দুর্নীতির বিস্ফোরণে প্লাবিত দেশ

পর্দার আড়ালে দুর্নীতি বালিশের নিচে দুর্নীতি ভূমি নিয়ে দুর্নীতি এমনকি পাঠ্যবইয়ে দুর্নীতি কি অদ্ভুত ব্যাপার।দুর্নীতির কাছে দুর্নীতি হার মানছে না, লাগামহীন ভাবে পাগলা ঘোড়ার মত ছুটেছে। বালিশ-পর্দা কেলেঙ্কারির ঘটনা মানুষের মুখে মুখে। সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার বই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিনেছে ৭৫ হাজার ৫০০ টাকায়। দুর্নীতি হয়ে গেছে এখন ব্যাধির মত। মানুষ গবেষণাকার্যে যাচ্ছে উন্নত রাষ্ট্রে বা প্রতিষ্ঠানে অথবা মহাকাশে আর এদিকে বাংলাদেশ গমণ করতেছে উগান্ডায়। কোন গন্ডার ছাড়া সুস্ত মস্তিষ্কের বিশেষজ্ঞ উগান্ডায় যাবে না। রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা লজ্জা শব্দটি ভুলে গেছেন।তাদের মধ্য সামান্যতম লজ্জাবোধ নেই বলে চলে। দৃশ্যপট এমন হয়েছে যে লজ্জাবতীর কাছে লজ্জার হার।দুর্নীতি এখন মহামারী তবু এক মন্ত্রী বললেন, এগুলো নাকি ছোট ব্যাপার। কি আর বলব? জাতী বড় অসহায় এত সব দেখার পর ও চোখ মুখ বন্ধ রাখতে হয়। রাষ্ট্র এখন জনগণের নয় ব্যাক্তিগত সম্পদ।

এক.শেষ প্রর্যন্ত উগান্ডা তাজ্জব ব্যাপার বাংলাদেশ পারেও বটে। পৃথিবীর এত উন্নত দেশ থাকা সত্বে প্রশিক্ষণের জন্য উগান্ডাকে কেন বেচে নেওয়া হলো? তাও আবার নিরাপদ পানির প্রশিক্ষণ।আজব কাহিনী। বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা নিয়ে কাজ করা ‘ওয়াটার ডট ওআরজি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, উগান্ডার ৬১ শতাংশ মানুষ এখনো নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত এবং ৭৫ শতাংশের উন্নত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সুবিধা নেই। মানে কি দাড়ায়।উদ্ভুট সব ব্যাপার দেশে লক্ষণীয়। উগান্ডার মতো একটি অনুন্নত দেশে ওয়াসার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়া আর একজন মেকানিক্যাল ইন্জিনিয়ার দিয়ে ইমারতের নকশা তৈরি করা তফাত কোথায় ?

উগান্ডার বেশির ভাগ মানুষ নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। সেখানে উন্নত পয়োনিষ্কাশন সুবিধারও অভাব। অথচ চট্টগ্রাম ওয়াসা তাদের ২৭ জন কর্মকর্তা–কর্মচারীকে ‘প্রশিক্ষণের’ জন্য পূর্ব–মধ্য আফ্রিকার এই দরিদ্র দেশে পাঠিয়েছে। সঙ্গে আবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের আরও ১৪ জন কর্মকর্তাও দেশটি ভ্রমণে গেছেন। এটাকে কি বলব? প্রমোদ ভ্রমণ ? না কি রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়? যে দেশ বিশুদ্ধ পানির অভাবে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে সেখান থেকে আমরা কি প্রশিক্ষণ নিতে পারি।বর্তমান শাসন ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার বড়ই অভাব তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে জাতি। একদিন দেখব মঙ্গলে যান পাঠানোর জন্য দেশের বিজ্ঞানীরা ছুটছেন কঙ্গোতে।

দুই.দুর্নীতি বর্তমান সরকারের পরম বন্ধু, দুর্নীতি ব্যাতিত আওয়ামীলীগ ভাবায় যায় না। ভূমি নিবন্ধন সেবার প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে।দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ১ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে লেনদেন হয়।দলিলের নকল তোলার জন্য সেবাগ্রহীতাদের ১ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা দিতে হয়। দলিল নিবন্ধনের জন্য প্রতিটি দলিলে দলিল লেখক সমিতিকে ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। জমির দাম, দলিল ও দলিলের নকলের ধরন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকা না থাকার ওপর এবং এলাকাভেদে নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের পরিমাণ কমবেশি হয়। ভূমি দলিল নিবন্ধন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টি আই বি) গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য ওঠে এসেছে।

ভূমির দলিল নিবন্ধন সেবা জনগুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারের রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান উৎস হলেও এই সেবার যুগোপযোগী মানোন্নয়নে আইনি পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথ পরিকল্পনা ও উদ্যোগের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে। তা কি সরকারের নজরে যায় না? আর গেলেও কি সবাই এক এবং একাকার। দলিল নিবদ্ধন জটিলতা নিয়ে দেশের মানুষ দিশেহারা। টি আই বি যে রিপোর্ট দিয়েছে তার চেয়ে প্রকৃত অবস্থা আরও ভয়াবহ। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার মত সক্ষমতা কারও নেই। আওয়াজ করলেই বিপদ যে কারণে কেউ বুঝে শুনে জটিলতায় জড়াতে চায় না। দেশের মানুষ আজ দুর্নীতির কাছে জিম্মি।এই যখন অবস্থা তখন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া মন্তব্য করেন,‘টি আই বি বিদেশিদের শেখানো বুলি আওড়ায়’। তাহলে জনগণ যাবে কোথায় ? জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার গবেষনা সংস্থা টি আই বি সম্পর্কে এ ধরনের ঢালাও মন্তব্য অনভিপ্রেত ও দূর্ভাগ্যজনক। যে কাজ সরকারের কোন সংস্হার করার কথা তা ‘টি আই বি’ করচ্ছে, লজ্জা থাকা উচিত। আর এদের লজ্জা ?

তিন. দুর্নীতি নিয়ে যখন আমরা দিশাহারা তখন ছাত্রলীগের নৈরাজ্য আমাদেরকে আর বিভিষীকাময় করে তুলেছে।গত ৯ই সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে একটি শিরোনাম ছিল “গোলাম রাব্বানীকে প্রোটোকল না দেওয়ায় ঢাবির ৪ রুমে তালা”। মধুর ক্যান্টিনে আসার পর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদককে প্রটোকল দিতে না যাওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের ৪টি রুমে তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩২ জন শিক্ষার্থীকে রাতভর হলের বাইরে অবস্থান করতে হয়। রবিবার দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে এই ঘটনা ঘটে। তালা দেওয়া রুমগুলো হলো ৬২৬ (ক), ৪০১ (ক), ২৩৭, ২৪৮। প্রশ্ন হলো কোন পদাধিকারবলে রাব্বানী প্রোটকল চায়? সে কি মন্ত্রী, এমপি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, না কি হাই প্রফাইল উচ্চপদস্থ কোন সরকারী কর্মকর্তা ? এদের স্পর্ধা দেখে অবাক হই। আমি শুধু অবিভাবকদের একটি প্রশ্ন রাখব সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠিয়েছেন কি মধ্য রাতে প্রটোকল দেওয়ার জন্য? না কি লেখাপড়া করার জন্য?

মোঃ হাফিজুর রাহমান
বিশ্লেষক এবং অনলাইন এক্টিভিষ্ট

Sharing is caring!

Loading...
Open