দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপাচার্যদের স্বেচ্ছাচারীতা

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া পদক্ষেপ গুলো এখনও প্রশ্নবিদ্ধ ! শোভন-রাব্বানীর প্রতি দলীয় প্রধান কঠোর না নমনীয় তা খোলাসা নয়।শোভন-রাব্বানীর অপসারণ শুধু মাত্র ভিজুয়াল এফেক্ট বৈকি। তা না হলে তাদের কে কেন আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না? কেন এত বিলম্ব হচ্ছে ? আশ্বর্যের ব্যাপার হচ্ছে এত বিতর্কের পর ও রাব্বানী এখন ও ডাকসুর গুরত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে। ডাকসুর গুরত্বপূর্ণ পদে তার থাকা নিয়ে বিতর্কের ঝড় বইছে। আর এক জন দুর্নীতিবাজের কাছ থেকে কি নীতি আশা করা যায়। কাজেই এই পদটি ত্যাগ তার জন্য সমোচিত হবে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতারা এত বেপরোয়া এবং দুর্নীতির পেছনে দৌড়াচ্ছে যে তাদের গুরুজনদের (সিনিয়র দুর্নীতিবাজ আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ) হার মানিয়েছে। ছাত্রলীগের দায়িত্বে যারা আছেন এরা সবাই একটি সিন্ডিকেট চক্র। এদেরকে আগে শাসাতে হবে। এদের চক্রকৌশলেই ছাত্র রাজনৈতির আজ বেহাল দশা। কলমের বদলে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে ছাত্রদের হাতে।মুনাফা বন্টন নীতিতে ছাত্রলীগের হাতে অস্ত্র সরবরাহ করচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সুবিধা তারাই নিচ্ছে আবার দিন শেষে স্বার্থ উদ্ধারের পর ডাষ্টবিনে ছুঁড়ে ফেলছে। রাগববোয়ালরা আড়ালেই থেকে যায়।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে চলছে ছাত্র-শিক্ষকের একাংশের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন। গত কয়েকদিন যাবত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিনব কায়দায় প্রতিবাদমুখর। যার পরিপেক্ষিতে ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সেক্রেটারির পতন ইতিহাস হয়ে রইল।ফলে একটি মেসেজ ক্লিয়ার যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক এবং পড়াশুনায় আগ্রহী ছাত্রছাত্রীদের জন্য,কোন দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্তদের জন্য নয়। আসলে এটা হওয়া উচিত। গত এক যুগ ধরে আমরা প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, অপহরণ,ধর্ষণ আর টাকার বিনিময়ে কমিটি গঠন ছাত্রলীগের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। তাদের এই অনৈতিক নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পায় না। যেখানে দুর্নীতির করাল গ্রাসে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিপর্যস্ত সেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিবাদী মনোভাব আমাদের আবার নতুন করে আশাবাদী করেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের পূর্ণজাগরণ আমাদের ছাত্র রাজনীতির সর্ণালী অতিত স্বরণ করিয়ে দেয়।

দেশের প্রায় সবকটি বিশ্ববিদ্যালয় এখন নাজুক অবস্থা।নেই শিক্ষার পরিবেশ,একটি প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের দৌরাত্ম্যর কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জিম্মি এমনকি তাদের বিষাক্ত ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিক্ষকরাও। ছাত্রলীগের নৈরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ ধ্বংসের ধারপ্রান্তে।বলতে লজ্জা হয় যে আমাদের দেশে এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় থাকা স্বত্বে ও একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় আন্তজাতিক কোন মানের নয়। লন্ডনভিত্তিক উচ্চশিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে জরিপ করে। এবার তারা ৯২টি দেশের ১ হাজার ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি জরিপ করেছে। তাতে বাংলাদেশের নাম সেরা এক হাজারের মধ্যে নেই যেখানে ভারতের ৩৬টি নাম এসেছে । এ লজ্জা কার? দায়ী কে? স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন জাগে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করচ্ছে কী? বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপাচার্যের কাজ কী ? বলার অপেক্ষা রাখে না শিক্ষকদের রাজনৈতিকরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গভেষণাকে সবচেয়ে বেশি সংকোচিত করেছে। যে দেশে একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের অবিভাবক ক্ষমতাসীন একটি ছাত্র সংগঠনকে সমীহ করে পাশাপশি তাদেরকে প্রমোদনা দেয় এমনকি দুর্নীতিতে উৎসাহিত করে সেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর কতটুকুই বা মানসম্মত শিক্ষা এবং গবেষণা আশা করা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান এবং কিছুসংখ্যক শিক্ষকদের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারী আচরণে দেশবাসী হতবাক। কোথায় তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে বরং তা না করে নিজেরাই জড়িয়ে পড়েছে। কি আজব কান্ড? এমনকি কেউ যদি বিরুদ্ধ মতপোষণ করে তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। এটা কোন ধরণের শিক্ষা ? অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না, উপাচার্যরা দুর্নীতিতে ডুবে হাবুডুবু খাক তারপরও বলা যাবে না দুর্নীতি হচ্ছে। আওয়াজ তুললেই বিপদ, বাহ বাংলাদেশ বাহ…। এই ধরুণ,গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কর্মকান্ড আমাদের ভাবায় । ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাতেমা-তুজ জিনিয়া, যিনি একটি জাতীয় দৈনিকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, তিনি অভিযোগ করেছেন, তার সাংবাদিকতা এবং ফেসবুক স্ট্যাটাসের জের ধরে তাকে কর্তৃপক্ষ সাময়িক বহিষ্কার করেছে। জবাবে উপাচার্য ড. খন্দকার মো. নাসিরউদ্দীন বলেছেন, ওই ছাত্রী তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। এটা কি সম্ভব ? এই যদি উপাচার্যের মনোভাব হয় তাহলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কোথায়? একটি অযুক্তিক ও অমানবিক সিদ্ধান্ত। এই ধরণের ভিসিরা কিভাবে স্ব-পদে বহাল থাকে ? তাদের এই অনৈতিক ক্ষমতার উৎস কি ?

আসলে বিশ্ববিদ্যালয় বা উপাচার্যের কাজ কী ? আমার মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগ পদ্ধতিতে ভুল আছে। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় বলি, যেগুলো ৭৩ সালের আইন ও অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা কিন্তু তা কি আদৌ মানা হচ্ছে ? ৭৩-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আইনগুলো আমরা দেখি সেখানে চ্যান্সেলর ভাইস-চ্যান্সেলরকে নিয়োগ দেবেন সিনেটে নির্বাচিত তিন সদস্যের একটি প্যানেল থেকে। সিনেটে শিক্ষক-ছাত্র-রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েটের প্রতিনিধি থাকায়, ভাইস চ্যান্সেলর নির্বাচনে শিক্ষক-ছাত্রদের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকে। বর্তমান চিত্র একেবারেই বিপরীত। এখানে ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগে নেওয়া হয় না কোন মতামত। রাজনৈতিক বিভেচনায় তাদের বসানো হয়। আমরা লক্ষ্য করেছি বিগত কয়েক দশক ধরে গণতান্ত্রিক সরকার গুলো এই অগণতান্ত্রিক অনৈতিক কাজটি করে আসছে। ধ্বংসের শুরুটা এভাবেই, যার ফলে আমাদের প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো অতিত ঐতিহ্য হারাতে বসছে।

তবে আশ্বর্যের ব্যাপার হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এত বড় একটা মহাকান্ড ঘটেছে কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন এখনও নিরব। তারা কি এসবের কোন খোজখবর রাখেন না? না, জেনে ও না জানার ভান করছেন? তাদের নিরবতা কি ইঙ্গিত করে? আজব একটি প্রতিষ্ঠান। যাইহোক,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি এবং উপাচার্যদের সম্পৃক্ততা জাতি হিসাবে আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ? আমাদের অদুর ভবিষৎ কী? ভাবতেও ভয় হচ্ছে।

মোঃ হাফিজুর রাহমান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অনলাইন এক্টিভিষ্ট

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close