বেপরোয়া ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ, স্ত্রী কুরিয়ার সার্ভিসে নেন কোটি কোটি টাকা !

বিপুল পরিমাণ ঘুষের টাকা স্থানান্তর করতে ডিআইজি প্রিজন (হেডকোয়ার্টার্স) বজলুর রশীদ অভিনব পন্থা বেছে নিয়েছেন। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে শতাধিক ধাপে পাঠিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। টাকা তুলেছেন তার স্ত্রী রাজ্জাকুন নাহার। এজন্য প্রকৃত ঠিকানা গোপন করে স্ত্রীর নামে তোলা হয় মুঠোফোনের সিম। এছাড়া সরাসরি নিজে টাকা না পাঠিয়ে ঘুষ চ্যানেলের নির্ভরযোগ্য সোর্স ব্যবহার করেছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। যুগান্তর অনুসন্ধানী টিমের এক মাসের প্রচেষ্টায় ডিআইজির ঘুষ-কাণ্ডের আদ্যপ্রান্ত বেরিয়ে আসে।

টাকা লেনদেনে কুরিয়ার সার্ভিসের মানিরিসিটসহ অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ দেখে বিস্মিত হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। শনিবার সকালে মন্ত্রীর ধানমণ্ডির বাসভবনে এ বিষয়ে আলাপকালে প্রতিবেদককে তিনি বলেন সাহস কত বড়? তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরে আপনারা প্রতিবেদন করেন। কাউকে ছাড়া হবে না।এরপর মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত কারা ডিআইজি বজলুর রশীদের বিষয়ে খোঁজ নিতে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।’

কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে স্ত্রীর নামে কোটি কোটি টাকা পাঠানোর বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ একেবারে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন ওই নম্বরটি দেড় বছর আগে হারানো গেছে। তাছাড়া এভাবে টাকা পাঠানোর অভিযোগ একেবারে ডাহা মিথ্যা।’

এদিকে এর একদিন পর এ সংক্রান্ত নথিপত্র দেখার কথা বলে একটি অভিজাত হোটেলে প্রতিবেদককে বসার প্রস্তাব দেন ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ। কিন্তু সেখানে উপস্থিত হয়ে স্বচক্ষে বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ দেখে তিনি হতচকিত হয়ে পড়েন।এক পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ ঘুষের টাকা স্ত্রীর কাছে এই কৌশলে পাঠানোর কথা অকপটে স্বীকার করে নেন। এরপর তিনি প্রতিবেদককে সরাসরি টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন।এই অপচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বলে, ভাই মানসম্মানটা রক্ষা করেন। এসব নথিপত্র সব মেনে নিয়েছি। আমি অপরাধ করেছি আমাকে ক্ষমা করেন।তথ্যানুসন্ধানে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের ২৪টি রসিদ পাওয়া যায়। সূত্র জানায়, যদিও বাস্তবে এ ধরনের রসিদের সংখ্যা শতাধিক। প্রাপ্ত রসিদে টাকার যোগফল দাঁড়ায় প্রায় কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু এসএ পরিবহনে কুরিয়ার করেই ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ ঘুষের কয়েক কোটি টাকা স্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছেন। কুমিল্লা থেকে তৌহিদ হোসেন মিঠু (মোবাইল নং ০১৭২৬০১২০০৭) নামে একজন এই টাকা বজলুর রশীদের স্ত্রী রাজ্জাকুন নাহারের নামে নেয়া (০১৮৫৬৫৫৭৩৫৮) মোবাইল নম্বরে পাঠাতেন। রেবা নামে এই টাকা গ্রহণ করার তথ্য নিশ্চিত করা হয়। আর রাজ্জাকুন নাহার রেবাই হল ডিআইজি বজলুর রশীদের স্ত্রী।

এ বিষয়ে তৌহিদ হোসেন মিঠুর কাছে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন আমি কুমিল্লা থেকে একটি অনলাইন পরিচালনা করি। বজলুর রশীদের স্ত্রীকে কোটি কোটি টাকা পাঠানোর বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানি না। এরপর থেকে কয়েকজন সংবাদকর্মী মিঠুর পক্ষে প্রতিবেদককে ফোন করে রিপোর্ট না করার অনুরোধ করতে থাকেন। এই মিঠুর পিতার নাম আবুল খায়ের। তিনি প্রধান কারারক্ষী হিসেবে অবসরে গেছেন।

সূত্র জানায় মূলত তার পিতার মাধ্যমেই ডিআইজির সঙ্গে মিঠুর বিশেষ সখ্য গড়ে ওঠে।এক সময় সিনিয়র জেল সুপার হিসেবে কুমিল্লায় কর্মরত ছিলেন বজলুর রশীদ। ওই সময় থেকেই তার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে তৌহিদ হোসেনের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় অবৈধ টাকা সহজে লেনদেনের স্বার্থে ভুল ঠিকানা দিয়ে একটি মোবাইল ০১৮৫৬৫৫৭৩৫৮ নম্বর সংগ্রহ করেন। ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কারা ডিআইজি বজলুর রশীদের স্ত্রী রাজ্জাকুন নাহারের নামে সিমটি রেজিস্ট্রেশন করা হয়। ওই সিম রেজিস্ট্রেশনে তার নাম সঠিক থাকলেও ঠিকানা দেয়া রয়েছে নওগাঁর নেয়ামতপুর। সিম রেজিস্ট্রেশন ফরমে গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্রের যে নম্বর (এনআইডি-১৯২৬৭১০০৬৯৯৭৮) রয়েছে তা যাচাই করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রকৃত ঠিকানা দেয়া হয় জামালপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের নিশিন্দি গ্রাম। জাতীয় পরিচয়পত্রে গ্রামীণফোনের আরেকটি নম্বর দেয়া আছে।

বজলুর রশীদের স্ত্রীর নামে এই টাকা লেনদেনের বিষয়ে জানতে চাইলে কারা অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘কারা সদর দফতরে ডিআইজি পদে থাকায় বজলুর রশীদ সারা দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে চাঁদার নামে নির্ধারিত রেটে ঘুষ নিয়ে থাকেন। এই তৌহিদই তার ক্যাশিয়ার।

লেনদেন যেভাবে : যুগান্তরের অনুসন্ধানে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে এসএ পরিবহনের প্রাপ্ত মানিরিসিটগুলোতে দেখা গেছে, চলতি বছর ছাড়াও ২০১৭ সাল থেকেই মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন করেছেন রাজ্জাকুন নাহার। এর মধ্যে গত ২০ জানুয়ারি ৯৫৮৮২৫ রসিদে ৫০ হাজার টাকা, ১৭ ফেব্রুয়ারি ৯৫৮১০৮ রসিদে ১ লাখ ২ হাজার টাকা, ২৪ ফেব্রুয়ারি ৯৫৮১৪৩ রসিদে ২ লাখ টাকা, ২০ মে ৯৫৯০৬০ রসিদে ১ লাখ টাকা, ২৩ মে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা, ২৭ মে ৯৫৯১৪১ রসিদে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৫০ টাকা, ৬ জুলাই ৯৫৯৪৬৯ রসিদে ৩ লাখ টাকা, ১৪ জুলাই ৯৫৮৯৭২ রসিদে ১ লাখ টাকা, ২২ জুলাই ৯৫৯৫১২ রসিদে ১০ লাখ ১০ হাজার, ১৬ জুলাই ৯৫৯৪৭০ রসিদে ৩ লাখ টাকা, ৪ মার্চ ৯৫৮২১৮ রসিদে ২ লাখ টাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ৯৫৯৫৪১ রসিদে ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৪ অক্টোবর ৯৫৯৭৪৯ রসিদে ৬ লাখ টাকা স্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়।

২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর ৯৫৮৪৮১ রসিদে ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, ১৯ মার্চ ৯৫৮৩৪৫ রসিদে ৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, ১১ এপ্রিল ৮৪২১২৮ রসিদে ৩ লাখ টাকা, ২০ নভেম্বর ৮৪২২৩৯ রসিদে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ৯৫৭৬৪০ রসিদে (তারিখ অস্পষ্ট) ২ লাখ টাকা, ২০১৭ সালের ৪ মার্চ ৯৫৮১৬৯ রসিদে ৬ লাখ ৮ হাজার টাকা, (১৬ অক্টোবর সাল অস্পষ্ট) ৮১৭২৩৮ রসিদে ১ লাখ টাকা, (৮ অক্টোবর সাল অস্পষ্ট) ৮১৭১৫৭ রসিদে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, ৯৫৯৭১৩ রসিদে (তারিখ অস্পষ্ট) ৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর ৮১৭২১৭ রসিদে ৩ লাখ টাকা, ১২ অক্টোবর ৮১৭২০৭ রসিদে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা লেনদেন করা হয়। কুমিল্লা থেকে তৌহিদ হোসেন মিঠুর পাঠানো টাকা এসএ পরিবহনের কাকরাইলের প্রধান অফিস থেকে শুধু মোবাইলে মালিকানা নিশ্চিত করে বিপুল অঙ্কের এই টাকা তুলে নেয়া হয়।

এছাড়া রসিদে জামালপুর থেকে দুলাল মিয়া নামে ডিআইজি বজলুর রশীদের স্ত্রী রাজ্জাকুন নাহারকে আরও কিছু টাকা পাঠাতে দেখা যায়। এর মধ্যে ৯৫৮৭৮৯ রসিদে (তারিখ অস্পষ্ট) ৩৪ হাজার টাকা, ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ৪ হাজার টাকা এবং ৪ জুলাই ৯৫৯৩৭০ রসিদে ৩৩ হাজার টাকা পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়। দুলাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডিআইজি বজলুর রশীদের চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করতে পারবেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘রাতে ফোন দিয়ে ভাইয়ের (বজলুর রশীদ) সঙ্গে যোগাযোগ করে জানাতে পারব।’

কারা অধিদফতরের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার বডিগার্ড নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে কারা অধিদফতরে স্টোরকিপার, অফিস সহকারী, ড্রাইভার, দর্জি মাস্টারসহ বিভিন্ন পদে বেশ কিছুসংখ্যক লোক নিয়োগ করা হয়। কিন্তু এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপকভাবে ঘুষ বাণিজ্যের পসরা সাজান ডিআইজি বজলুর রশীদ। তার স্ত্রী নিয়োগ বাণিজ্যের অলিখিত দায়িত্ব পান। ফলে টাকার লেনদেন তার মাধ্যমেই হতো। এভাবে তার মতো কারাগারের বিভিন্ন পর্যায়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের স্ত্রীরাও একে একে এই নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন।’

বিস্তারিত জানতে চাইলে ওই দেহরক্ষী বলেন, ‘নিয়োগ বাণিজ্যের ময়মনসিংহ কারাগারের একজন কর্মকর্তার স্ত্রীর কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা নেন রাজ্জাকুন নাহার। ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদের সমমর্যাদার আরেক কর্মকর্তার স্ত্রীর কাছ থেকে দুই দফায় নিয়েছেন ৬ লাখ টাকা। এছাড়া ঢাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন কারারক্ষীর কাছ থেকে নিয়োগ বাণিজ্যের ৫৮ লাখ টাকা নিয়ে গেছেন বজলুর রশীদ নিজেই। এই টাকার বিনিময়ে বেশ কয়েকজনকে নিয়োগ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনেকেরই চাকরি না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে ওই এক কারারক্ষীকে ময়মনসিংহে বদলি করে দেয়া হয়। আরেক কারা রক্ষীর কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ৩৮ লাখ টাকা। ঘুষ দেয়া এবং নেয়া সমান অপরাধ হওয়ায় বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে এরা এখন মহাসংকটে পড়েছেন। না পারছেন বলতে না পারছেন সইতে।’

বিতর্কিত কারারক্ষীর সঙ্গে সখ্য : বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত সর্বপ্রধান কারারক্ষী হিসেবে নজরুল ইসলামকে আবারও কেরানিগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে পোস্টিং দেয়া হয়েছে। গত ৮ আগস্ট ঝালকাঠি জেলা কারাগার থেকে তাকে সরাসরি কেন্দ্রীয় কারাগারে বদলি করে আনা হয়।

এই নজরুল ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন কারা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার সময় নাজিমুদ্দিন রোডের তৎকালীন কেন্দ্রীয় কারাগারেও গ্রেনেড পাওয়া যায়। ওই সময় কেন্দ্রীয় কারাগারের গোয়েন্দা কারারক্ষীর দায়িত্বে ছিলেন নজরুল ইসলাম। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নির্দেশে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভেঙে ফেলেন এই নজরুল ইসলাম। এরপর দীর্ঘদিন তাকে ঢাকার বাইরেই রাখা হয়। সম্প্রতি হঠাৎ তাকে প্রধান কারারক্ষী হিসেবে কেরানীগঞ্জে পোস্টিং দেয়ায় কারা কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

Sharing is caring!

Loading...
Open