একটি চুরির মামলায় দুইদিনের রিমান্ডে আনে পুলিশ। পরের দিন ২৫শে নভেম্বর থানা হাজত থেকে পালিয়ে যায় ধূর্ত তবারক। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় অভিযান চালিয়ে তাকে ফের পাকড়াও করতে সক্ষম হয় পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বিশ্বনাথ ও সিলেটের বিভিন্ন থানায় একাধিক ছিনতাই ও মাদক মামলা রয়েছে। তার মধ্যে বিশ্বনাথ থানায় এফ আই আর নং ২, তারিখ ১লা এপ্রিল ২০১০। বিশ্বনাথ থানায় এফ আই আর নং ২৩, তারিখ ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১০। বিশ্বনাথ থানায় এফ আই আর নং ১৯, তারিখ ২৫শে আগস্ট ২০১১। বিশ্বনাথ থানায় এফ আই আর নং ২৫, তারিখ ২৫শে নভেম্বর ২০১১। বিশ্বনাথ থানায় এফ আই আর নং ৩, তারিখ ৩রা নভেম্বর ২০১২। বিশ্বনাথ থানায় জিডি নং ৫৮, তারিখ ২রা ডিসেম্বর ২০১৪। বিশ্বনাথ থানার এফ আই আর নং ১৩, তারিখ ১৮ই ফেব্রুয়ারি ২০১৫। বিশ্বনাথ থানায় জিডি নং ৯৯৫ তারিখ ২৮শে সেপ্টেম্বর ২০১৫। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থানার এফ আই আর নং ৭, তারিখ ১০ ডিসেম্বর ২০১৪। এদিকে চলতি বছরের ২৬শে আগস্ট দুপুরে বিশ্বনাথ-লামাকাজী সড়কের আধা কেজি গাঁজাসহ তবারক আলীর স্ত্রী সাবিনা বেগমের মালিকানাধীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা (সুনামগঞ্জ-থ ১১-২০৬৭) জব্দের ঘটনায় মাদকদ্রব্য আইনে মামলা করে পুলিশ। এ ঘটনায় তবারক আলীসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা (মামলা নং ২৪) দেয়া হয়।

বর্তমানে তবারক তার অপকর্ম ঢাকতে এলাকায় গঠন করেছে নিজস্ব বাহিনী। তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই হামলা-নির্যাতন চালায় এ বাহিনী। সম্প্রতি এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দেয়। এতে স্বাক্ষর করায় গত ১৭ই অক্টোবর চুনু মিয়া নামের একজনকে ছুরিকাঘাতে আহত করে তবারক বাহিনী। এ ঘটনায় তবারক গংদের বিরুদ্ধে মামলা (মামলা নং-১২, তাং ১৮.১০.২০১৯) দিয়েছেন চুনু মিয়া।
তবারক বাহিনীর হামলার শিকার চুনু মিয়া বলেন, পলিথিন ও চানাচুর বিক্রেতা চোর তবারক আলী এখন মাদক সম্রাট। এখন সে অঢেল সম্পদের মালিক। মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্মারকলিপি দেয়ায় তার বাহিনী হামলার শিকার হয়েছি আমি।

এ নিয়ে কথা বলতে তবারকের একাধিক মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে কথা হলে বিশ্বনাথ পুলিশ স্টেশনের অফিসার ইনচার্জ শামীম মুসা বলেন, তবারকের বিরুদ্ধে ৫-৬টি মামলা রয়েছে। কিছু মামলা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেলেও অন্যান্য মামলায় সে জামিনে আছে। বর্তমানে সে পলাতক রয়েছে। (মানবজমিন)

Sharing is caring!

Loading...
Open