যাদুকাটার বেকার শ্রমিকদের বাঁচার আকুতি

আবির হাসান,তাহিরপুর প্রতিনিধি:: প্রাকৃতিক প্রাচুর্যে ভরপুর আর মোহনীয় অপরূপ সৌন্দর্যের গুণে দেশজুড়ে পর্যটকদের কাছে ব্যাপক আকর্ষণীয় হওয়া মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী যাদুকাটা।

নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো দেখতে ঠিক যেন জীবনানন্দের কবিতার প্রতিচ্ছবি। গ্রামের কেটে খাওয়া শ্রমিকদের সহজ সরল জীবন যাপন পর্যটকদের প্রতিনিয়তই বিমুগ্ধ করে।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই নদীটি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত। যাদুকাটা নদীর মোহনীয় রূপ দেখতে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন দেশের নানান প্রান্ত থেকে। নদীটির তলদেশে ছড়িয়ে থাকা মূল্যবান পাথর, বালু ও কয়লা উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করে স্থানীয় শ্রমজীবী পরিবারগুলো। শ্রমিকরা নদী থেকে নিজ হাতে পাথর, বালু ও কয়লা উত্তোলন করে বারকী (স্থানীয় এক ধরণের নৌকার নাম) বোঝাই করে। আর বারকী বোঝাই করা এ সকল বালু পাথর আর কয়লা বিক্রি করে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে। শত বছর ধরে এভাবেই জীবিকা নির্বাহ করে থাকে জেলার তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার হাজারো শ্রমিক পরিবার।

কিন্তু ১ যুগেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র ড্রেজারসহ বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করে নদীর তলদেশ থেকে ও পাড় কেটে বালু এবং নুড়িপাথর উত্তোলন করছে। যার দরুন যাদুকাটা তীরের বিভিন্ন গ্রাম ও স্থাপনা ভাঙনের মুখে পড়েছে, বিপন্ন পরিবেশ। পরিবেশ বিনষ্টকারী অবৈধ ড্রেজার আর যন্ত্রের সাথে পেরে উঠতে না পেরে বেকার হয়ে পড়েছে হাজারো শ্রমিক।

পরিবেশ ও নদী তীরবর্তী গ্রাম বিনষ্টকারী আর শ্রমিকদের বেকার করে দেওয়া এই ড্রেজার যন্ত্র বন্ধের দাবিতে ‘সুনামগঞ্জ জেলা বারকি শ্রমিক সংঘ’ ও ‘তাহিরপুর উপজেলা কয়লা লোড-আনলোড কুলি শ্রমিক ইউনিয়ন’ তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। নিরুপায় হয়ে সোমবার দুপুরে মিছিল সহকারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এসে এ স্মারকলিপি দেয় তারা।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন বারকি শ্রমিক সংঘের জেলা সভাপতি মো. ফরিদ মিয়া, সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, কয়লা লোড-আনলোড কুলি শ্রমিক ইউনিয়নের উপজেলা সভাপতি আব্দুস সালাম ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ প্রমুখ।

তাহিরপুর উপজেলা কৃষক সংগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক আকিকুর রেজা জানান, বিগত ১ যুগেরও অধিক সময় ধরেই স্থানীয় বাসিন্দা আর শ্রমিকরা ড্রেজার ও পাড়কাটা বন্ধের দাবিতে মিছিল ও স্মারকলিপি দিয়ে আসলেও ড্রেজার বন্ধ করা যাচ্ছে না। আগে শ্রমিকরা পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করত। আর এখন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা নিজেরাই ড্রেজারসহ নানা যন্ত্রে বালু ও নুড়িপাথর উত্তোলন করে। এ কারণে শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছে। তারা পরিবার পরিজন নিয়ে দুঃসহ দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনকারী চক্রটি কোটি কোটি টাকার সম্পদশালী হয়েছে।

অন্যদিকে প্রতিবাদ আর স্মারকলিপিতে কাজ না হওয়ায় স্থানীয় বিভিন্ন গ্রামের প্রতিবাদী মানুষরা হতাশ হয়ে নিজেরাও পাড়কাটা ও ড্রেজারে যুক্ত হয়েছেন।

স্মারকলিপি পাওয়ার কথা স্বীকার করে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মুনতাসির হাসান বলেন, অবৈধ ড্রেজার ও পাড়কাটা বন্ধে প্রশাসনের সক্রিয় তৎপরতা রয়েছে। পাশাপাশি নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো যেন হুমকির মুখে না পড়ে সেজন্য যখন খবর পাই তখনই ড্রেজার, নৌকা ও জড়িত লোকদের আটক করা হয় এবং জেল জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

১ যুগেরও অধিক সময় ধরে চলে আসা পরিবেশ বান্ধব প্রাচীন ম্যানুয়েল পদ্ধতিতেই যাদুকাটার সম্পদ শ্রমিকরা আহরণ করবে। ড্রেজার বা যন্ত্র দিয়ে যারা যাদুকাটার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত আর নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো হুমকীর মুখে ফেলে, শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্র নষ্ট করবে তাদের কে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি, বলেন তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল।

Sharing is caring!

Loading...
Open