সিলেট জেলা বিএনপির কমিটিতে বিতর্কিতরা,তৃণমূলে ক্ষোভ

সম্প্রতি সিলেট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি। ২৫ সদস্যের এই কমিটিতে নানা কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত ও অভিযুক্তদের অনেকে ঠাঁই পেয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে। দীর্ঘদিন থেকে প্রবাসে থাকা নেতারাও রয়েছে আহ্বায়ক কমিটিতে।তবে দলের দুঃসময়ে হাল ধরা অনেক নেতা আহ্বায়ক কমিটিতে ঠাঁই পাননি বলে অভিযোগ। এনিয়ে ক্ষোভ রয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে।

গত ২ অক্টোবর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিলেট জেলা বিএনপির ২৫ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেন। কমিটিতে আহবায়ক করা হয় সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কামরুল হুদা জায়গীরদারকে। এই কমিটি অনুমোদনের পর থেকেই দলের ভিতরে ও বাইরে নানা আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে।

সিলেট বিএনপির অনেক নেতার অভিযোগ, বর্তমান কমিটির অনেক সদস্য দলের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন ও ব্যক্তিগতভাবে নানা অপকর্মে জড়িত।

সিলেটের বিভিন্ন পর্যায়ের বিএনপি নেতাদের সাথে আলাপ করে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। কমিটির ২৫ জনের মধ্যে ১১ জনের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন তারা।

অভিযোগ প্রসঙ্গে নতুন কমিটির আহ্বায়ক কামরুল হুদা জায়গীরদার সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কমিটি কেন্দ্র থেকে দেওয়া হয়েছে। এনিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। তবে বড় দলে টুকটাক কিছু সমস্যা থাকে। আবার কিছু অভিযোগ থাকে মিথ্যা। ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে করা হয়।

তিনি বলেন, আহ্বায়ক কমিটি যতো ছোট হয় ততো ভালো। গতবার তো ৯ সদস্যের ছিলো। এবার ২৫ হয়েছে। এতো ছোট কমিটিতে সবাইকে নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে আমরা তিনমাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করবো। আশা করছি এতে সবাই মূল্যায়িত হবেন।

নতুন আহবায়ক কমিটির সদস্যরা হলেন- আবুল কাহের শামীম, এডভোকেট আব্দুল গফফার, আশিক উদ্দিন চৌধুরী, আলী আহমেদ, কাইয়ুম চৌধুরী, অধ্যাপক সামিয়া চৌধুরী, অ্যাডভোকেট আশিক চৌধুরী, মঈনুল হক চৌধুরী, আব্দুল মান্নান, ফারুকুল ইসলাম ফারুক, শাহ জামাল নুরুল হুদা, মাহবুবুর রব চৌধুরী ফয়সল, মামুনুর রশীদ মামুন, ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী, এমরান আহমেদ চৌধুরী, নাজিম উদ্দিন লস্কর, সিদ্দিকুর রহমান পাপলু, মাজহারুল ইসলাম ডালিম, অ্যাডভোকেট হাসান পাটোয়ারী রিপন, আব্দুল আহাদ খান জামাল, মাহবুবুল হক চৌধুরী, আবুল কাশেম, শামীম আহমেদ, ও আহমেদুর রহমান চৌধুরী।

সিলেট বিএনপির একাধিক নেতাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, আহবায়ক কমিটির সদস্য ফখরুল ইসলাম ফারুকের বিরুদ্ধে রয়েছে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ। এসব অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় একাধিকবার জেলও খেটেছেন তিনি। ফারুক আগের কমিটির ৩৫ নম্বর সহ-সভাপতি ছিলেন। আহ্বায়ক কমিটিতে তার জায়গা হলেও অন্য সহ-সভাপতিদের ঠাঁই হয়নি।

এই কমিটিতে সদস্য করা হয়েছে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ ও সদর উপজেলা সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমকে।১৩ উপজেলার মধ্যে শুধুমাত্র এই ২ উপজেলার পদধারী নেতাকে সদস্য করা নিয়েও নানা প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে নেতাকর্মীদের মনে।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ,বিভিন্ন আন্দোলনে যারা রাজপথে ছিল হামলা মামলার শিকার হয়েছেন তাদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে এই কমিটিতে। সিলেটের কোনও উপজেলার নেতাকে যদি জেলা কমিটিতে রাখা হয় তাহলে এর দাবিদার বিশ্বনাথ উপজেলার নেতাকর্মীরা। কারণ বিশ্বনাথে সবচেয়ে বেশি মামলা,হামলা হয়েছে। অথচ এই উপজেলা থেকে আহবায়ক কমিটিতে কাউকে রাখা হয়নি।

আহবায়ক কমিটিতে খাদিমপাড়া ইউনিয়ন থেকে ৩জন সদস্য করা হয়েছে। কমিটির সদস্য ইশতিয়াক সিদ্দিকী আহমেদুর রহমান চৌধুরী নিলু ও মাজহারুল ইসলাম ডালিম এই তিনজনই খাদিমপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। এদের মধ্যে ইশতিয়াক সিদ্দিকী ও আহমেদুর রহমান চৌধুরী নিলু গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রকাশ্যে নৌকা মার্কার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। আর মাজহারুল ইসলাম ডালিম দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে দল থেকে অব্যাহতি নিয়ে গত সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন। এক ইউনিয়ন থেকে বিতর্কিত ৩ জনকে আহবায়ক কমিটিতে সদস্য রাখায়ও নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এছাড়াও আহবায়ক কমিটির সদস্য শাহ জামাল নুরুল হুদার বিরুদ্ধে নিজের মালিকানাধীন হোটেলের নামে অর্থ তুলে আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আরেক সদস্য সিদ্দিকুর রহমান পাপলুর বিরুদ্ধে রয়েছে নারী নির্যাতনের অভিযোগ।

আহ্বায়ক কমিটির সদস্য করা হয়েছে কানাইঘাট উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আশিক উদ্দিন চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। সদস্য মাহবুবুল হক চৌধুরী (ভিপি মাহবুব)-এর বিরুদ্ধে শিক্ষাসনদ জাল করার অভিযোগ রয়েছে। এই কারণে ল’ কলেজের ভিপি পদ থেকে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন বিএনপির একাধিক নেতা। এই কমিটির আরেক সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী দীর্ঘদিন যাবত ইংল্যান্ডে আছেন। প্রবাসে থেকেও জেলা আহবায়ক কমিটিতে সদস্যপদ পাওয়ায় ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এসব ব্যাপারে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটিতে বিতর্কিত মানুষজন রয়েছেন। এ বিষয়ে কিছু বলা আমার জন্য অনেক দুরূহ ও দুঃখজনক ব্যাপার। দীর্ঘদিন ধরে যারা দলের জন্য কাজ করেছেন, রাজপথে হামলার শিকার হয়েছেন, গুলি খেয়েছেন- এই আহবায়ক কমিটিতে তাদের জায়গা হয়নি।

তিনি বলেন, এই জেলায় সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে আমার নামে এটা সবার জানা। আমার পাসপোর্ট পর্যন্ত জব্দ করে রেখেছে সরকার। আমার মত সিলেট জেলা বিএনপিতে এখনো এমন কিছু মানুষ আছে যারা শরীরে গুলি স্পিন্টার নিয়ে দিনযাপন করছেন। এই মানুষগুলো আমাদের মূল্যায়ন করা দরকার। তাই আমি এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী ও বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এম এ হক মিলে কিছু ত্যাগী ও মামলা হামলার শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের তালিকা করে কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলাম বর্তমান আহবায়ক কমিটিতে রাখার জন্য। কিন্তু তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি।

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মখন মিয়া বলেন, রাজনীতিতে এখন আর আগের মত নীতি নাই। এই কমিটি প্রকাশ হওয়ার পরই দলের ভিতরে বাইরে মানুষজন আলোচনা সমালোচনা করছেন। এই আহবায়ক কমিটি গ্রহণযোগ্য হয়নি। দীর্ঘদিন যারা দলের জন্য কাজ করেছে, গুলি খেয়েছে, জেল খেটেছে তাদেরকে এই কমিটিতে মূল্যায়ন করা হয়নি। মুরব্বিদের এই কমিটিতে মূল্যায়ন করা হয়নি। কি দেখে কমিটিতে পদ দেওয়া হয়েছে এটা আমারও প্রশ্ন। আমি চাই এই কমিটিটা গ্রহণযোগ্য করা হোক। ত্যাগী ও বিজ্ঞ নেতাদের এই কমিটিতে জায়গা দেওয়া হোক। ত্যাগী ও বিজ্ঞরা কমিটিতে আসলেই কমিটি সুন্দর হবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open