অফিস সহকারীর আলমারিতে ২২ লাখ,দুই কোটি ৬৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ

নওগাঁয় সঞ্চয় অফিসে গ্রাহকের প্রায় দুই কোটি ৬৩ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অফিসের উচ্চমান সহকারী হাসান আলীকে গ্রেফতার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এ সময় তার অফিস কক্ষের আলমারি থেকে ২২ লাখ ৮৭ হাজার উদ্ধার করা হয়। বুধবার বিকেল ৫টার দিকে জেলা সঞ্চয় অফিস থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর হাসান আলীকে পুলিশে সোপর্দ করেছে দুদক। এরপর তাকে জেলাহাজেত পাঠানো হয়।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুদকের রাজশাহীর সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে সঞ্চয় অফিসে অভিযান চালানো হয়। উচ্চমান সহকারী হাসান আলী নওগাঁ শহরের চকদেব সরিষাহাটির মোড়ের বাসিন্দা।

গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় গত ২৫ জুন জেলা সঞ্চয় অফিস সহায়ক সাদ্দাম হোসেনকে (২৯) রাজশাহী মহানগর জিরো পয়েন্ট থেকে গ্রেফতার করে দুদক। গ্রেফতারের পর তাকেও নওগাঁ সদর থানায় সোপর্দ করা হলে পুলিশ জেলহাজতে পাঠায়। সাদ্দাম হোসেন গাইবান্ধা সদরের বক্তার আলীর ছেলে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নওগাঁ সঞ্চয় অফিসে প্রায় ২৫ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারী আছেন। এই প্রতিষ্ঠানে যারা বিনিয়োগকারী তাদের অধিকাংশই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী। মাসিক ও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সেখান থেকে মুনাফা উত্তোলন করা হয়। জেলার ১১টি উপজেলা ছাড়াও অন্যান্য জেলার বিনিয়োগকারীরা এখানে সঞ্চয় করেছেন।

চলতি বছরের শুরু থেকে সঞ্চয় অফিসে বিনিয়োগকারীরা হয়রানির মধ্যে পড়েন। এতে করে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা পরিশোধ করতে কর্তৃপক্ষের নানা অনিয়ম আর অবহেলার অভিযোগ ওঠে। বিনিয়োগকারীরা মুনাফা না পেয়ে চরম হয়রানির শিকার হন। অফিসে পাঁচজন কর্মকর্তার পদ থাকলেও কাজ করছেন মাত্র দুজন। অফিস সহায়ক সাদ্দাম হোসেন গত বছরের ডিসেম্বর থেকে অফিসকে না জানিয়ে লাপাত্তা। এজন্য অফিসে প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব।

২০১৪ সালে নওগাঁ সঞ্চয় অফিসে সাদ্দাম হোসেন অফিস সহায়ক পদে যোগ দেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে হঠাৎ করে অফিসে আসা বন্ধ করে দেন তিনি। দায়িত্ব পালনকালে সাদ্দাম হোসেন বেশ কিছু আমানতের রেকর্ড না রেখে গ্রাহককে ভুয়া সিল-স্বাক্ষরে রশিদ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে হাসান আলীর সহযোগিতায় ভাউচার জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্নভাবে প্রায় দুই কোটি ৬৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

গত জুন মাসে সঞ্চয় অফিসে বিভাগীয় অফিস থেকে অডিট করা হয়। অডিটে বেশি কিছু গ্রাহকের জমাকৃত টাকার গরমিল পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে ৫০-৬০ জন গ্রাহকের জমাকৃত টাকার হদিস পাওয়া যায়নি। এরপরই আমানত আত্মসাতের ঘটনা ধরা পড়ে।

ঘটনা জানা জানির পর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। নওগাঁ সদর থানায় ১৫ জুন অফিস সহায়ক সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে সঞ্চয় অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত সঞ্চয় কর্মকর্তা নাসির হোসেন একটি মামলা করেন। এরপর ঘটনা অনুসন্ধানে নামে দুদক। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে দুদক।

বিনিয়োগকারীরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী সোনালী ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে সঞ্চয় অধিদফতর থেকে প্রমাণ হিসেবে কুপন সংগ্রহ করতেন তারা। এরপর থেকে সঞ্চয়ী হিসাবের বিপরীতে মুনাফা পেতেন তারা। গত মার্চ মাস থেকে মুনাফা উত্তোলনের কুপন ইস্যু দেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন কর্মকর্তারা। মুনাফা না পেয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে হয়েছে তাদের।

শহরের উকিল পাড়ার বাসিন্দা মুনিরা জান্নাত বলেন, ২০১৮ সালে ১০ লাখ টাকা সঞ্চয় অফিসে বিনিয়োগ করে প্রমাণ হিসেবে কুপন সংগ্রহ করি। সেখান থেকে ৩ বার লভ্যাংশ উত্তোলন করা হয়। কিন্তু চতুর্থবারের মাথায় যখন লভ্যাংশ উত্তোনের জন্য যাই তখন অফিস থেকে জানানো হয় আমার নামে মূল নথিতে নাম নেই। অফিসের কাগজপত্রের কিছু সমস্যা হয়েছে। যদি অফিসে মূল নথিতে নাম না থাকে তাহলে তিনবার কিভাবে লভ্যাংশ উত্তোলন করলাম?।

নওগাঁ সঞ্চয় অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত সঞ্চয় কর্মকর্তা নাসির হোসেন বলেন, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সঞ্চয় অফিসে অভিযান পরিচালনা করে দুদক। ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে যারা প্রতারিত হয়েছেন তাদেরকে অফিসে ডাকা হয়েছিল। অফিসের উচ্চমান সহকারী হাসান আলীর অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণ হয়নি। তবে হাসান আলীর অনেক আগের কিছু সঞ্চয়পত্র ছিল। তিনি পারিবারিক প্রয়োজনে সঞ্চয়পত্রগুলো ভেঙে টাকাগুলো আলমারিতে রেখেছিলেন। সেই টাকাগুলোসহ তাকে গ্রেফতার করেছে দুদক।

তবে স্থানীয় সূত্র জানায়, সাদ্দাম হোসেনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে স্বীকারোক্তিতে হাসান আলী টাকা আত্মসাতে জড়িত বলে দুদককে জানায়। এরপরই অভিযান চালিয়ে টাকাসহ হাসান আলীকে গ্রেফতার করে দুদক।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close