আবরার হত্যার দায় কী আমরা এড়াতে পারি?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সফলের চেয়ে ব্যার্থতা বেশি। দাদাদের মানবিক দিক বিবেচনা করে গ্যাস এবং ফেনী নদী পানি দেওয়ার ওয়াদা করলেন। তফা হিসাবে আমরা কী পেলাম ? হা পেয়েছি, আবরার ফাহাদের লাশ। কী নির্মম নির্যাতন বুয়েটের এই মেধাবী ছাত্রের উপর। শুধু কী তাই, আবরার হত্যা নিয়ে যখন বুয়েট উত্তাল তখন সীমান্তে আর একটি লংকাকান্ড ঘটেছে যা আড়ালে চলে গেছে।

Dhaka Tribune (অক্টোবর ১০, ২০১৯) শিরোনাম করে ‘কুমিল্লা সীমান্তে বিএসএফ’র হাতে ৩ র‌্যাব সদস্যসহ আটক ৫’। আমাদের এলিট সদস্যেদের গণধোলাই দেওয়া হয় ভারতে। এই কী বন্ধুরাষ্ট্রের নমুনা? মানলাম, তারা বীরত্ব প্রদর্শন করতে গিয়ে ভুল করে সীমান্তে ঢুকে পড়ে তার মানে এই নয় যে তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা হবে। এটা নতুন কিছু নয়, তাদের আগ্রাসী মনোভাব সদাসর্বদা। অবাক হই বাংলাদেশ থেকে কোন প্রতিবাদ করা হয় না।

এবার আসা যাক বুয়েটে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় যা দেশবাসী বুয়েট নামে চিনে। বুয়েট এমন একটি বিদ্যাপিঠ যেখানে চান্স পাওয়া মানে ছাত্র জীবনের অর্ধেক স্বপ্ন পুরণ। দেশের প্রায় প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীর মনের বাসনা থাকে বুয়েট এর শিক্ষার্থী হওয়া। অথচ এই বুয়েটকে কলুষিত করেছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। সাম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে গিয়ে ফেনী নদীর পানি বন্টন সহ আর কয়েকটি চুক্তি করেন। এই পানি বন্টনের প্রতিবাদে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার নিজস্ব মতামত প্রকাশ করে যা তার জন্য যমদূত হয়ে জীবনটা কেড়ে নিল। আবরার কী জানত বিরুদ্ধ মত তার জন্য কাল হয়ে দাড়াবে?

আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মানুষের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ (১৯৪৯) এর ১৯ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেকের অধিকার আছে নিজের মতামত এবং অভিব্যক্তি প্রকাশ করার। তাহলে কেন ভিন্ন মত পোষণকারীদের নিপীড়ন নির্যাতন করা হয়?

ছাত্রলীগের নির্যাতনে অতিষ্ঠ প্রায় দেশে সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়। ক্ষমতাসীন দলের লেজুড়বৃত্তি হিসাবে কাজ করছে। যারা কারণে তারা আর বেপরোয়া হয়ে উঠছে। দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের নাজুক অবস্থা। ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য, চাদাবাঁজী, দুর্নীতি, খুন ও ধর্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করছে। ফলে মেধাবীরা থাকেন সর্বদা আতঙ্কে। যার সর্বোশেষ সংযোজন আবরার ফাহাদ হত্যা। আবরারের বাবা কী সুষ্ঠু বিচার পাবেন?

শোভন-রাব্বানীর পতন কিছুটা আশার আলো জাগিয়ে ছিল, হয়তবা, পরিবর্তন আসবে সংগঠনটিতে কিন্তু ছাত্রলীগ তাদের জাতের আবার জানান দিল। কয়লা কষলে যেমন ময়লা যায় না তেমনি ছাত্রলীগের ও কোন পরিবর্তন আসবে না।

আবরার ফাহাদ হত্যার পর নিজের কিছু ‘ঘাটতি’ রয়েছে উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাইলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। তার এই ক্ষমা চাওয়া আমাদের আহত করেছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পিতৃতুল্য’ অবিভাবক। এ রকম ত হওয়ার কথা না। অথচ ছাত্রলীগের বিতর্কীত কর্মকান্ডের জন্য উপাচার্যদের অপমাণিত হতে হচ্ছে। ছাত্রলীগ এত ক্ষমতাধর কীভাবে? ছাত্রলীগকে নিয়ে দেশবাসী আসলে বিব্রত।

ভিন্ন মতামত পোষণের জন্য আবরার ফাহাদকে যে নৃংশস হত্যা করা হয়েছে তা দেশের গন্ডি গড়িয়ে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরব। শুধু তাই নয় মার্মান্তিক হত্যাযজ্ঞের নিন্দার জড় বইছে। জাতিসংঘের এক বিবৃতি ভয়ানক ওই হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেছে- মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। এর চর্চার জন্য কাউকে হয়রানি, নির্যাতন ও হত্যা অগ্রহণযোগ্য।তারা এই জগন্য হত্যা কে ‘ভয়ানক’ বলে উল্লেখ করেছে। বিবিসি বলেছে অনলাইনে সরকারের সমালোচনা করার পর তাকে বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে মারধর করা হয়েছিল।

কাতার ভিত্তিক আলজাজিরা তাদের শিরোনামে বলেছে ‘বাংলাদেশ ছাত্র হত্যা: হাজার হাজার বিক্ষোভকারী বিচারের দাবিতে মিছিল করছে’। আলজাজিরা বলে ফেসবুক পোস্টের জন্য ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা একটি স্নাতক ছাত্রকে হত্যার অভিযোগ প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল এর একটি বক্তব্যে তুলে ধরে এভাবে “ছাত্রলীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাদের প্রশ্নবিদ্ধ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে”।

বৃটেন এবং জার্মান দূতাবাস উদ্বেগ প্রকাশ করে। বৃটেনের দা গার্ডিয়ান শিরোনাম করেছে। বিদেশিদের উদ্বেগ আমাদের জন্য কী সম্মানজনক? এ লজ্জা কার? নাগরিক হিসাবে আমরা কী দ্বায় এড়াতে পারি? রাষ্ট্র কী দায় এড়াতে পারে? প্রশ্ন হলো আবরার কী ন্যায়বিচার পাবে? না কী বিশ্বজিৎ মত সময়ের পরিক্রমায় তা হারিয়ে যাবে? অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে দৃষ্টান্ত স্হাপন করা হোক এটাই প্রত্যাশা।

মোঃ হাফিজুর রাহমান
যুক্তরাজ্য প্রবাসী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অনলাইন এক্টিভিষ্ট

Sharing is caring!

Loading...
Open