কাউন্সিলর রাজীবকে দুই মামলায় ১৪ দিনের রিমান্ড

মোহাম্মদপুর ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবকে দুই মামলায় ১৪ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

রবিবার রাতে ঢাকা মুখ্য হাকিম আদালত তাকে এই রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেয়। অস্ত্র, মাদকদব্য আইনসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ এনে গতকাল রাতেই ভাটারা থানায় মামলা দুটি করে র‌্যাব। এর আগে অবৈধ অস্ত্র রাখা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে শনিবার রাতে আটক করা হয় রাজীবকে।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাড়ি থেকে আটকের পর তাকে নিয়ে তার মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ের বাসায় তল্লাশি চালায় র‌্যাব।

আদালত সূত্র জানিয়েছে, মাদক ও অস্ত্র মামলায় কাউন্সিলর রাজীবের বিরুদ্ধে ২০ রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত ১৪ দিন মঞ্জুর করে। এদিকে রাজীবকে গতকাল যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের সিদ্ধান্তের আলোকে ‘অসামাজিক ও সংগঠনের শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে জড়িত থাকার’ অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

রাজীব ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। রাজীবকে গ্রেপ্তার অভিযানে অংশ নেওয়া র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম জানান, তার বিরুদ্ধে রবিবার রাতে ভাটারায় থানায় মামলা করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের সময় বসুন্ধরা এলাকার ফ্ল্যাট থেকে একটি পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি ও সাত বোতল মদ উদ্ধার করা হয়।সেই সঙ্গে রাজীবের পাসপোর্ট ও ৩৩ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, বসুন্ধরার ওই ফ্ল্যাটে রাজীব একাই ছিলেন। গোপন সংবাদে আমরা দরজায় নক করলে তিনি খুলে দেন। কোনো ঝামেলা হয়নি। পরে রাজীবকে নিয়ে মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর ভবনে তার বাসায় প্রায় দেড় ঘণ্টা অভিযান চালানো হয়। বাসা থেকে রবিবার ভোররাত ৪টার দিকে রাজীবকে সঙ্গে নিয়ে মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিংয়ে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে যান র‌্যাব সদস্যরা। সেখানে অভিযানের সময় সহযোগিতা না করা এবং আলামত নষ্ট করার অভিযোগে রাজীবের অফিস সহকারী সাদেক আহমেদকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

অভিযান শেষে সারোয়ার আলম বলেন, ‘তার বাসায় তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত যেসব নথিপত্র ছিল, সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। পরে তার এক আত্মীয়র বাসা থেকে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, একটি অ্যাকাউন্টে গত ২৬ আগস্ট ৫ কোটি টাকা জমা দিয়েছেন রাজীব। ওই টাকার উৎস খতিয়ে দেখা হবে। ’

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরও বলেন,মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ের যে বাড়িতে রাজীব থাকেন, ওই ডুপ্লেক্স বাড়িটির দাম হবে প্রায় ১০ কোটি টাকা। তার যে আয়, তার সঙ্গে এটা মোটেই সংগতিপূর্ণ নয়। অর্থাৎ অবৈধ আয় দিয়ে তিনি এসব করেছেন। জমি কেনাবেচা করে এমন তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজীবের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। ’

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন,এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে মূলত জমি দখলের কাজ করতেন রাজীব। কোনো ভুক্তভোগী জমি দখলের অভিযোগ নিয়ে আমাদের কাছে এলে আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করব। যে ব্যাংকে রাজীবের ৫ কোটি টাকা জমা দেওয়ার রসিদ পাওয়া গেছে, সেখানে খোঁজ নিয়েও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

র‌্যাব জানায়, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্যেই সিটি করপোরেশন এলাকার কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কাউন্সিলরদের কেউ কেউ সরাসরি ক্যাসিনো কারবারেও জড়িত ছিলেন। কাউন্সিলর রাজীব গত দুই সপ্তাহ আত্মগোপনে ছিলেন। র‌্যাব সদর দপ্তর ও র‌্যাব-২-এর একটি যৌথ দল তার ওপর নজরদারি রাখে। শনিবার রাতে অভিযান শেষে তাকে র‌্যাব-১-এর কার্যালয়ে রাখা হয়।

মোহাম্মদপুরে কাউন্সিলর অফিসে অভিযানের সময় রাজীবের বড় ভাই আখতারুজ্জামান রাসেল সাংবাদিকদের বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। অল্প বয়স থেকে রাজীব রাজনীতিতে জড়িত। এলাকার মানুষ জানে সে কত জনপ্রিয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সে নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। এখন তাকে মিথ্যাভাবে ফাঁসানো হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাজীবের বাবা ও চাচা ভোলা থেকে ঢাকায় এসে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন।

রাজীব নিজেও একটি টং দোকান চালাতেন। সেখান থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া রাজীবের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ, চন্দ্রিমা হাউজিং, সাত মসজিদ হাউজিং, ঢাকা উদ্যানসহ বিভিন্ন এলাকায় দখলবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

সাবেক একজন প্রতিমন্ত্রীকে ‘আব্বা ডেকে’ তার হাত ধরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হওয়া রাজীব ২০১৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাউন্সিলর পদে জয়লাভ করেন। এরপর থেকেই মূলত ভাগ্য আরও খুলে যায় তার।

Sharing is caring!

Loading...
Open