বিমান থেকে নামিয়ে আনা হলো ক্যাসিনো সেলিমকে

সুরমা টাইমস ডেস্ক:: বোর্ডিং, ইমিগ্রেশন শেষ করে থাই এয়ারের উড়োজাহাজে উঠে বসেছিলেন সেলিম প্রধান। বিমানটি ছেড়েও দিয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বিমানের চাকা রানওয়েতে গড়াতে না গড়াতেই র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) বাধা। পরে বিজনেস ক্লাসের এই যাত্রীকে বিমানের ভেতর থেকে অনেকটা নাটকীয় কায়দায় আটক করেছেন র‌্যাব-১-এর সদস্যরা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গতকাল সোমবার দুপুরে এই ঘটনা ঘটেছে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, থাই এয়ারওয়েজের ব্যাংককগামী বিমান থেকে সেলিম প্রধানকে আটক করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ক্যাসিনো কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনলাইন ক্যাসিনোর বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রধান তিনি। দেশে অনলাইন ক্যাসিনোর এই হোতাকে র‌্যাব হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

রাজধানীর ফকিরাপুলে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবসহ কয়েকটি ক্যাসিনোর আখড়ার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য আছে। তিনি ক্যাসিনোর টাকা বিদেশেও পাচার করেছেন। চলমান অভিযানে নাম উঠে আসার পর গতকাল কৌশলে থাইল্যান্ডে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, সেলিম প্রধানকে দীর্ঘদিন ধরে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। তা ছাড়া আটক সেলিম প্রধান টেন্ডারবাজি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। তিনি চারদলীয় জোট সরকার আমলের অনেকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। তারেক রহমান ও তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার গিয়াস উদ্দিন আল মামুনেরও ঘনিষ্ঠ ছিলেন এই ব্যক্তি।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, সেলিম প্রধান অনলাইন ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য আছে। অনলাইন ক্যাসিনোর মাধ্যমে অর্জিত টাকা বিদেশে পাচার করে আসছিলেন তিনি। এমন অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে আটক করা হয়েছে।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, থাই এয়ারওয়েজের ‘টিজি-৩২২’ ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে গতকাল দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে ব্যাংককের উদ্দেশে উড্ডয়ন করার কথা ছিল। কিন্তু র‌্যাবের অভিযানের কারণে ফ্লাইটটি প্রায় দেড় ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকা ছেড়ে যায়।

জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সাঈদ মেহবুব খান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব সদস্যরা থাই এয়ারওয়েজের যাত্রী সেলিম প্রধানকে ফ্লাইট থেকে আটক করেন। বিমানটি ট্যাক্সিওয়েতে যাওয়ার পর তা থামিয়ে তাঁকে আটক করা হয়।’ সেলিম প্রধান এফ-১১ সিটের যাত্রী ছিলেন।

র‌্যাব সূত্র জানায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মতিঝিলে চারটি ও গুলশান এলাকায় একটি ক্যাসিনোতে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালান। ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা চিত্তবিনোদন ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র, কলাবাগান ও গোল্ডেন ক্লাবে পরিচালিত অভিযানে আটক হওয়া ২০১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। পুলিশও শুরু করে অভিযান।

ধারাবাহিক অভিযানে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম ও কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব অভিযানের সূত্রে ক্যাসিনো-জুয়ার নিয়ন্ত্রক হিসেবে বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তাঁদের অন্যতম একজন এই সেলিম প্রধান।

নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা সেলিম আধুনিক ক্যাসিনো কারবার শুরু করেন। তিনি অনলাইনে বিট বা গেম পরিচালনা করেন। এই জুয়ার মাধ্যমে আয় করা বিপুল টাকা তিনি ইতিমধ্যে বিদেশে পাচার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ক্যাসিনো কারবারে জড়িত অন্যদের ব্যাপারেও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে সূত্র জানায়।

থাই ডন সেলিম প্রধান :–

সেলিম প্রধান থাইল্যান্ডেরও নাগরিক। তিনি সেখানে হোটেলের ব্যবসা করেন। সেই হোটেলে ডিসকোসহ চলে ক্যাসিনোও। এ ছাড়া ঢাকার গুলশান এলাকায় একটি স্পারও মালিক তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ‘প্রধান স্পা’। দেশ-বিদেশে অবৈধ ব্যবসা চালানোয় সবাই তাঁকে চেনে ডন হিসেবে। তাঁকে বলা হয় থাই ডন।

জানতে চাইলে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের প্রধান সারোয়ার বিন কাশেম গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেলিম প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

সেলিম প্রধানকে আটকের পর উত্তরায় র‌্যাব-১ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে গতকাল রাতে গুলশানে তাঁর ‘প্রধান স্পা’ নামের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় র‌্যাব।

সূত্র জানায়, সেলিম প্রধান ঢাকার রাস্তায় চলার সময় তাঁর গাড়ির সামনে পেছনে থাকে নিজস্ব নিরাপত্তাবাহিনীর গাড়ি। তাঁরও রয়েছে জি কে শামীমের মতো দেহরক্ষী। দেশের অনেক সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে সেলিম প্রধানের। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, কয়েক মাস ধরে তাঁর ব্যবসা মন্দা চলছে। এ কারণে তিনি ঢাকায় থাকছেন বেশি। আর এখানে অনলাইনের মাধ্যমে তিনি জুয়া খেলছেন।

জানা গেছে, সেলিম প্রধান বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে যাতায়াতের মধ্যেই থাকেন। থাইল্যান্ডেও তাঁর নাগরিকত্ব আছে। অনলাইন ক্যাসিনোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করে থাইল্যান্ডে পাচার করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

বাসা কাম অফিসে র‌্যাবের অভিযান : দেশে অনলাইন ক্যাসিনোর মূলহোতা সেলিম প্রধানের গুলশানের অফিস কাম বাসায় অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব। গতকাল রাত ১০টার দিকে অভিযান শুরু করে চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এ সময় সেখান থেকে অনেক ক্যাসিনো সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। তাঁকে আসামি করে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম অভিযানের বিষয়ে জানান, গুলশানের দুই নম্বর এভিনিউয়ের ৯৯ নম্বর সড়কের ১১/এ নম্বর বাসায় রাত ১০টার দিকে অভিযান শুরু করা হয়। এই বাসাতেই সেলিম ‘পি-২৪ গ্যাম্বলিং’ নামে অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনা করতেন। এটা বাসা হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি তিনি অনলাইনে ক্যাসিনো কারবার করতেন।

রাত সাড়ে ১২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাঁর বাসা কাম অফিসে অভিযান চলছিল। এর আগে সেলিমকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে ওই বাসা কাম অফিসে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় র‌্যাব। এরপর তাঁকে নিয়েই ওই বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব।

Sharing is caring!

Loading...
Open