বিশ্বনাথে মসজিদের নামফলক নিয়ে উত্তেজনা, সংঘর্ষের আশংকা

সিলেটের বিশ্বনাথে একটি পাঞ্জেগানা মসজিদে নামফলক লাগানো নিয়ে গত এক মাস ধরে দু’পক্ষে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের ‘পাটাকইন পাঁচঘরী বায়তুল মামুর জামে মসজিদে’র প্রবেশদ্বারে পাঁচঘরীর সিরাজ মিয়া পরিবারের নামে নামফলক লাগানোর কারণে এ উত্তেজনা বিরাজ করছে। দু’পক্ষের এক পক্ষে নেতৃত্বে রয়েছেন পাটাকইন গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী তবারক আলী আর অপর পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পাঁচঘরী গ্রামের বাসিন্দা তার বন্ধু সিরাজ মিয়া।

সরেজমিন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, প্রায় দু’মাস আগে ‘পাটাকইন পাঁচঘরী বায়তুল মামুর জামে মসজিদের প্রবেশ পথে ‘প্রথম ও ২য় তলার’ উপরে নামফলক দেন সিরাজ মিয়া। এতে লিখা রয়েছে ‘‘মসজিদ নির্মাণ দাতা, মরহুম আলহাজ্ব মনোহর আলী ও মরহুমা ছফিনা বিবির রুহের মাগফিরাত কামনায় জনাব আলহাজ্ব মো. তেরা মিয়া এবং আব্দুল মুমিন লিপন’’। এই নামফলক লাগানো নিয়ে তবারক আলীসহ পঞ্চায়েত পক্ষের কয়েকজন দ্বিমত পোষণ করেন। এতে তাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরায় দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন তবারক আলী ও সিরাজ মিয়া। আর তাদের পক্ষ নিয়ে এলাকাবাসীর অনেকেই ওই দু’জনের পক্ষে অবস্থান নেন।

এনিয়ে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঘায়েল করতে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর পাল্টাপাল্টি স্মারকলিপিও দিয়েছেন। বিরোধটি মসজিদের নামফলক নিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে আশুগঞ্জ এলাকায় তবারক আলী ও সিরাজ মিয়ার মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলছে। এতে দু’জনের পক্ষ নিয়ে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন আশুগঞ্জ এলাকার অনেকেই।

গত ১৭ অক্টোবর আশুগঞ্জ বাজারে মনোহরপুর গ্রাম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে তবারকের পার্শ্ববর্তী বাড়ির তার আরেক ঘনিষ্ঠজন প্রতিপক্ষ সিরাজ মিয়া পক্ষের চুনু মিয়া হামলার শিকার হন। ওইদিনই চুনু মিয়া তবারক আলীকে প্রধান আসামি করে ৮ জনকে অভিযুক্ত করে থানায় একটি মামালা দায়ের করেন। পরে তবারককে প্রধান আসামি করায় তার পক্ষেও পাল্টা আরেকটি এজাহার দায়ের করা হয়।

এদিকে গত ৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার তবারক আলীকে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা ও অপপ্রচার থেকে অব্যাহতি চেয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন পাটাকইন, পাঁচঘরী, মনোহরপুর, শ্রীপুর, আজিজনগর, দোহাল, বিলপার, বাবুনগর, রামপাশা ও পালেরচক গ্রামের ১৮৪ জন বাসিন্দা। স্মারকলিপিতে তারা উল্লেখ করেছেন গত ১৫ জুলাই আশুগঞ্জ আদর্শ হাইস্কুল এন্ড কলেজ গভর্নিং বডির নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। আর ওই নির্বাচনে দাতা সদস্য প্রার্থী তবারক আলীর পুরো প্যানেল বিজয়ী হয়। এতে তবারক আলী ভোটে সমান সমান হলেও প্যানেলের কারণে তিনিও ওই পদে বিজয়ী হন। ফলে ওই নির্বাচনের প্রতিপক্ষের লোকজন বিশ্বনাথের আল-হেরা শপিং সিটির ব্যবসায়ী তবারক আলীকে হয়রানি ও হেয় প্রতিপন্ন করতে মিথ্যা মামলা ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে গত ১৬ অক্টোবর বুধবার তবারক আলীর বিরুদ্ধে সিলেটের পুলিশ সুপার বরাবরে এলাকার ৫০ জনের সাক্ষরে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এতে তবারক আলীকে ইয়াবা সুমন দাবি করে ‘চিহ্নিত অপরাধী, ছিনতাইকারী, ডাকাত সর্দার’ আখ্যায়িত করা হয়েছে। সেই সাথে তবারক আলীর পক্ষে জেলা প্রশাসক বরাবরে দেওয়া আগের স্মারকলিপি যারা দিয়েছেন তাদেরকে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দাবি করা হয়েছে এবং সেটি মিথ্যাও বলা হয়েছে।

সালিশ ব্যক্তিত্ব স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল আহমদ, চকরামপ্রসাদ গ্রামের ইউপি সদস্য নাসির উদ্দিন, রামচন্দ্রপুরের আব্দুল হামিদ, মনোহরপুরের নাসির উদ্দিন এ প্রতিবেদককে বলেন, হাইস্কুলের নির্বাচন ও মসজিদের নামফলক নিয়ে বিরোধ সৃষ্টির পর মারামারির ঘটনাও ঘটেছে এবং এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোন সময় বড় ধরনের সংঘাত সংঘর্ষের আশংকাও রয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে যাতে আগামীতে আর কোন সংঘাত সংঘর্ষ না ঘটে সে-জন্য তারা প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

এ প্রসঙ্গে তবারক আলী নিজেকে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী দাবি করে বলেন, সিরাজ মিয়া ও চুনু মিয়া তার এক সময়ের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। আশুগঞ্জ হাইস্কুল এন্ড কলেজে নির্বাচনের সময় অন্য পক্ষে অবস্থান করা আর মসজিদে সিরাজ মিয়া পরিবারের লোকজনের নামে নামফলক দেওয়ার পর পঞ্চায়েত পক্ষে কথা বলায় তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। তার দাবি, মসজিদের উন্নয়নে নিজের আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি এলাকার প্রবাসীদের নিকট থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে মসজিদে প্রায় ১০/১২ লাখ টাকার টাইলসসহ উন্নয়ন কাজ করেছেন। সিরাজ মিয়ার ভাই তেরা মিয়াও একইভাবে মসজিদের উন্নয়নে কাজ করেছেন। কিন্তু প্রবাসীসহ পঞ্চায়েত পক্ষের কেউ নামফলক না দিলেও সিরাজ মিয়া মসজিদের প্রবেশ দ্বারে নামফলক লাগিয়েছেন। আর ওই বিষয়টি নিয়ে তিনি পঞ্চায়েত পক্ষে কথা বলায় তার বিরুদ্ধে সিরাজ মিয়াসহ একটি চক্র নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। এলাকায় না থাকলেও যেকোনো ঘটনায় তাকে হয়রানি করতে অভিযুক্ত করা হয় বলেও মন্তব্য করেন তবারক।

এব্যাপারে জানতে চাইলে সিরাজ মিয়া নিজেকে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী দাবি করে এ প্রতিবেদককে বলেন, পঞ্চায়েত পক্ষের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষরের মাধ্যমে অনুমতি নিয়েই মসজিদে পরিবারের সদস্যদের নামে নামফলক লাগিয়েছেন। তার দাবি, এ বিরোধ মসজিদ নিয়ে নয়, আশুগঞ্জ হাইস্কুল এন্ড কলেজের নির্বাচনে তিনি এবং চুনু মিয়া এক পক্ষে আর তবারক অন্য পক্ষে থাকায় তাদের সম্পর্কের ফাটল ধরেছে।

পাটাকইন গ্রামের সাবেক মোতাওয়াল্লি মসজিদের ভূমিদাতা হাজী আব্দুল লতিফ ও বর্তমান মোতাওয়াল্লি পাঁচঘরী গ্রামের হাজী মনফর আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, বেশ কিছুদিন আগে মসজিদের উন্নয়ন করার পর সিরাজের ভাতিজা প্রবাসী তেরা মিয়ার প্রতিবন্ধী ছেলে আব্দুল মুমিন লিপনের নাম লিখার কথা ছিল। কিন্তু সে সময় কোন নামফলক না দিয়ে সম্প্রতি সিরাজ মিয়া ভাতিজা লিপনের নামসহ পরিবারের কয়েকজনের নাম দিয়ে নামফলক দিয়েছেন। আর এ নিয়ে পঞ্চায়েত পক্ষের অনেকেরই দ্বিমত রয়েছে।

নিজেকে মোতাওয়াল্লি দাবি করে তেরা মিয়ার চাচাতো ভাই আব্দুল গণি ওরফে গণি শাহ্‌ এ প্রতিবেদককে বলেন, তেরা মিয়াই কেবল মসজিদের সকল উন্নয়নকাজ করেছেন। যে কারণে পঞ্চায়েত পক্ষের অনুমতি নিয়েই মসজিদে নামফলক লাগানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে বিশ্বনাথ থানার ওসি শামীম মুসা এ প্রতিবেদককে বলেন, চুনু মিয়ার উপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে যাতে আর সংঘর্ষ না হয় সে জন্য ওই এলাকায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

Sharing is caring!

Loading...
Open