ঢাকায় এখন টাকা উড়ে

ঢাকায় এখন টাকা উড়ে। কি বিশ্বাস হচ্ছে না, হবার কথাও না। ঢাকা আর টাকা মিলের সমীকরণ খুবই মজার, কেউ কাউকে ত্যাগ করতে পারছে না। আজব আজব সব কারখানা ঢাকায় ব্যাঙ্গের ছাতার মত গজাচ্ছে, যেখানে শুধু টাকা যে উড়ে তা না সাথে আছে বাহারি সব বিনোদন। গত কয়েকদিন যাবত বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলো ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ও অসাধু আমলাদের অবৈধ অর্থের যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে তা যে কারো চোখ ছানাবাড়া হওয়ায় কথা। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে জব্দকৃর্ত অর্থ বা সম্পদের পরিমাণ দেখে বুঝার কোন অবকাশ নেই যে ঢাকায় এত টাকা। ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাবাদী এবং দুষ্টু কর্মকর্তারা মিলেমিশে জনগণের রক্ত চুষে সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছে। শুধু কি তাই, তাদের বিলাসীতা প্রাচ্যের মাফিয়াদের ও হার মানিয়েছে। শাসন আর শোষণে বাংলাদেশ এখন আহাকার।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পুরান ঢাকায় র‌্যাবের অভিযানে পাওয়া গেছে সিন্দুক। এ যেন মোঘল রাজার ধনভাণ্ডার সেখানে শুধু টাকা আর টাকা। গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়ার তিনটি বাসার সিন্দুক থেকে পৃথক অভিযান চালিয়ে র‌্যাব পাঁচ কোটি পাঁচ লাখ টাকা এবং ৭৩০ ভরি স্বর্ণ জব্দ করেছে। এত টাকা এবং স্বর্ণলংকার কোথায় থেকে এলো? এত টাকার খেলা রুপকথাকেও হার মানাবে। অগণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর ভাল সুবিধা নিচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা।

জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের মালিক যুবলীগ নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের গুলশান অফিসে র‌্যাব হানা দিয়ে ১০ কোটি টাকা উদ্ধার করে। দশ কোটি টাকা, তাও আবার নগদ শুনতে কেমন যেন গা শিউরে উঠে। শুধু এখানে শেষ নয় আরও প্রায় ২০০ কোটি টাকার চেক এফডিআর অস্ত্র ও মদ উদ্ধার করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।দুর্নীতি কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে এখান থেকে সহজে অনুমান করা যায়। দুর্নীতিবাজ আমলাদের সহযোগিতায় টেন্ডার বাণিজ্য করে সরকারী কাজ হাতিয়ে রাতারাতি গডফাদার বনে যায় জিকে শামীম। এ ত এক শামীমের গল্প কিন্তু এভাবেই হাজার হাজার শামীম দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যারা অনৈতিক পন্থায় সম্পদের পাহাড় গড়ছে তাদের খুঁজ কে রাখে। ‘শুদ্ধি’ নামক অভিযান যে উদ্দেশ্যে নিয়ে শুরু করা হয়েছে তা প্রকৃর্ত অর্থে তালগোলের পথে। ছাত্রলীগের শোভন-রাব্বানী দিয়ে যে শুদ্ধি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল তা কী চলমান থাকবে?

গত কয়েকদিন যাবত ঢাকার ক্লাব পাড়া হিসাবে খ্যাত মতিঝিলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশনে দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স, ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব ও আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাবগুলোতে ক্যাসোনোর আসর বসিয়ে রমরমা ব্যাবস্যা করে যাচ্ছেন রাজনীতিবীদ, অসাধু দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তা এবং ক্ষমতাসীন দলের রাগববোয়ালরা। যে জায়গাতে খেলাধুলা বিষয়ক কার্যক্রম হওয়ার কথা সেখানে মানুষ গিয়ে টাকা হাওয়ায় উড়াচ্ছে। এ যেন এক আজব ব্যাপার। ঢাকার ক্লাবগুলোতে প্রকৃর্ত অর্থে কি হচ্ছে? বাহির থেকে বুঝাই যায় না আসলে বিতরে কি হচ্ছে, মনে হয় স্বাভাবিক নিয়মে ক্লাবগুলো দাড়িয়ে আছে কিন্তু আন্দরমহলের চাকচিক্য কত জনকে যে নিঃস্ব করেছে কে জানে। ফুটবল ক্লাবগুলোকে তারা সবচেয়ে নিরাপদ হিসাবে বেচে নিয়েছে। গডফাদারদের সহযোগিতা ছাড়া এ কাজটি কী সহজ ছিল? এত দিন ধরে তারা কিভাবে আবলীলায় জুয়ার আসর চালিয়ে গেলো তা কি আমাদের বোধগম্য নয়? রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে নীতি নৈতিকতাতে পচন ধরিয়েছে এক শ্রেণির অসাধুরা।তা না হলে কোন শক্তির উপর ভর করে তারা ক্লাবগুলোকে টার্গেট করলো? দেশটাকে অপরাধ এবং অপরাধীদের অভয়ারণ্য করারা পায়তারা চলছে। তারই অংশ হিসাবে অলিতে-গলিতে জুয়ার আসর। বাংলাদেশে ক্যাসোনোর সংবাদ আমাদের ক্ষতের মধ্য যন্ত্রণার মাত্রা বৃদ্ধি করেছে। তাহলে ঢাকা কী লাস ভেগাসের পথে?

লাস ভিগাস যাকে ক্যাসোনোর শহর বলা হয়। জুয়াড়িদের স্বর্গরাজ্য হচ্ছে আমেরিকার এই শহরটি। বিশ্বের সব বড় দাগের মাফিয়া, প্রভাবশালী ব্যাবসায়ী এবং পাপারাজ্যীরা ভিড় জমায় এখানে জুয়া খেলার জন্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ঢাকাতে ক্যাসোনো গড়ে উঠা আমাদের জাতি সত্তার কি পরিচয় বহন করে।এটা কি আমাদের সাথে যায়। মুষ্টিময় কিছু অসৎত রাজনৈতিক পরিচয় বহন করে বেকার জনগোষ্টীকে পুজিঁ করে জুয়ার অন্তরালে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীরা প্রতোক্ষ ও পরোক্ষভাবে জুয়ার সাথে সম্পৃক্ত। আফসোস হয় রাষ্টের নাগরিকরা আজ মেরুদণ্ডহীন তারা প্রতিবাদ ত দুরুের কথা প্রতিহত করার সাহস পায় না। একটি দেশ ও জাতিকে কিভাবে তিলে তিলে ধ্বংস করা হয় তার জলন্ত বাস্তব প্রমাণ বাংলাদেশ।আমাদের বিবেক এবং বুদ্ধিসত্তা কবে জাগ্রত হবে?

ক্লাবগুলোর মূল কাজ কী? বিগত এক দশকের পর্যালোচনায় দেখা যায় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে মতিঝিলের ঐ ক্লাবগুলোর তেমন কোন অবদান নেই। আর কি করেই বা হবে যেখানে বছরের পর বছর তারা জুয়ার পসরা সাজিয়ে যুবসমাজকে পথে বসিয়েছে। অবাক হই ঢাকার ফুটবল ক্লাবের অন্তরালে অন্ধকার জগৎটা দেখে। এই ক্লাবগুলো গড়ে উঠেছে খেলাধুলা করার জন্য অথচ যুবসমাজকে ধ্বংসের পায়ঁতারা চলছে এখানে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের যে ক্ষতি হলো কেউ কি এক বার চিন্তা করেছে। অভিবাকরা কি তাদের ছেলেমেয়েদের এই ক্লাবগুলোতে পাঠাবে জুয়া শেখানোর জন্য, না কি খেলাধুলার জন্য? দেশটা দিন দিন কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে ? ভাবতে ভয় হয়। আমরা কী এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম ? এই অন্ধকার জগৎ তৈরির পেছনে রাগববোয়ালরা এত ক্ষমতাবান কি করে হয়। যারা এক দশক পৃর্বে ও ছেছড়া টাউঠ বাটপাড় এবং আদম চোরাকারবরী ছিল তারা সময়ের পরিক্রমায় ফুঁসে কলাগাছ এমনকি প্রভাবশালী সমাজপতি। এদের পথ এত মশৃণ কি করে হলো খুঁজে বের করতে হবে। সুবিধাবাদী এই প্রভাবশালীরা সুবিধামত রাজনৈতিক লেবাস ব্যাবহার করে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো লুটেপোটে সব ফোকলা করে দিচ্ছে।

জুয়ার প্রতি নগরবাসী এত আশক্তি হওয়ার কারণ কী? আর কেনই বা তারা ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোকে বেচে নিলো? এর ব্যাপকতার রহস্য কী? জুয়ার আসর থেকে ভাগভাটোয়ারা কারা পেতেন তা কি জনার সুযোগ হবে আমাদের? অপরাধীদের পরিচয় জানা আমাদের নাগরিক অধিকার। রাষ্ট্র প্রধান কী এই কালপিটদের খোলস উন্মোচন করবেন?

খালেদ-শামীমদের গ্রেফতার করার পর যারা খুশিতে লাফালাফি করছেন তারা আসলে না বুঝে সরকারের প্রতি কৃর্তজ্ঞ। এরা হচ্ছে চুনোপুটি, কিন্তু রুই কাতলরা পাশঘেষে চলে যাচ্ছে। বড় মাছদের নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চুনোপুটিদের ঝাটকা দেওয়া হচ্ছে যা একটি সহজ বার্তা হতে পারে। চুনোপুটিরা ত আর হুট করে উড়ে এসে জুড়ে বসেনি, কেউ না কেউ তাদের সুযোগ করে দিয়েছে। তাদেরকে মাফিয়া বানানোর পিছনের ডন গুলোকে যখন ধরা হবে তখন সার্থকতা বলা যাবে। তবে এ কাজটি শেখ হাসিনা কিভাবে সামাল দেন দেখার বিষয়। শামীমের রাজনৈতিক গডফাদাররা আপাতত নিরব ভুমিকা পালন করলেও সময় সুযোগ বুঝে তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নিবে। কেউ ত আর চাইবে না তার নিয়মিত অবৈধ আয় বন্ধ হোক। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো ইয়াং মেনস ক্লাবের চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী এবং বামপন্থী নেতা রাশেদ খান মেননের নাম প্রকাশ্যে আসার পর ও গোয়েন্দা সংস্হা নিরব। এসব কিসের আলামত? ক্যাসিনো সাম্রাজ্যেরও সম্রাট ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট এখনও ধরাছোয়ার বাহিরে। যে কি না প্রতি মাসে সিঙ্গাপুরে উড়াল দেয় জুয়া খেলতে। ইতিমধ্যেই আমরা জেনেছি শুধু রাজধানীতে আনুমানিক ৬০টি ক্যাসোনো রয়েছে। এখন দেখার বিষয় সরকার কিভাবে এগুলোকে দমন করে।

মোঃ হাফিজুর রাহমান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অনলাইন এক্টিভিষ্ট

Sharing is caring!

Loading...
Open